পাসপোর্টে ভিন্ন, হৃদয়ে এক লাল-সবুজ বাংলাদেশ

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১১ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৫০ বার
পাসপোর্টে ভিন্ন, হৃদয়ে এক লাল-সবুজ বাংলাদেশ

প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক, একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

শেষ বাঁশির পর মাঠজুড়ে নেমে আসে নিস্তব্ধতা। স্কোরবোর্ডে বাংলাদেশের হার স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, কিন্তু সেই সংখ্যাগুলোর বাইরেও ফুটে উঠছে এক অন্যরকম গল্প—ভালোবাসা, আত্মত্যাগ ও এক অদম্য গর্বের গল্প। মাঠের মাঝখানে বসে আছেন হামজা দেওয়ান চৌধুরী। ইংল্যান্ডে জন্ম নেওয়া, ব্রিটিশ পাসপোর্টধারী এই তরুণের চোখেমুখে এখনো ঝুলে আছে হতাশার ছায়া। কোঁকড়া চুল ভিজে গেছে ঘামে, গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে বিন্দু বিন্দু অশ্রু। সতীর্থরা এসে কাঁধে হাত রাখছে, কেউ সান্ত্বনা দিচ্ছে, কেউ নীরবে পাশে দাঁড়িয়ে আছে। তবু তাঁর চোখে যে আগুন, তা নিভছে না। এই হতাশাই যেন বলে দিচ্ছে—বাংলাদেশের জার্সি তাঁর জন্য কেবল একটি পোশাক নয়, এটি এক গর্বের প্রতীক।

অন্য প্রান্তে জার্সিতে মুখ ঢেকে মাটিতে পড়ে আছেন ফাহমিদুল ইসলাম। হতাশার সাগরে হারিয়ে যাওয়া তাঁর চেহারায় ফুটে উঠছে সেই ব্যথা, যা বোঝা যায় না শব্দে। কাছেই রেফারির দিকে হাত তুলে কৈফিয়ত চাইছেন কানাডায় জন্ম নেওয়া তরুণ শমিত সোম। মাঠে যেন থমকে আছে সময়। কেউ কিছু বলতে পারছে না, তবে সবার চোখে এক প্রশ্ন—আরও কি করা যেত না?

ফুটবল মাঠের এই দৃশ্য কেবল একটি ম্যাচের হারের গল্প নয়, বরং এটি বাংলাদেশ ফুটবলের বর্তমান বাস্তবতা ও তার সঙ্গে যুক্ত প্রবাসী ফুটবলারদের এক আবেগঘন অধ্যায়। তারা জন্মেছেন ব্রিটেন, কানাডা, ইতালি বা যুক্তরাষ্ট্রে; বেড়ে উঠেছেন উন্নত বিশ্বের আলো-হাওয়ায়। কিন্তু হৃদয়ের গভীরে তারা এখনো বহন করেন লাল-সবুজ পতাকার অনির্বচনীয় টান।

বাংলাদেশের জন্য এই ‘ফিফা উইন্ডো’ যেন এক আবেগময় দরজা। এ সময়টায় পেশাদার ক্লাবের দায়িত্ব থেকে সামান্য অবসর পেলেই তারা বিমানে চেপে আসেন বাংলাদেশের ডাকে সাড়া দিতে। অনেকে মনে করেন, এটি হয়তো একধরনের দেশপ্রেম। কিন্তু তা তার চেয়েও বেশি—এটি তাদের আত্মপরিচয়ের অংশ, এক অন্তর্গত টান, যা ভাষা বা সীমান্ত মানে না।

ডেনমার্ক প্রবাসী জামাল ভূঁইয়া ও ফিনল্যান্ডের তারিক কাজী আগেই বাংলাদেশ দলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছেন। তাদের পথ ধরে এগিয়ে এসেছেন নতুন প্রজন্মের ফুটবলাররা—হামজা চৌধুরী, শমিত সোম, ফাহমিদুল ইসলাম ও জায়ান আহমেদ। তাদের সবার জীবনধারা ভিন্ন, কিন্তু হৃদয়ের স্পন্দন এক। তারা সবাই বিশ্বাস করেন, নিজেদের শিকড় বাংলাদেশের মাটিতেই প্রোথিত।

