ফিলিস্তিনির স্বাধীনতার নামে নির্বাসন, ১৫৪ ফিলিস্তিনির ‘মুক্তি’ না নতুন বন্দিত্ব?

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৫৯ বার
ফিলিস্তিনির স্বাধীনতার নামে নির্বাসন, ১৫৪ ফিলিস্তিনির ‘মুক্তি’ না নতুন বন্দিত্ব?

প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৫ | একটি বাংলাদেশ অনলাইন ডেস্ক

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বন্দি বিনিময় চুক্তির আওতায় ইসরাইল থেকে মুক্তি পেলেন কিছু ফিলিস্তিনি বন্দি—যা প্রথমে আনন্দের সংবাদ হিসেবেই পৌঁছেছিল তাদের পরিবারে। কিন্তু সেই আনন্দ মুহূর্তেই মিশে গেছে গভীর শোক ও ক্ষোভে। কারণ, মুক্তিপ্রাপ্ত ১৫৪ জন ফিলিস্তিনিকে তাদের নিজ দেশে ফেরার অনুমতি না দিয়ে জোরপূর্বক অন্য দেশে নির্বাসনে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসরাইল। খবরটি নিশ্চিত করেছে ফিলিস্তিনি বন্দিদের গণমাধ্যম কার্যালয়, আর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল জাজিরা জানিয়েছে, এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে ফিলিস্তিনি সমাজ ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো।

এই ১৫৪ জনের মধ্যে রয়েছেন বহু বছর ধরে বন্দিত্বে থাকা সেইসব মানুষ, যাদের পরিবার তাদের ফিরে পাওয়ার আশায় এক প্রজন্ম পেরিয়ে গেছে। কিন্তু এখন তারা মুক্ত হলেও, ফিরতে পারছেন না নিজের মাটিতে—ফিরতে পারছেন না নিজের ঘরে। পরিবারগুলোর জন্য এ যেন মুক্তি নয়, বরং আরেক দফা হৃদয়বিদারক শাস্তি।

নির্বাসনের নামে মুক্তি: প্রশ্নের মুখে ইসরাইলের নীতি

ইসরাইলের সাম্প্রতিক এই সিদ্ধান্তকে অনেকেই বলছেন, “স্বাধীনতার ছদ্মবেশে আরেক ধরনের শাস্তি।” কারণ, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী, কোনো নাগরিককে তার নিজের দেশ থেকে জোর করে নির্বাসনে পাঠানো রাষ্ট্রের ক্ষমতার অপব্যবহার ও মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন। তবুও ইসরাইল প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছে—মুক্তিপ্রাপ্ত ১৫৪ জন ফিলিস্তিনি নিজেদের দেশে ফিরতে পারবেন না; তাদের তৃতীয় কোনো দেশে পাঠানো হবে।

এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত ইসরাইল আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়নি, ঠিক কোন কোন দেশে এই ফিলিস্তিনিদের পাঠানো হবে। তবে পূর্ববর্তী বন্দি বিনিময় চুক্তির অভিজ্ঞতা অনুযায়ী ধারণা করা হচ্ছে, এবারও তাদের তিউনিসিয়া, আলজেরিয়া, কিংবা তুরস্কে পাঠানো হতে পারে।

এই নীতিকে ‘আইনবিরুদ্ধ’ আখ্যা দিয়েছেন দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের পাবলিক পলিসি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তামের কারমাউত। আল জাজিরাকে তিনি বলেন, “এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে এটি সম্পূর্ণ অবৈধ। কোনো বন্দিকে নিজের দেশ থেকে নির্বাসনে পাঠানো তার নাগরিক অধিকারকে অস্বীকার করা, যা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী।”

পরিবারগুলোর আনন্দে বিষাদের ছায়া

গাজা, রামাল্লাহ বা নাবলুস—সবখানেই মুক্তিপ্রাপ্ত বন্দিদের পরিবারের মধ্যে প্রথমে দেখা গিয়েছিল উল্লাসের ঢেউ। তবে নির্বাসনের সংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই সেই আনন্দ ম্লান হয়ে যায়। অনেক পরিবার এখন শঙ্কিত, তারা হয়তো জীবনে আর কখনও তাদের প্রিয়জনকে মুখোমুখি দেখতে পারবেন না।

একজন বন্দির মা, যিনি নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “আমি আমার ছেলেকে ১৮ বছর পর ফিরে পেয়েছি ভেবে কেঁদেছিলাম আনন্দে। কিন্তু এখন জানছি, সে আমাদের দেশে ফিরবে না—অন্য কোথাও পাঠানো হবে। তাহলে এটাকে মুক্তি বলব কীভাবে?”

মুক্তি, নাকি কূটনৈতিক কৌশল?

অনেক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক মনে করছেন, ইসরাইলের এই নির্বাসন নীতি কেবল মানবিক সংকট নয়, বরং এক ধরনের রাজনৈতিক কৌশল। বন্দিদের নিজ দেশে ফিরতে না দিয়ে ইসরাইল হয়তো চায় তাদের প্রভাব ও নেতৃত্বের সম্ভাবনা কমিয়ে দিতে। কারণ, এই বন্দিদের অনেকেই ইসরাইলি দখলবিরোধী আন্দোলনের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন, এবং তাদের প্রত্যাবর্তন ফিলিস্তিনি সমাজে নতুন উদ্দীপনা তৈরি করতে পারত।

এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে—এটা কি সত্যিই মুক্তি, নাকি নিপীড়নের আরেক রূপ? ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, “যখন একজন মানুষ নিজের দেশেই ফিরে যেতে পারে না, তখন তার মুক্তি অর্থহীন। নির্বাসনের মাধ্যমে ইসরাইল আসলে বন্দিত্বের আরেকটি রূপ বজায় রাখছে—যেখানে স্বাধীনতার আড়ালে লুকিয়ে আছে কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ।”

দ্বিমুখী নীতি ও মানবাধিকারের প্রশ্ন

মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, বন্দি বিনিময় চুক্তি মানবিকতার ভিত্তিতে হওয়ার কথা, কিন্তু ইসরাইলের এই পদক্ষেপ তা পুরোপুরি ভেঙে দিয়েছে। তারা দাবি করছে, এটি বন্দি বিনিময়ের চুক্তির ‘দ্বিমুখী’ নীতি—যেখানে একপক্ষ মানবিক কারণে বন্দিদের মুক্তি দিচ্ছে, আর অন্যপক্ষ মুক্তির নামে তাদের দেশছাড়া করছে।জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের এক সদস্য জানান, “এই নির্বাসন আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘনের পর্যায়ে পড়ে। একজন ফিলিস্তিনিকে তার মাতৃভূমি থেকে তৃতীয় দেশে পাঠানো মানে তাকে পরিচয়হীন করে তোলা, যা একটি জাতির ওপর নিপীড়নের বহির্প্রকাশ।”ইসরাইলের এ পদক্ষেপ এখন নতুন এক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে—স্বাধীনতার নামে অন্য দেশে নির্বাসন, এটাকে কি আদৌ মুক্তি বলা যায়? ফিলিস্তিনিদের জন্য এটি নিঃসন্দেহে মুক্তির নয়, বরং অস্তিত্বের আরেক পরীক্ষা। যখন একজন মানুষ নিজের মাতৃভূমিতে ফিরতে পারে না, তখন স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি কেবল এক ভ্রান্ত আশার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়।

ফিলিস্তিনিদের মুক্তি তাই আজও অসম্পূর্ণ—মাটির কাছ থেকে, ঘরের কাছ থেকে, নিজের স্বাধীনতার কাছ থেকেও।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত