ফল আশানুরূপ না হলেও বাংলাদেশের হয়ে খেলতে গর্বিত হামজা

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৫
  • ২৮ বার
আফগানদের বিপক্ষে মাঠে নামছেন হামজা চৌধুরী

প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের সাম্প্রতিক এএফসি এশিয়ান কাপ বাছাইপর্বের অক্টোবর পর্বটি শেষ হয়েছে হতাশা ও আশার মিশ্র অনুভূতি নিয়ে। হংকংয়ের বিপক্ষে ঢাকায় এগিয়ে থেকেও শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তায় ৪-৩ গোলে পরাজিত হয় বাংলাদেশ, আর ফিরতি ম্যাচে হংকংয়ে ১-১ গোলে ড্র করে কাবরেরার শিষ্যরা। এই দুটি ম্যাচে দলের পারফরম্যান্স নিয়ে যেমন সমালোচনা হয়েছে, তেমনি ফুটবলারদের পরিশ্রম ও মানসিক দৃঢ়তার প্রশংসাও এসেছে ভক্তদের কাছ থেকে। এমন সময় লাল-সবুজ জার্সিতে লড়াই করা মিডফিল্ডার হামজা চৌধুরীর এক আবেগঘন বার্তা ছুঁয়ে গেছে ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়।

ইংল্যান্ডে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এই ফুটবলার বৃহস্পতিবার (১৬ অক্টোবর) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক পোস্টে লিখেছেন, “যেভাবে আশা করেছিলাম আর পরিশ্রম করেছিলাম, সেভাবে ফলটা আসেনি। তবে সব সময়ের মতোই বাংলাদেশের হয়ে খেলতে পেরে গর্বিত।” পোস্টটির সঙ্গে তিনি দলের অনুশীলন ও ম্যাচের কয়েকটি ছবি শেয়ার করেছেন, যেখানে স্পষ্ট বোঝা যায়—ফলাফল আশানুরূপ না হলেও মাঠে তাঁর লড়াই ও নিষ্ঠার অভাব ছিল না।

বাংলাদেশের জার্সি গায়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলে প্রতিনিধিত্ব করা হামজার জন্য এটি ছিল আরেকটি বিশেষ অধ্যায়। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব লেস্টার সিটির হয়ে খেলা এই মিডফিল্ডার যখন প্রথমবার বাংলাদেশের হয়ে নাম লেখান, তখন থেকেই তাঁর প্রতি ছিল ভক্তদের আলাদা প্রত্যাশা। দেশের ফুটবলপ্রেমীরা চেয়েছিলেন—ইউরোপে বেড়ে ওঠা এই খেলোয়াড় তাঁর অভিজ্ঞতা দিয়ে দলের খেলার ধরণে নতুন কিছু যোগ করবেন। আর অক্টোবরের ম্যাচগুলোয় তা কিছুটা হলেও দেখা গেছে।

হংকংয়ের বিপক্ষে ঢাকার ম্যাচটি শুরু থেকেই ছিল উত্তেজনাপূর্ণ। ৯০ মিনিটের পুরো সময়জুড়ে বাংলাদেশ দল আক্রমণাত্মক খেলা উপহার দিলেও শেষ মুহূর্তের দুর্ভাগ্যজনক গোলেই জয় হাতছাড়া হয়। ম্যাচ শেষে হতাশার সুর ছুঁয়ে যায় মাঠ থেকে দর্শক গ্যালারি পর্যন্ত। সেই তিক্ততার মাঝেও হামজার পারফরম্যান্স ছিল দলের অন্যতম আলোচিত বিষয়। মিডফিল্ডে তাঁর নিয়ন্ত্রণ, পাসিংয়ের নির্ভুলতা এবং ডিফেন্সে প্রত্যাবর্তনের দক্ষতা দলের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে।

হংকংয়ে ফিরতি ম্যাচেও দেখা গেছে সেই একই মনোযোগী হামজাকে। খেলার প্রথমার্ধে বেশ কয়েকটি সুযোগ তৈরি করেন তিনি, যদিও গোল পাওয়া যায়নি। ম্যাচ শেষে হংকংয়ের সংবাদমাধ্যমগুলোও প্রশংসা করেছে বাংলাদেশ দলের প্রতিরোধের মনোভাবের। ফলাফল ১-১ হলেও মাঠে যে মানসিকতা নিয়ে বাংলাদেশ খেলেছে, তা নতুন করে আশা জাগিয়েছে ফুটবলপ্রেমীদের মনে।

তবে বাস্তবতা কঠিন। চার ম্যাচে মাত্র দুই পয়েন্ট সংগ্রহ করে এএফসি এশিয়ান কাপের মূলপর্বে খেলার সম্ভাবনা কার্যত শেষ হয়ে গেছে বাংলাদেশের। এই প্রেক্ষাপটে অনেকেই হতাশ, বিশেষত যারা জুলাই মাসে দলের দারুণ পারফরম্যান্স দেখে নতুন স্বপ্ন দেখছিলেন। কিন্তু হামজার ভাষায়, “এই খেলাই আমাদের শেখায় দৃঢ়তা। জয়ের জন্য যেমন লড়াই করতে হয়, তেমনি ব্যর্থতার মধ্যেও টিকে থাকতে হয়।” তাঁর এই বার্তা যেন ফুটবল মাঠের সীমা পেরিয়ে অনুপ্রেরণার প্রতীক হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে)-এর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হামজা চৌধুরী নভেম্বরের ম্যাচগুলোতেও দলে থাকবেন। পরবর্তী ম্যাচ ১৮ নভেম্বর ঢাকায়, প্রতিপক্ষ ভারত। সেই ম্যাচ নিয়ে ইতোমধ্যেই উচ্ছ্বাস ছড়িয়েছে ভক্তদের মধ্যে। হামজা নিজেও ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, “ইনশা আল্লাহ, নভেম্বরে আবার দেখা হবে।” তাঁর এই বার্তা নিশ্চিত করেছে, দেশের মাটিতে ফের দেখা যাবে এই ইংলিশ-বাংলাদেশি তারকাকে।

হামজার উপস্থিতি শুধু মাঠে নয়, মাঠের বাইরেও দলের মনোবল বাড়িয়েছে। সতীর্থদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক, শৃঙ্খলাবোধ ও পেশাদার মনোভাব পুরো স্কোয়াডে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলে জানিয়েছেন কোচ কাবরেরা। এক সাক্ষাৎকারে কাবরেরা বলেন, “হামজা শুধু একজন খেলোয়াড় নন, তিনি দলের জন্য মানসিক নেতৃত্বের উৎস। তিনি নিজের কাজের মাধ্যমে সবাইকে অনুপ্রাণিত করেন।”

অন্যদিকে বাংলাদেশের সমর্থকরাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হামজাকে ঘিরে ভালোবাসা প্রকাশ করছেন। কেউ লিখেছেন, “ফলাফল যা-ই হোক, হামজার মতো একজন খেলোয়াড় মাঠে থাকলে বাংলাদেশ আলাদা অনুপ্রেরণা পায়।” আবার কেউ কেউ বলেছেন, “দেশের জন্য খেলাটা গর্বের—এই কথাটা হামজা নিজের আচরণে প্রমাণ করছেন।”

বহু বছর পর বাংলাদেশ জাতীয় দলে একজন ইউরোপ-ভিত্তিক খেলোয়াড়ের এমন আন্তরিকতা সত্যিই নজরকাড়া। হামজার মতো আন্তর্জাতিক পর্যায়ের পেশাদারদের উপস্থিতি তরুণ খেলোয়াড়দের মধ্যে নতুন প্রেরণা জাগাচ্ছে। জাতীয় দলের নতুন প্রজন্মের অনেকেই বলছেন, তাঁরা এখন হামজাকে রোল মডেল হিসেবে দেখছেন—যিনি বাংলাদেশের হয়ে খেলতে লড়াই করেছেন, গর্ববোধ করেছেন এবং ব্যর্থতার মধ্যেও আশার কথা বলেছেন।

বাংলাদেশের ফুটবলে যেখানে এক সময় মনোবল ভেঙে পড়েছিল, সেখানে এই দলের লড়াকু মনোভাবই এখন প্রধান অর্জন। সাম্প্রতিক পরাজয় অনেকের কাছে ব্যর্থতা হলেও, ভেতর থেকে ফুটবলের পুনর্জাগরণের গল্পও লেখা হচ্ছে ধীরে ধীরে। হামজা চৌধুরীর মতো খেলোয়াড়েরা সেই গল্পের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

ভক্তরা এখন তাকিয়ে আছেন ১৮ নভেম্বরের দিকে। প্রতিপক্ষ ভারত—চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী, যাদের বিপক্ষে প্রতিটি ম্যাচই ইতিহাস ও আবেগের মিশ্রণ। সেই ম্যাচে হামজাকে দেখা যাবে কি না, তা নিয়ে যদিও এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি, তবে তাঁর “ইনশা আল্লাহ, নভেম্বরে আবার দেখা হবে” বার্তাই আশার আলো দেখাচ্ছে লাল-সবুজ সমর্থকদের।

বাংলাদেশ ফুটবলের এই মুহূর্তটি হয়তো ফলাফলের দিক থেকে উজ্জ্বল নয়, কিন্তু খেলোয়াড়দের আবেগ, আত্মনিবেদন ও দেশের জন্য গর্ববোধই যেন নতুন এক আশার বীজ বুনছে। হামজা চৌধুরীর সেই বার্তা তাই শুধু একটি ফেসবুক পোস্ট নয়—এটি এক অনুপ্রেরণার গল্প, যেখানে জয় মানে শুধু স্কোরলাইন নয়, বরং দেশের পতাকার জন্য লড়ে যাওয়া প্রতিটি মুহূর্ত।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত