অস্কারজয়ী কিংবদন্তি অভিনেত্রী ডায়ান কিটনের প্রয়াণে শোকের ছায়া

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ১২ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৮০ বার
অস্কারজয়ী কিংবদন্তি অভিনেত্রী ডায়ান কিটনের প্রয়াণে শোকের ছায়া

প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

হলিউড আজ যেন এক বিশাল শূন্যতার মধ্যে দাঁড়িয়ে। কিংবদন্তি অস্কারজয়ী অভিনেত্রী ডায়ান কিটন আর নেই। চলচ্চিত্রপ্রেমীদের হৃদয়ে গভীর দাগ কেটে যাওয়া এই অনন্য শিল্পী ১১ অক্টোবর শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৯ বছর। তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও প্রযোজক ডরি রাথ সংবাদটি নিশ্চিত করেছেন বিবিসিকে।

তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে হলিউডের প্রতিটি প্রান্তে নেমে আসে শোকের ছায়া। চলচ্চিত্র জগতের সহকর্মীরা, পরিচালকরা, সহ-অভিনেতারা সবাই যেন হারিয়েছেন একজন প্রেরণার মানুষকে—যিনি শুধু পর্দায় নয়, বাস্তব জীবনেও ছিলেন স্বাধীনচেতা, সৃজনশীল ও সাহসী এক নারীর প্রতীক।

১৯৪৬ সালে লস অ্যাঞ্জেলেসে জন্ম নেয়া ডায়ান কিটনের শৈশব কাটে ক্যালিফোর্নিয়ার উজ্জ্বল আকাশের নিচে। খুব ছোটবেলাতেই তিনি মঞ্চনাটকে অংশ নিতে শুরু করেন। কিন্তু ১৯৭০-এর দশকে ‘দ্য গডফাদার’ চলচ্চিত্রে কেই অ্যাডামস-কোরলিওনের চরিত্রে অভিনয় করেই তিনি বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পান। তরুণ পরিচালক ফ্রান্সিস ফোর্ড কপোলার এই বিখ্যাত চলচ্চিত্রে আল পাচিনোর বিপরীতে তার অভিনয় ছিল অনবদ্য। কোমল অথচ দৃঢ় এক নারী চরিত্রের ভেতর দিয়ে তিনি সিনেমাপ্রেমীদের মনে জায়গা করে নেন চিরদিনের জন্য।

তবে তার ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরে যায় ১৯৭৭ সালে উডি অ্যালেন পরিচালিত অ্যানি হল চলচ্চিত্রে অভিনয়ের পর। প্রেম, বিচ্ছেদ, আত্ম-অনুসন্ধান আর বুদ্ধিদীপ্ত সংলাপের এই সিনেমাটি তাকে এনে দেয় খ্যাতির শীর্ষে। অ্যানি হল–এর জন্য তিনি অর্জন করেন সেরা অভিনেত্রীর অস্কার, গোল্ডেন গ্লোব ও বাফটা অ্যাওয়ার্ড—একসঙ্গে তিনটি মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার, যা সে সময়ের অন্যতম রেকর্ড। চরিত্রটি এতটাই প্রভাব ফেলেছিল যে ‘অ্যানি হল স্টাইল’ নামে তার পোশাক ও আচরণ তরুণ প্রজন্মের কাছে ফ্যাশন আইকনে পরিণত হয়।

পরবর্তী সময়ে ডায়ান কিটন একের পর এক ক্লাসিক ছবিতে অভিনয় করেছেন—ফাদার অব দ্য ব্রাইড, দ্য ফার্স্ট ওয়াইভস ক্লাব, দ্য ফ্যামিলি স্টোন, মারভিন’স রুম এবং সামথিংস গটা গিভ। প্রতিটি ছবিতেই তিনি প্রমাণ করেছেন, বয়স বা চরিত্রের পরিধি যাই হোক না কেন, তিনি নিজেকে প্রতিবার নতুনভাবে আবিষ্কার করতে পারেন। বিশেষ করে সামথিংস গটা গিভ চলচ্চিত্রে জ্যাক নিকলসনের বিপরীতে তার রোমান্টিক ও পরিণত চরিত্রের অভিনয় দর্শকদের চোখে এনে দিয়েছিল আনন্দ ও আবেগের জল।

ডায়ান কিটন ছিলেন এমন এক অভিনেত্রী, যিনি কখনোই শুধুমাত্র জনপ্রিয়তার পেছনে ছুটে যাননি। বরং তিনি বেছে নিয়েছিলেন এমন চরিত্র, যা মানবিক দুর্বলতা, একাকিত্ব ও জীবনের বাস্তবতাকে ফুটিয়ে তোলে। তার অভিনয়ে ছিল গভীর সত্যনিষ্ঠা—এক ধরনের আত্মপ্রকাশ, যা দর্শকদের মনে নাড়া দেয়।

