‘ঘর গোছাতে হবে’ ভিসা জটিলতা নিয়ে উদ্বেগ পররাষ্ট্র উপদেষ্টার

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৮ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৬৮ বার
ঘর গোছানোর কথা বললেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বাংলাদেশিদের জন্য বিদেশে ভিসা প্রাপ্তি এখন এক জটিল ও উদ্বেগজনক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা কিংবা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বহু উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশেই এখন বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের প্রতি একধরনের অনিচ্ছা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে উচ্চশিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান কিংবা পর্যটনের উদ্দেশ্যে বিদেশগামী নাগরিকদের জন্য ভিসা পাওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে দেশের সুনাম ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন।

বুধবার (৮ অক্টোবর) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সমসাময়িক বিষয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, “ভিসা নিয়ে দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা চলছে। বাংলাদেশের রেপুটেশনের প্রশ্নে ভিসা জটিল হয়ে গেছে, আমাদের ঘর গোছাতে হবে।” তাঁর এই বক্তব্যে দেশের বর্তমান কূটনৈতিক অবস্থার এক বাস্তব প্রতিচ্ছবি উঠে এসেছে।

তৌহিদ হোসেন আরও বলেন, “আমরা বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কথা বলছি। চেষ্টা করছি, যাতে বাংলাদেশের নাগরিকরা শিক্ষা, ব্যবসা, পর্যটন ও চিকিৎসার মতো খাতে সহজে ভিসা পেতে পারেন।” তিনি জানান, উন্নত দেশগুলোতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে সরকার উদ্যোগ নিচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, “প্রতি বছর জার্মানি পাকিস্তান থেকে ৯ হাজার শিক্ষার্থী নেয়। অন্তত বাংলাদেশ থেকেও একই সংখ্যক শিক্ষার্থী নেয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।”

তুরস্কের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ লাভবান হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর মতে, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা শিল্পে তুরস্কের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।

গত কয়েক বছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশি নাগরিকদের ভিসা প্রদানে উন্নত দেশগুলোর মনোভাব ক্রমেই কঠোর হচ্ছে। অনেক দেশ এখন সরাসরি ভিসা প্রত্যাখ্যান করছে, আবার যেসব দেশে অন-অ্যারাইভাল ভিসা চালু ছিল, সেগুলোর ক্ষেত্রেও নানা অজুহাতে প্রবেশে বাধা দিচ্ছে। এমনকি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পর্যটনবান্ধব দেশ থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরও অনেক সময় বাংলাদেশিদের বিমানবন্দর থেকে ফেরত পাঠাচ্ছে।

কূটনৈতিক মহলের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি এখন পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অবকাঠামোগত অগ্রগতি সত্ত্বেও মানবপাচার, ভুয়া ডকুমেন্টেশন, অবৈধ অভিবাসন ও নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কারণে বিদেশি দূতাবাসগুলো সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। এর সঙ্গে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও প্রশাসনিক দুর্বলতাও একটি কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানায়, বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার দেশগুলোতে পড়াশোনার ক্ষেত্রে একাধিক বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন। অনেক সময় আবেদন প্রক্রিয়ায় জটিলতা, আর্থিক গ্যারান্টি, ভাষাগত যোগ্যতা এবং কনস্যুলার দেরির কারণে শিক্ষার্থীরা সুযোগ হারাচ্ছেন। এই প্রেক্ষাপটে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় শিক্ষাবিনিময় কর্মসূচি জোরদার করার উদ্যোগ নিয়েছে।

তৌহিদ হোসেনের ভাষায়, “আমাদের লক্ষ্য হলো বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়ানো, যাতে মেধাবীরা সহজে বিদেশে যেতে পারেন এবং পরে দেশে ফিরে উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারেন।”

পররাষ্ট্র উপদেষ্টার “ঘর গোছানোর” মন্তব্যটি এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, এই মন্তব্য শুধু প্রশাসনিক নয়, বরং একটি নীতিগত আত্মসমালোচনার প্রতিফলন। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের বিদেশনীতি যেখানে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন নির্ভর ছিল, এখন সেখানে ভাবমূর্তি ও সুশাসনের প্রশ্ন সামনে এসেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, “ঘর গোছানো” মানে শুধু রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা, দুর্নীতি দমন, পাসপোর্টের বিশ্বাসযোগ্যতা বৃদ্ধি, ভিসা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করা। এর মাধ্যমেই দেশের নাগরিকদের জন্য বিদেশে সুযোগ বাড়বে।

এ আলোচনায় তুরস্ক প্রসঙ্গও এসেছে। তৌহিদ হোসেন উল্লেখ করেন, “তুরস্কের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা বাড়ানোর মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা শিল্পে নতুন সুযোগ পাবে।” কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার হলে শুধু প্রতিরক্ষা নয়, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ লাভবান হতে পারে।

বাংলাদেশ এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন এক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি কূটনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা, আন্তর্জাতিক আস্থা ও নাগরিক মর্যাদার বিষয়গুলোতে আরও মনোযোগী হতে হবে। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, রাষ্ট্রীয় ভাবমূর্তি পুনর্গঠনের মাধ্যমে কেবল ভিসা নয়, বিদেশে কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও নতুন দরজা খুলে যাবে।

পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনের বক্তব্যে সেই প্রেরণাই ফুটে উঠেছে—“আমাদের আগে নিজেদের ঘর গোছাতে হবে, তাহলেই বিশ্ব আমাদের গ্রহণ করবে।”

আন্তর্জাতিক পরিসরে এই আত্মসমালোচনা হয়তো একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে। কারণ, বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম এখন আরও বেশি শিক্ষিত, প্রযুক্তিনির্ভর এবং বিশ্বমুখী। তারা চায় একটি সম্মানজনক পাসপোর্ট, একটি মর্যাদাপূর্ণ পরিচয়, এবং এমন একটি দেশ, যাকে বিশ্বের দরবারে শ্রদ্ধা করা হয়। এই লক্ষ্যে ঘর গোছানোই এখন সবচেয়ে জরুরি পদক্ষেপ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত