প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
নির্বন্ধহীনভাবে বিচারাধীন অভিযোগের মুখে এক সক্রিয় জেনারেল দেশ ছেড়ে ভারতে প্রবেশ করে সেখানে আশ্রয় নিয়েছেন—এই দাবি করেছে ঢাকা ও কলকাতার নিরাপত্তা সূত্র। সাধারণত দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাজড়িত বিষয় হওয়া সত্ত্বেও, গত ৯ অক্টোবর তামাবিল সীমান্ত দিয়ে তিনি বিশেষ ব্যবস্থায় বাংলাদেশ ছেড়ে কলকাতা যান এবং বর্তমানে নিউ টাউনে সপরিবারে অবস্থান করছেন বলে জানানো হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নিরাপত্তা সূত্রগুলো আমার দেশকে জানিয়েছে, জেনারেল কবীর আহাম্মদ নামের ওই সেনা কর্মকর্তাকে আন্তর্জাতিক অভিযোগের প্রেক্ষিতে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হওয়ার পর থেকেই , অবস্থান নিয়ে বিবৃতি-বিবাদ চলছে। সূত্রগুলো বলছে, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির ঠিক পরদিনই তিনি সীমান্ত পেরিয়ে কলকাতায় পৌঁছান এবং বর্তমানে নিউ টাউনের সানজিবা গার্ডেন কমপ্লেক্সে পরিবারসহ অবস্থান করছেন। একই এলাকায় গতকাল পালিয়ে যাওয়া অন্য এক সেনা কর্মকর্তার অবস্থান সম্পর্কিত খবরও পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে।
সেনা সদর থেকে পাঠানো বার্তা অনুযায়ী, জেনারেল কবীরকে সেনাবাহিনী ‘ইলিগালি অ্যাবসেন্ট’ হিসেবে ঘোষণা করেছে এবং তাকে বৈধ ছাড় না নিয়ে বিদেশে চলে যাওয়ার অভিযোগ তদন্তাধীন। সেনাবাহিনীর অ্যাডজুট্যান্ট জেনারেল মেজর জেনারেল মো. হাকিমুজ্জামান এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছিলেন যে, জেনারেল কবীর ৯ অক্টোবর সকালে বাসা থেকে বের হওয়ার পর থেকে তার সন্ধান মিলছে না এবং ডিজিএফআই, এনএসআই ও বিজিবিকে বলা হয়েছে যাতে তিনি দেশের বাইরে যেতে না পারেন।
বহির্বিশ্বে ঘটমান এ ঘটনাকে ঘিরে নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব সম্পর্কিত প্রশ্ন উঠেছে। বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, একজন সার্ভিং জেনারেল কীভাবে সীমা পেরিয়ে পালিয়ে যেতে পারেন—এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে। অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, যদি এ ধরনের ঘটনা সত্যি থাকে তাহলে এটি ‘দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র’ হিসেবে দেখা উচিত এবং যাদের সহযোগিতা ছিল তাদের দ্রুত শনাক্ত করে বিচারের মুখোমুখি করা প্রয়োজন।
অনেক বিশ্লেষকই মনে করেন, বিষয়টি শুধু একজন কর্মকর্তার বিচ্ছিন্ন ঘটনার বাইরে জাতীয় নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা তথ্যপ্রক্রিয়ার দুর্বলতাও নির্দেশ করে। তারা বলছেন, যদি দেশের একটি সার্ভিং জেনারেল অবৈধভাবে দেশ ত্যাগ করতে পারেন, তা হলে সেনা ও সীমান্ত তদন্তব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ ও কার্যকারিতা সম্পর্কে মৌলিক প্রশ্ন ওঠে। এছাড়া, বহির্বিশ্বে এ ধরনের আশ্রয় গ্রহণকে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক দিক থেকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন বলেও তারা উল্লেখ করেছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হওয়ার আগেই ওই কর্মকর্তার কলকাতা যাত্রার যোগসূত্র ছিল; তিনি গত এক মাস ধরে কলকাতা এবং বাংলাদেশের মধ্যে যাতায়াত করছিলেন। নিরাপত্তা সূত্র আরও জানায়, তিনি সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝিকে কলকাতায় এসেছিলেন এবং কিছুদিন থাকার পর আবার দেশে ফিরেছিলেন; পরে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর ৯ অক্টোবর তিনি আবার সীমান্ত পেরিয়ে ঢাকাকে ছেড়েছেন।
আওয়ামী লীগ আমলের গুম-নির্যাতনের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গত ৮ অক্টোবর ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রীসহ বেশ কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করার তথ্যও বিগত দিনগুলোতে প্রকাশ হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে অভিযুক্ত বা সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের অবস্থান ও আশ্রয়ের বিষয়ে আন্তর্জাতিক ও কূটনৈতিক সংক্রান্ত জটিলতা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলেন, বিষয়টি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরার পাশাপাশি দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্ত প্রয়োজন যাতে কোন পক্ষের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের অবৈধ ছত্রছায়া বা সহযোগিতা মিললে তা শনাক্ত করা যায়।
এই ঘটনার বিরুদ্ধে জনগণের উদ্বেগ ও প্রশ্নের একটা বড় অংশ হল—যেমন অভিযোগে বলা হচ্ছে, কোনো প্রভাবশালী গোষ্ঠী বা বিদেশী শক্তি এ ধরনের পালিয়ে যাওয়া কর্মসূচিতে জড়িত থাকতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করান, এসব সন্দেহ ও অভিযোগ প্রমাণ করার জন্য কড়া তদন্ত ও প্রমাণভিত্তিক বিচার জরুরি, নতুবা বিষয়টি রাজনৈতিক খণ্ডিতকরণ ও কূটনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি করবে। তারা আরও জোর দিয়ে বলছেন যে, যদি কোনো সদস্য আইন-শৃঙ্খলা বা সামরিক বিধান ভেঙে দেশত্যাগ করে থাকে, তার দায়-দায়িত্ব নির্ধারণ করেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
এ ঘটনার বিষয়ে সেনাবাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলি তদন্ত করছেন এবং যে কোনো তথ্যের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কলকাতা নিরাপত্তা সূত্র বলতে পেরেছে যে, স্থানীয় প্রশাসন বা নিরাপত্তা কর্মকর্তারা এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকার করেছেন বা সীমিত তথ্য দিয়েছেন। এখন পর্যন্ত ওই জেনারেল বা তার উত্তরণে সরাসরি জড়িত বলেও যে কোনও পক্ষের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি পাওয়া যায়নি।
এই বিষয়ে আমরা সংশ্লিষ্ট সরকারি ও নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের অফিশিয়াল প্রতিক্রিয়া সংগ্রহের চেষ্টা করছি। তদন্ত ও আনুষ্ঠানিক নিশ্চয়তা ছাড়া যে কোনো স্পষ্ট পর্যবেক্ষণ প্রকাশ করা দায়িত্বশীল হবে না—তবে বর্তমানে পাওয়া অভিযোগ ও নিরাপত্তা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী বিষয়টি গভীরভাবে তদন্তের দাবি জোরদার হচ্ছে।