অভিনয়ের পাশাপাশি ডায়ান কিটন পরিচালনাতেও ছিলেন সমান দক্ষ। ১৯৮৭ সালে তার প্রথম পরিচালিত ডকুমেন্টারি হেভেন প্রকাশ পায়, যা মৃত্যুর পরলোকবিশ্বাস নিয়ে তৈরি। এই চলচ্চিত্রে তিনি জীবন ও মৃত্যুর সম্পর্ককে দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখিয়েছিলেন। পরে ১৯৯৫ সালে তার পরিচালিত আনস্ট্রাং হিরোজ কান চলচ্চিত্র উৎসবের ওয়ান সার্টেন রিগার্ড বিভাগে মনোনয়ন পায়। ২০০০ সালে তিনি নির্মাণ করেন হ্যাংগিং আপ নামের কমেডি-ড্রামা, যেখানে তিনি নিজেই অভিনয় করেছিলেন মেগ রায়ান ও লিসা কুড্রোর সঙ্গে। এই ছবিতেও তিনি প্রমাণ করেছিলেন, পরিচালক হিসেবে তার দৃষ্টিভঙ্গি কতটা সূক্ষ্ম ও মানবিক।

তার পুরো ক্যারিয়ারে ডায়ান কিটন ছিলেন এক অদ্ভুত ভারসাম্যের প্রতীক—গভীর চিন্তাশীল কিন্তু প্রাণবন্ত, স্বাধীনচেতা কিন্তু সংবেদনশীল। সাক্ষাৎকারে প্রায়ই তিনি বলতেন, “আমি কখনো নিখুঁত হতে চাইনি। আমি চাই নিজের মতো করে সত্যিকারের হতে।” এই সত্যনিষ্ঠাই তাকে আলাদা করেছে।

তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর হলিউডের সহকর্মীরা সামাজিক মাধ্যমে একের পর এক শোকবার্তা দিয়েছেন। অভিনেত্রী বেট মিডলার, যিনি কিটনের সঙ্গে দ্য ফার্স্ট ওয়াইভস ক্লাব-এ কাজ করেছিলেন, ইনস্টাগ্রামে লিখেছেন, “অসাধারণ, মেধাবী এবং সম্পূর্ণ মৌলিক এক মানুষ চলে গেলেন। ডায়ান ছিলেন হাস্যরসিক, নিঃস্বার্থ এবং সম্পূর্ণ নিজের মতো করে বাঁচা এক নারী।”

অভিনেতা স্টিভ মার্টিন লিখেছেন, “ডায়ান এমন এক অভিনেত্রী, যিনি পর্দায় আলো ফেলতেন, আবার সেই আলো নিজের ভেতরেও বহন করতেন। তার সঙ্গে কাজ করা ছিল এক আশীর্বাদ।” পরিচালক ন্যান্সি মায়ার্স বলেন, “ডায়ান শুধু অভিনয় করতেন না, চরিত্র হয়ে যেতেন। তার সংলাপ, তার হাসি, এমনকি তার নীরবতাও দর্শকের হৃদয়ে কথা বলত।”

ডায়ান কিটনের মৃত্যুর পর অনেকে স্মরণ করছেন তার সমাজসেবামূলক কাজের কথাও। তিনি ছিলেন নারী অধিকার ও দত্তক সন্তানের পক্ষে সোচ্চার কণ্ঠ। একা জীবনযাপন করলেও তিনি দত্তক নিয়েছিলেন দুই সন্তান—ডেক্সটার ও ডিউককে। নিজের বই Then Again-এ তিনি মায়ের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে লিখেছিলেন, “আমার মা আমাকে শিখিয়েছিলেন, ভালোবাসা কখনো নিখুঁত হতে হয় না; হতে হয় কেবল সত্যিকারের।”

তার জীবনের এই দর্শনই যেন ছড়িয়ে ছিল তার প্রতিটি চরিত্রে। কখনো নিঃসঙ্গ নারী, কখনো হাস্যরসিক প্রেমিকা, আবার কখনো দৃঢ় মা—সবখানেই ছিল মানবিকতার গভীর ছোঁয়া।

হলিউডের ইতিহাসে ডায়ান কিটনের নাম থাকবে সেইসব কিংবদন্তিদের পাশে, যারা শুধু সিনেমাকে সমৃদ্ধ করেননি, বরং জীবনের দর্শনকেও নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। তার প্রয়াণে চলচ্চিত্রজগৎ হারাল এক অমূল্য রত্নকে—যিনি নিজের ভঙ্গিতে, নিজের কণ্ঠে, নিজের ভাবনায় বাঁচতে জানতেন।

শেষবার এক সাক্ষাৎকারে যখন তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, মৃত্যুকে তিনি কীভাবে দেখেন, তখন তিনি হেসে বলেছিলেন, “জীবন একটা সিনেমা, আমি শুধু চাই শেষ দৃশ্যটা যেন মনে রাখার মতো হয়।”

আজ, সেই শেষ দৃশ্যটিও মানুষ মনে রাখবে। তার হাসি, তার টুপি, তার সাদা-কালো পোশাক—সবকিছুই যেন রয়ে যাবে এক শাশ্বত স্মৃতির মতো।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত