প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৫। নিজস্ব সংবাদদাতা। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে বহুজাতিক ওষুধ ও প্রসাধনী নির্মাতা প্রতিষ্ঠান জনসন অ্যান্ড জনসন (J&J)–এর বিরুদ্ধে দায়ের করা হাজারো মামলা। অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে জেনেশুনে এমন একটি বেবি পাউডার বিক্রি করেছে, যা প্রাণঘাতী ক্যানসারের ঝুঁকি বহন করে। বিশ্বখ্যাত এই ফার্মাসিউটিক্যাল জায়ান্টের বিরুদ্ধে প্রায় তিন হাজার ভুক্তভোগী মামলা করেছেন, যাদের অভিযোগ—জনসন অ্যান্ড জনসনের বেবি পাউডারে অ্যাসবেস্টস নামক ক্ষতিকর উপাদান রয়েছে, যা ফুসফুস, ডিম্বাশয় ও অন্যান্য মারাত্মক ক্যানসারের অন্যতম কারণ হিসেবে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত।
বিবিসি প্রাপ্ত আদালতের নথি ও অভ্যন্তরীণ কিছু নথিপত্রে দেখা গেছে, কোম্পানিটি ১৯৬০-এর দশক থেকেই জানত যে তাদের ট্যালকম পাউডারে ট্রেমোলাইট ও অ্যাকটিনোলাইট নামের খনিজ পদার্থ মিশে রয়েছে, যেগুলো ফাইবার আকারে থাকলে অ্যাসবেস্টসে রূপ নেয়। এই অ্যাসবেস্টসই মানবদেহে ক্যানসার সৃষ্টির জন্য দায়ী বলে বহু গবেষণায় প্রমাণিত। কিন্তু ঝুঁকির এই তথ্য জনসন অ্যান্ড জনসন বছরের পর বছর গোপন রেখেছে, এমনকি পণ্যের প্যাকেটে কোনো সতর্কতা বার্তাও দেয়নি। বরং কোম্পানিটি তাদের বেবি পাউডারকে শিশুদের জন্য “নিরাপদ ও বিশুদ্ধ” পণ্য হিসেবে প্রচার করে ব্যাপক বিপণন কার্যক্রম চালিয়ে গেছে।
মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবীরা আদালতে উপস্থাপন করেছেন এমন বেশ কিছু বৈজ্ঞানিক প্রতিবেদন, যেগুলোতে বলা হয়েছে, অ্যাসবেস্টসের ক্ষুদ্র কণাগুলো শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করলে তা কোষের জিনগত গঠনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং দীর্ঘ সময় পর ক্যানসারের রূপ নেয়। সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, ট্যালকম পাউডার ব্যবহারকারীদের অনেকেই নারী, যারা তাদের শিশুদের ত্বকে প্রতিদিন এই পণ্য ব্যবহার করেছেন বছরের পর বছর ধরে। এদের মধ্যে বহুজন পরবর্তীকালে ওভেরিয়ান বা ডিম্বাশয়ের ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছেন বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
এই মামলার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তা সুরক্ষা আন্দোলনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে পণ্যের নিরাপত্তা ও করপোরেট দায়বদ্ধতা নিয়ে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি আদালতে প্রমাণ হয় যে জনসন অ্যান্ড জনসন ইচ্ছাকৃতভাবে ঝুঁকি গোপন করেছে, তবে এটি হবে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় করপোরেট প্রতারণা মামলাগুলোর একটি। এতে কোম্পানির আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি ব্র্যান্ডের বিশ্বাসযোগ্যতাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
অন্যদিকে, জনসন অ্যান্ড জনসন বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। কোম্পানির এক মুখপাত্র বিবিসিকে দেওয়া বিবৃতিতে জানিয়েছেন, তাদের পণ্য সবসময় সরকারি ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে তৈরি করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, “জনসন অ্যান্ড জনসনের বেবি পাউডার শতভাগ নিরাপদ, এতে কোনো অ্যাসবেস্টস নেই, এবং এটি ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়—এমন কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণও নেই।” প্রতিষ্ঠানটি আরও বলেছে, তারা আদালতে জোরালোভাবে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরবে এবং বিভ্রান্তিকর প্রচারণার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
তবে জনমত বলছে ভিন্ন কথা। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে ইতোমধ্যে জনসন অ্যান্ড জনসনের বিরুদ্ধে পৃথকভাবে শত শত মামলা দায়ের হয়েছে, যেখানে ভুক্তভোগীদের দাবি—কোম্পানির গাফিলতি ও ব্যবসায়িক স্বার্থে গোপন করা তথ্যের কারণেই তারা ভয়াবহ পরিণতির শিকার হয়েছেন। অনেক পরিবার তাদের প্রিয়জন হারিয়েছেন ক্যানসারে, আর অনেক নারীকে জীবনভর স্বাস্থ্যঝুঁকির সঙ্গে লড়তে হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বিষয়টি শুধুমাত্র একটি কোম্পানির দায়বদ্ধতার প্রশ্ন নয়; বরং এটি একটি বৃহত্তর ইঙ্গিত—বাণিজ্যিক মুনাফার দৌড়ে মানবজীবনের নিরাপত্তা কীভাবে উপেক্ষিত হচ্ছে। ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পের ওপর জনগণের আস্থা এখন নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। ভোক্তা অধিকার কর্মীরা বলছেন, এই মামলার রায় ভবিষ্যতে বিশ্বজুড়ে প্রসাধনী ও ওষুধ উৎপাদনকারীদের জন্য এক ধরনের সতর্কবার্তা হয়ে উঠবে।
এদিকে, জনসন অ্যান্ড জনসন ২০২৩ সালে তাদের বিশ্বব্যাপী ট্যালকম পাউডার বিক্রি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছিল। তবে সমালোচকদের দাবি, এটি ছিল আইনি ঝুঁকি ও ক্রমবর্ধমান জনবিক্ষোভ এড়ানোর কৌশলমাত্র। প্রতিষ্ঠানটি পরবর্তীকালে কর্নস্টার্চভিত্তিক বিকল্প পাউডার বাজারে আনে, কিন্তু তাতেও আগের ক্ষোভ প্রশমিত হয়নি।
বর্তমানে মামলাটি যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল কোর্টে চলমান। আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি আদালত প্রমাণিতভাবে প্রতিষ্ঠানের দোষ শনাক্ত করে, তাহলে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণের পরিমাণ হতে পারে বিলিয়ন ডলারে। জনসন অ্যান্ড জনসন ইতিমধ্যেই পূর্বের কিছু মামলায় কয়েকশ কোটি ডলার সমঝোতার মাধ্যমে পরিশোধ করেছে। তবে এত বড় পরিসরে নতুন মামলার ঢেউ কোম্পানির ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক কাঠামোকেই নাড়িয়ে দিতে পারে বলে অনেকে মনে করছেন।
যে পণ্য একসময় নির্ভরতার প্রতীক ছিল, আজ সেটিই বিশ্বব্যাপী ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিশুদের কোমল ত্বক রক্ষার প্রতিশ্রুতিতে যে ব্র্যান্ড নিজেদের নির্মলতা ও নিরাপত্তার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল, এখন সেই ব্র্যান্ডই মানবস্বাস্থ্যের ঝুঁকির দায়ে প্রশ্নবিদ্ধ। আদালতের রায় এখনো বাকি, কিন্তু সমাজের আদালতে জনসন অ্যান্ড জনসন ইতিমধ্যেই কঠিন এক বিচারের মুখোমুখি।