বাংলাদেশি ক্রেডিট কার্ড বিদেশে খরচে শীর্ষে যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্য

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২০ মার্চ, ২০২৬
  • ৭৪ বার
বাংলাদেশি ক্রেডিট কার্ড

প্রকাশ: ২০ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশি ব্যাংকের ইস্যুকৃত কার্ড এখন আর শুধু দেশের ভেতর সীমাবদ্ধ নেই, বরং বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে এর ব্যবহার। একসময় বিদেশে লেনদেনের ক্ষেত্রে যেখানে প্রায় একচেটিয়া আধিপত্য ছিল ক্রেডিট কার্ডের, সেখানে গত কয়েক বছরে দৃশ্যপট বদলেছে দ্রুতগতিতে। প্রযুক্তির উন্নয়ন, ব্যাংকিং সেবার সম্প্রসারণ এবং প্রবাসী ও শিক্ষার্থীদের বাড়তি চাহিদার কারণে ডেবিট কার্ডও এখন আন্তর্জাতিক লেনদেনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশিত এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে চমকপ্রদ এক চিত্র। বিদেশে বাংলাদেশিদের কার্ড ব্যবহার নির্দিষ্ট কিছু দেশের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে, যেখানে ক্রেডিট ও ডেবিট কার্ডের ব্যবহারে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন ভিন্ন প্রবণতা।

তথ্য অনুযায়ী, বিদেশে বাংলাদেশিদের ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের ক্ষেত্রে শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সর্বশেষ পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বিদেশে মোট ক্রেডিট কার্ড লেনদেনের প্রায় ১৪ শতাংশই হয়েছে এই দেশে। অন্যদিকে ডেবিট কার্ড ব্যবহারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে যুক্তরাজ্য, যেখানে মোট ডেবিট লেনদেনের প্রায় ১৬ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে।

এই ভিন্নধর্মী প্রবণতার পেছনে রয়েছে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা। ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি হওয়ায় সেখানে ডেবিট কার্ডের ব্যবহার বাড়ছে। শিক্ষার্থীরা দেশ থেকে দ্বৈত মুদ্রার সুবিধাসম্পন্ন ডেবিট কার্ড নিয়ে যান এবং নিয়মিত খরচের জন্য তা ব্যবহার করেন। পরিবারের সদস্যরা দেশে বসে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবে অর্থ জমা দিলে শিক্ষার্থীরা সহজেই বিদেশে সেই অর্থ ব্যবহার করতে পারেন।

ডেবিট কার্ড ব্যবহারের এই প্রবণতার আরেকটি বড় কারণ হলো এতে ঋণের কোনো বিষয় থাকে না। ফলে সুদ বা অতিরিক্ত চার্জের ঝুঁকি ছাড়াই ব্যবহার করা যায়। বিপরীতে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিল পরিশোধ না করলে সুদের চাপ তৈরি হয়, যা অনেক ব্যবহারকারীকে সতর্ক করে তুলছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডিসেম্বর মাসে বিদেশে বাংলাদেশি ডেবিট কার্ডে মোট লেনদেন হয়েছে ৩৯২ কোটি টাকা। এর আগের মাসে ছিল ৩৭৩ কোটি টাকা, অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে প্রায় ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। অন্যদিকে একই সময়ে ক্রেডিট কার্ডে লেনদেন কমে দাঁড়িয়েছে ৪৯১ কোটি টাকায়, যা আগের মাসে ছিল ৫১১ কোটি টাকা। এই পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে যে ডেবিট কার্ডের জনপ্রিয়তা ধীরে ধীরে বাড়ছে।

দেশভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ডেবিট কার্ডের মাধ্যমে যুক্তরাজ্যে খরচ হয়েছে ৬৩ কোটি টাকা। এরপর যুক্তরাষ্ট্র–এ ৫০ কোটি, ভারত–এ ৩৬ কোটি, সৌদি আরব–এ ৩৫ কোটি এবং আয়ারল্যান্ড–এ ৩১ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। অর্থাৎ মোট ব্যয়ের বড় অংশই সীমাবদ্ধ রয়েছে এই কয়েকটি দেশে।

অন্যদিকে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের ক্ষেত্রেও একই ধরনের দেশভিত্তিক ঘনত্ব দেখা যায়। যুক্তরাষ্ট্রে ৬৮ কোটি টাকা ব্যয়ের পাশাপাশি থাইল্যান্ড–এ ৬৫ কোটি, যুক্তরাজ্যে ৪৪ কোটি, সিঙ্গাপুর–এ ৩৮ কোটি এবং ভারতে ৩৫ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। এই পাঁচ দেশেই ক্রেডিট কার্ড লেনদেনের অর্ধেকের বেশি কেন্দ্রীভূত রয়েছে।

ব্যবহার খাত বিশ্লেষণ করলে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসে। বিদেশে ডেবিট কার্ডের সর্বোচ্চ ব্যবহার দেখা যায় সরকারি সেবা গ্রহণে। এর পরেই রয়েছে ডিপার্টমেন্টাল স্টোর এবং বিভিন্ন বাণিজ্যিক সেবা খাত। অর্থাৎ ডেবিট কার্ড মূলত প্রয়োজনভিত্তিক এবং নিয়মিত ব্যয়ের ক্ষেত্রে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে।

অন্যদিকে ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার বেশি হচ্ছে কেনাকাটা ও জীবনযাপন সংশ্লিষ্ট খাতে। ডিপার্টমেন্টাল স্টোর, খুচরা দোকান এবং পরিবহন খাতে এর ব্যবহার বেশি। এতে বোঝা যায়, ক্রেডিট কার্ড এখনও অনেক ক্ষেত্রে লাইফস্টাইল ব্যয়ের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে, যেখানে ডেবিট কার্ড ব্যবহৃত হচ্ছে বাস্তব প্রয়োজন মেটাতে।

ব্যাংকারদের মতে, ভবিষ্যতে এই প্রবণতা আরও জোরালো হতে পারে। কারণ দেশের বেশির ভাগ ব্যাংক এখন ডেবিট কার্ডে আন্তর্জাতিক লেনদেনের সুবিধা যুক্ত করছে। পাশাপাশি মোবাইল ব্যাংকিং ও ডিজিটাল ফাইন্যান্সের বিস্তারের ফলে মানুষ ধীরে ধীরে নগদবিহীন লেনদেনের দিকে ঝুঁকছে।

তবে এই বৃদ্ধির সঙ্গে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। বিশেষ করে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা, সাইবার নিরাপত্তা এবং লেনদেনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কার্ড ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর নজরদারি এবং নীতিমালা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে বলা যায়, বিদেশে বাংলাদেশিদের কার্ড ব্যবহার এখন একটি নতুন ধাপে প্রবেশ করেছে। ক্রেডিট কার্ডের পাশাপাশি ডেবিট কার্ডের বিস্তার শুধু প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত নয়, বরং এটি আর্থিক আচরণেরও পরিবর্তনকে তুলে ধরছে। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলো এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকলেও ভবিষ্যতে আরও অনেক দেশে এই প্রবণতা ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com