ইংল্যান্ডের নামকরা ক্লাব লেস্টার সিটির একাডেমি থেকে উঠে আসা হামজা চৌধুরীর ফুটবলের যাত্রা শুরু ব্রিটিশ ঘাসে। কিন্তু লাল-সবুজ জার্সি গায়ে চাপানোর পর তিনি হয়ে উঠেছেন বাংলাদেশের প্রতীক। তাঁর ফ্রিকিকের গোলেই হংকংয়ের বিপক্ষে ম্যাচে এগিয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশ। সেই মুহূর্তে পুরো দলই যেন এক নতুন বিশ্বাসে ভরপুর হয়ে ওঠে। আর কানাডা থেকে ছুটে আসা শমিত সোম ২৬ ঘণ্টার দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তি ভুলে গিয়ে শেষ মুহূর্তে গোল করে ম্যাচে ফেরান দলকে। তাঁর চোখে-মুখে তখন ছিল কেবলই উচ্ছ্বাস, গর্ব, আর নিজের দেশকে কিছু দেওয়ার অদম্য তাগিদ।

তবে ভাগ্যের পরিহাসে ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার আগেই সবকিছু বদলে যায়। বাংলাদেশ হেরে যায় ৩–৪ গোলে। মাঠে পড়ে থাকে ক্লান্ত দেহ, ভাঙা মন, আর অসমাপ্ত স্বপ্নের টুকরো। কিন্তু স্কোরলাইন কখনোই মাপতে পারে না এই ছেলেদের নিবেদন, এই দেশপ্রেম। তারা জানে, জয়-পরাজয়ের বাইরে আরও কিছু আছে—যা কেবল অনুভব করা যায়, দেখা যায় না।

তারা এসেছে দূরদেশ থেকে, পিছনে ফেলে এসেছে বিলাসবহুল জীবন, আধুনিক ট্রেনিং সুবিধা, নিরাপদ ক্যারিয়ার। অথচ বাংলাদেশে এসে তারা খেলে কাঁদামাটি মাখা মাঠে, কখনো আলো-অন্ধকারে ভরা স্টেডিয়ামে। মাঠের মান খারাপ, সুযোগ-সুবিধা সীমিত, কিন্তু তারা তবু আসে—কারণ এ দেশ তাদের শিকড়, তাদের আত্মার ঠিকানা।

হামজা, শমিত কিংবা জামালরা কখনোই নিজেদের আলাদা ভাবেন না। তারা বুঝে গেছেন, বাংলাদেশ কেবল একটি ভৌগোলিক মানচিত্র নয়; এটি এক অনুভব, এক গর্ব, এক আত্মার টান। খেলতে নেমে তারা ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করলেও, মাঠে তারা সবাই এক সুরে বাঁধা—লাল-সবুজের সুরে।

হংকংয়ের বিপক্ষে হারের পরও তারা একে অপরের কাঁধে হাত রেখে প্রতিজ্ঞা করেছেন, আরও ভালোভাবে ফিরবেন। এই হারের মধ্যেই তারা খুঁজছেন ভবিষ্যতের পথ। হয়তো আগামী ম্যাচে স্কোরলাইন ভিন্ন হবে না, কিন্তু প্রতিটি পাস, প্রতিটি ট্যাকল, প্রতিটি দৌড়ে তারা রেখে যাবেন বাংলাদেশ নামের এক ভালোবাসার চিহ্ন।

তাদের এই যাত্রা শুধুই ফুটবল নয়, এটি এক সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন, এক আত্মিক প্রতিশ্রুতি। তারা যেন বলে দিচ্ছেন—পাসপোর্টে যা-ই লেখা থাক, রক্তে বইছে বাংলাদেশের আবেগ। তাদের চোখে জ্বলছে সেই অদম্য গর্ব, যা কোনো সীমান্তে থামানো যায় না।

যখন মাঠের আলো নিভে যায়, দর্শকসারিতে নেমে আসে নীরবতা, তখনও হামজা, শমিত, জামালরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসেন। হয়তো মনের গভীরে জানেন, এই যাত্রা এখনো শেষ হয়নি। বাংলাদেশ তাদের জন্য কেবল একটি দেশ নয়, এটি এক চলমান স্বপ্ন, যা প্রতিটি ম্যাচে, প্রতিটি ঘামে, প্রতিটি অশ্রুতে বেঁচে থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত