তুরস্কের সহায়তায় শহিদুল আলমকে মুক্তির চেষ্টা করছে বাংলাদেশ

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১০ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৮৪ বার
বাংলাদেশে ফিরলেন শহিদুল আলম

প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইসরায়েলের কারাগারে আটক বিশিষ্ট আলোকচিত্রী ও মানবাধিকারকর্মী শহিদুল আলমকে মুক্ত করতে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছে বাংলাদেশ সরকার। তুরস্কের সহযোগিতায় এই প্রচেষ্টা চলছে বলে নিশ্চিত করেছে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা কার্যালয়। শুক্রবার (১০ অক্টোবর) সকালে তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে বিষয়টি প্রকাশ করা হয়, যা মুহূর্তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

সরকারি সূত্রে জানা যায়, তুরস্কের কর্তৃপক্ষ শহিদুল আলমের মুক্তি ও নিরাপদ স্থানান্তরের বিষয়ে ইসরায়েলি সরকারের সঙ্গে আলোচনায় অগ্রগতি অর্জন করেছে। আঙ্কারায় নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত আমানুল হক বৃহস্পতিবার রাতেই জানিয়েছেন, আজই বিশেষ বিমানে শহিদুল আলমকে আঙ্কারায় নিয়ে আসা হতে পারে। যদিও তুর্কি কর্তৃপক্ষ শতভাগ নিশ্চয়তা দিতে পারেননি, তবে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে আলোচনাগুলো ইতিবাচক দিকে এগোচ্ছে।

তুরস্কের সহায়তায় শহিদুল আলমকে মুক্তির চেষ্টা করছে বাংলাদেশ

বাংলাদেশ সরকার ইসরায়েলে শহিদুল আলমের গ্রেপ্তারের পর থেকেই বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্বে নিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে জর্ডান, মিসর ও তুরস্কে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট দূতাবাসগুলো ইতোমধ্যে ওই দেশগুলোর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় শহিদুল আলমের মুক্তির চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।

প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরের পোস্টে উল্লেখ করা হয়েছে, “শহিদুল আলম ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের দ্বারা অবৈধভাবে আটক হওয়ার পরপরই বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চাওয়া হয়। মানবিক কারণে তাঁর মুক্তি এখন অগ্রাধিকার পাচ্ছে।”

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো জানায়, গাজায় ইসরায়েলি নৌ অবরোধ ভাঙার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করা ‘ফ্রিডম ফ্লোটিলা কোয়ালিশন’-এর অংশ ছিলেন শহিদুল আলম। এই নৌযাত্রার লক্ষ্য ছিল ফিলিস্তিনে চলমান ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতীকী প্রতিবাদ জানানো এবং মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া। নৌবহরটিতে ‘থাউজেন্ড ম্যাডলিনস টু গাজা’ নামের আরেক মানবিক উদ্যোগের আটটি জাহাজও অংশ নেয়, যেখানে যুক্ত ছিলেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, চিকিৎসক, শিল্পী ও মানবাধিকারকর্মীরা।

নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, মোট নয়টি জাহাজের এই বহরটি যখন ভূমধ্যসাগরের আন্তর্জাতিক জলসীমায় অগ্রসর হচ্ছিল, তখন ইসরায়েলি নৌবাহিনী আকস্মিকভাবে তাদের ওপর হামলা চালায়। ওই অভিযানে সব নাবিক ও অধিকারকর্মীকে আটক করে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন বাংলাদেশের এই খ্যাতনামা আলোকচিত্রী শহিদুল আলম, যিনি দীর্ঘদিন ধরে মানবিক অধিকার, বাকস্বাধীনতা ও সামাজিক ন্যায়ের পক্ষে সোচ্চার কণ্ঠস্বর হিসেবে পরিচিত।

শহিদুল আলমের আটকের খবর প্রকাশ হওয়ার পর থেকেই বিশ্বব্যাপী তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ইসরায়েলের এই আচরণকে “মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন” বলে মন্তব্য করেছে। তাঁরা দ্রুত তাঁর মুক্তি ও নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের আহ্বান জানায়। একই সঙ্গে বাংলাদেশের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাংবাদিক ও আলোকচিত্রশিল্পীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শহিদুল আলমের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছেন।

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারও বিষয়টি কেবল কূটনৈতিক নয়, মানবিক ইস্যু হিসেবে বিবেচনা করছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, শহিদুল আলমকে মুক্ত করতে একাধিক স্তরে আলোচনা চলছে। তুরস্কের পাশাপাশি কাতার ও জর্ডানকেও এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে, যাতে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি হয়।

বাংলাদেশের সংস্কৃতি অঙ্গনের অনেকেই মনে করেন, শহিদুল আলমের আটক কেবল একজন ব্যক্তির নয়, বরং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মানবিক মূল্যবোধের ওপর আঘাত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের এক অধ্যাপক বলেন, “শহিদুল আলম বাংলাদেশের সীমানা পেরিয়ে মানবতার কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছেন। তাঁর মুক্তি কেবল কূটনৈতিক সাফল্য নয়, এটি হবে মানবতার জয়।”

তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান স্থানীয় গণমাধ্যমে জানান, তাঁর দেশ বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে এবং ইসরায়েলকে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি বিবেচনা করতে অনুরোধ জানিয়েছে। তিনি আরও বলেন, “শহিদুল আলম একজন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানবাধিকারকর্মী। আমরা আশা করছি, ইসরায়েল তাঁর মুক্তির বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া দেবে।”

ঢাকায় এদিকে শহিদুল আলমের পরিবার ও সহকর্মীরা উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন। দৃকের এক কর্মকর্তার ভাষায়, “আমরা শুধু তাঁর নিরাপদ প্রত্যাবর্তন চাই। তিনি সব সময় মানবতার কথা বলেছেন, এখন সময় এসেছে মানবতা তাঁর জন্য কথা বলুক।”

আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে এখন শহিদুল আলমের মুক্তি এক গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, বাংলাদেশ সরকার যদি তুরস্ক ও অন্যান্য মুসলিমপ্রধান দেশের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে এই বিষয়টি উত্থাপন করে, তাহলে দ্রুত সমাধান সম্ভব হতে পারে।

ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে আন্তর্জাতিক চাপ ক্রমেই বাড়ছে। বিশ্বজুড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে #FreeShahidulAlam হ্যাশট্যাগটি ভাইরাল হয়ে গেছে।

মানবতার কণ্ঠস্বর হিসেবে পরিচিত শহিদুল আলমের মুক্তি এখন লাখো মানুষের প্রার্থনা। বাংলাদেশ সরকার ও তুরস্কের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা সফল হলে হয়তো খুব শিগগিরই তিনি ফিরে আসবেন আলোকচিত্রের জগতে—যেখানে তিনি সবসময় আলো, মানবতা ও সত্যের গল্প বলতেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত