প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক, একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
১৭ বছরের দীর্ঘ নির্বাসন জীবনের অবসান ঘটাতে অবশেষে দেশে ফিরতে যাচ্ছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। লন্ডনে কাটানো প্রায় দুই দশকের পর তিনি আগামী নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশে ফিরবেন বলে নির্ভরযোগ্য দলীয় ও কূটনৈতিক সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে। তাঁর এই প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে বিএনপির ভেতরে যেমন নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে, তেমনি দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনেও শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনার ঝড়।
দলীয় একাধিক সূত্র জানায়, নভেম্বরের ১০ থেকে ২০ তারিখের মধ্যে লন্ডন থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হতে পারেন তারেক রহমান। তিনি লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দর থেকে একটি বাণিজ্যিক ফ্লাইটে দেশে ফিরবেন বলে জানা গেছে। যাত্রার আগে তিনি সৌদি আরবে গিয়ে ওমরা পালন করতে পারেন। দলের ঘনিষ্ঠ একজন উপদেষ্টা জানিয়েছেন, অনেক দিন ধরেই দেশে ফেরার বিষয়ে নানা আলোচনা হচ্ছিল, কিন্তু এবার বিষয়টি প্রায় নিশ্চিত। তিনি বলেন, “অনেক যদি-কিন্তু পেরিয়ে এখন পরিষ্কার যে, আমাদের নেতা দেশে ফিরতে যাচ্ছেন। নভেম্বরের মাঝামাঝি তাঁর দেশে ফেরার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।”
লন্ডনে অবস্থানকালে তারেক রহমান গত কয়েক মাসে বেশ কিছু প্রভাবশালী কূটনীতিকের সঙ্গে দেখা করেছেন। তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত ট্রেসি অ্যান জ্যাকবসন। ওই বৈঠকে তিনি দেশে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করেন এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করেন। জানা গেছে, দেশে ফেরার পরিকল্পনার বিষয়ে আন্তর্জাতিক মহলকেও অবহিত করা হয়েছে।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্প্রতি এক বক্তব্যে বলেন, “তারেক রহমান খুব শিগগিরই দেশে ফিরবেন। দলের পক্ষ থেকে আমরা সব প্রস্তুতি নিচ্ছি। যদিও চূড়ান্ত তারিখ এখনো নির্ধারণ করা হয়নি, তবে সময় খুব কাছাকাছি।” ফখরুলের এই মন্তব্যের পর থেকেই বিএনপির বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীদের মধ্যে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়েছে। অনেকে ইতিমধ্যে ঢাকা ও সারা দেশে সম্ভাব্য বরণ অনুষ্ঠান আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
দলীয় সূত্র আরও জানায়, যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশ হাই কমিশনের মাধ্যমে ট্রাভেল পাস ইস্যুসহ সব প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে। বর্তমানে তারেক রহমান যুক্তরাজ্যে ইনডেফিনিট লিভ টু রিমেইন বা আইএলআর স্ট্যাটাসে বসবাস করছেন। এই স্ট্যাটাসের মাধ্যমে যুক্তরাজ্যে স্থায়ীভাবে বসবাস, কাজ ও পড়াশোনা করা যায় এবং চাইলে ব্রিটিশ নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করা সম্ভব। তবে তিনি কখনো নাগরিকত্ব গ্রহণের পথে হাঁটেননি, কারণ তাঁর লক্ষ্য সবসময়ই ছিল নিজের মাতৃভূমিতে ফিরে গিয়ে সরাসরি রাজনীতির নেতৃত্ব দেওয়া।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ২০০৮ সালে লন্ডনে পাড়ি জমানোর পর এই দীর্ঘ সময় বিএনপির রাজনীতি এক ধরনের দূরনিয়ন্ত্রণের মধ্যে ছিল। লন্ডনে থেকেই তিনি দলের নীতি-নির্ধারণী সিদ্ধান্তে যুক্ত ছিলেন, কিন্তু মাঠের রাজনীতিতে তাঁর অনুপস্থিতি দলের জন্য এক ধরনের শূন্যতা তৈরি করেছিল। সেই শূন্যতা এবার পূরণ হতে যাচ্ছে। বিএনপির এক কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, “তারেক রহমানের দেশে ফেরা মানে দলের পুনর্জন্ম। তিনি শুধু নেতা নন, তিনি আমাদের জন্য প্রেরণা।”
দলের শীর্ষ পর্যায়ে এখন তাঁর নিরাপত্তা নিয়ে জোর আলোচনা চলছে। জানা গেছে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে বিএনপির অনুরোধে দুইটি বুলেটপ্রুফ গাড়ির অনুমোদন দিয়েছে—একটি তারেক রহমানের জন্য বুলেটপ্রুফ এসইউভি এবং অন্যটি খালেদা জিয়ার জন্য বুলেটপ্রুফ মিনিবাস। গাড়ি দুটির ক্রয় ও প্রস্তুত প্রক্রিয়া এখন শেষ পর্যায়ে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তারেক রহমান দেশে ফিরলে তাঁকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দেওয়া হবে। তিনি বলেন, “আমরা চাই না তাঁর নিরাপত্তায় কোনো ঘাটতি থাকুক। বিএনপির সব যৌক্তিক অনুরোধ বিবেচনা করা হবে।”
বিএনপির নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর বলেন, “২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ঘটনার পর বাংলাদেশের রাজনীতি নতুন এক যাত্রায় প্রবেশ করেছে। এই সময়ে তারেক রহমানের দেশে ফেরা শুধু দলের জন্য নয়, গণতন্ত্রের ভবিষ্যতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। আমরা মনে করি, তাঁকে সামনে রেখে একটি নতুন অধ্যায় শুরু হবে।”
রাজনৈতিক মহলে ধারণা করা হচ্ছে, তারেক রহমানের দেশে ফেরা বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামোতে বড় পরিবর্তন আনবে। তরুণ নেতৃত্বের উত্থান, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে নতুন ভারসাম্য এবং আন্দোলন-নির্ভর রাজনীতির দিকে ফেরার ইঙ্গিত ইতিমধ্যেই স্পষ্ট। দলের ভেতর নতুন উদ্যম তৈরি হয়েছে, মাঠপর্যায়ে নেতাকর্মীরা সক্রিয় হচ্ছেন এবং দেশব্যাপী আবারও এক ধরনের রাজনৈতিক প্রাণচাঞ্চল্য দেখা দিচ্ছে।
অন্যদিকে সরকারপক্ষও বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। প্রশাসনের বিভিন্ন সংস্থা ইতিমধ্যেই প্রস্তুতি শুরু করেছে যাতে দেশে ফেরার পর কোনো ধরনের অস্থিরতা বা বিশৃঙ্খলার সুযোগ না নেয় কোনো পক্ষ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকার তাঁর প্রত্যাবর্তনকে একদিকে রাজনৈতিক শিষ্টাচার হিসেবে দেখবে, অন্যদিকে আইনগত দিকগুলোতেও সতর্ক থাকবে।
লন্ডনে দীর্ঘ ১৭ বছর কাটিয়ে এবার নিজের দেশের মাটিতে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারেক রহমান। স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমান ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গেও তিনি ফেরার পরিকল্পনা করেছেন বলে জানা গেছে। বিএনপি নেতাদের মতে, এই ফেরাটা শুধু একজন রাজনৈতিক নেতার প্রত্যাবর্তন নয়, এটি এক প্রতীকী ঘটনা—দলের পুনর্জাগরণ, নতুন নেতৃত্বের উত্থান এবং গণতান্ত্রিক রাজনীতির নতুন দিগন্তের সূচনা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাষায়, দেশের রাজনীতি এখন এক মোড় ঘোরানো সময়ের মুখোমুখি। তারেক রহমানের এই প্রত্যাবর্তন সেই মোড়কে আরও গতি দেবে কিনা, তা সময়ই বলে দেবে। তবে এটা নিশ্চিত, নভেম্বর মাসে বাংলাদেশের রাজনীতি আবারও বিশ্ব গণমাধ্যমের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে যাচ্ছে, আর সেই কেন্দ্রবিন্দুতেই থাকবেন তারেক রহমান।