ঢাকার বিমানবন্দরে ভয়াবহ আগুন, ৭ ঘণ্টা ফ্লাইট বন্ধ

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৭৫ বার
ঢাকার বিমানবন্দরে ভয়াবহ আগুন, ৭ ঘণ্টা ফ্লাইট বন্ধ

প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন

ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে শনিবার বিকেল আড়াইটার দিকে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে দেশের প্রধান বিমানবন্দরে উড়োজাহাজ ওঠানামা স্থগিত করা হয়। রাত সাড়ে ৯টার দিকে ধীরে ধীরে ফ্লাইট ওঠানামা শুরু হলেও, আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা ও পুরো এলাকায় পরিস্থিতি শান্ত করতে ফায়ার সার্ভিস ও অন্যান্য উদ্ধারকর্মীদের প্রায় সাত ঘণ্টা লেগেছে।

ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে এসেছে, তবে দুর্ঘটনার স্থানীয় অংশে তখনও ধোঁয়া আর আগুনের কুণ্ডলী দেখা যাচ্ছিল। সূত্র জানাচ্ছে, কার্গো ভিলেজের হ্যাঙ্গার গেটের পাশে কুরিয়ার শাখা থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়। সেখানে মূলত আমদানি করা পণ্য, রাসায়নিক দ্রব্য ও অন্যান্য দাহ্য সামগ্রী রাখা থাকে। প্রাথমিকভাবে পাঁচটি ফায়ার ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছালে, আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় একে একে ১৩টি স্টেশন থেকে ৩৭টি ইউনিট এবং সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী, বিজিবি সদস্যরা তৎপর হন।

ফায়ার সার্ভিসের সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আলী আহাম্মেদ খান জানান, এই ধরনের বড় অগ্নিকাণ্ড বিমানবন্দরে আগে কখনো ঘটেনি। তিনি বলেন, “কার্গো ভিলেজে আগুন নেভানোর ব্যবস্থা যথাযথ ছিল না। আপৎকালীন পরিকল্পনার অভাব এবং দাহ্য পদার্থের উপস্থিতি আগুনকে দ্রুত ছড়িয়ে দিয়েছে। ফায়ার সার্ভিস আগুন নেভানোর জন্য পৌঁছানোর আগেই আগুন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছিল।”

অগ্নিকাণ্ডের ফলে আহত হয়েছেন আনসার ও এপিবিএনের অন্তত ২৭ সদস্য। ক্ষতির পরিমাণ প্রাথমিকভাবে সরকার নিরূপণ করতে পারেনি, তবে ব্যবসায়ী মহলের ধারনা, এই অগ্নিকাণ্ডে কয়েকশ কোটি টাকার ক্ষতি হতে পারে। ঢাকা কাস্টমস এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ফারুক আলম জানিয়েছেন, কার্গো ভিলেজের ওই অংশে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে তৈরি পোশাক, ওষুধ এবং বিভিন্ন শিল্পের জরুরি কাঁচামাল রাখা ছিল। বিশেষ করে দামি মোবাইল ফোনও সেখানে সংরক্ষিত ছিল। এ কারণে ক্ষতির পরিমাণ অত্যন্ত বড় হতে পারে, প্রাথমিক অনুমান অন্তত এক হাজার কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

বিমানবন্দরের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা দেশজুড়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। সম্প্রতি এক সপ্তাহের মধ্যে এটি দেশজুড়ে তিনটি বড় অগ্নিকাণ্ডের মধ্যে একটি। মিরপুরের রূপনগরে মঙ্গলবার পোশাক কারখানা ও রাসায়নিক গুদামে আগুনে ১৬ জনের প্রাণহানি ঘটে। এর পর বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম ইপিজেডের একটি কারখানায় আগুনে সাততলা ভবন পুড়ে যায়। এমন অবস্থায় দেশের প্রধান বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে আগুনের ঘটনায় নিরাপত্তা সংক্রান্ত প্রশ্ন উঠেছে।

অন্তর্বর্তী সরকার বিবৃতিতে জানিয়েছে, দেশের বিভিন্ন স্থানে সম্প্রতি সংঘটিত একাধিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। নাশকতা বা অগ্নিসংযোগের কোনো প্রমাণ পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক ও দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও এই ঘটনার প্রতি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং সরকারি তৎপরতা দ্রুততার সঙ্গে তদারকি করার আহ্বান জানিয়েছেন।

বিমানবন্দরের ব্যবসায়ী ও কার্গো অপারেটররা বলছেন, এই দুর্ঘটনা কেবল ক্ষতির বিষয় নয়, বরং দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আমদানি কার্যক্রমেও বড় প্রভাব ফেলবে। কার্গো ভিলেজে সাধারণত গুরুত্বপূর্ণ পণ্য যেমন ওষুধ, প্রযুক্তি পণ্য ও উৎপাদন সামগ্রী সংরক্ষিত থাকে। আগুনে এসব পুড়ে যাওয়ার ফলে সরবরাহ শৃঙ্খলে জটিলতা দেখা দিতে পারে এবং ব্যবসায়ীরা উল্লেখযোগ্য ক্ষতির মুখে পড়বেন।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আলী আহাম্মেদ খান আরও জানিয়েছেন, আগুন নেভানোর সময় উপস্থিত কর্মকর্তা ও কর্মীরা দ্রুত ব্যবস্থা নিলে হয়তো ক্ষতি কমানো যেত। তবে প্রাথমিক ভুল ও অভিজ্ঞতার অভাব এই আগুনকে ভয়াবহ আকারে ছড়িয়ে দিয়েছে। তিনি সুপারিশ করেছেন, ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা এড়াতে কার্গো ভিলেজে আধুনিক অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা স্থাপন এবং নিয়মিত প্রাকটিস ও প্রস্তুতি নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজের এই অগ্নিকাণ্ড শুধু ব্যবসায়ীদের জন্যই নয়, সাধারণ যাত্রীদের জন্যও উদ্বেগের কারণ। দীর্ঘ সময় ফ্লাইট বন্ধ থাকায় যাত্রীদের উড়োজাহাজে ওঠানামা ব্যাহত হয়েছে, শিডিউল বিলম্বিত হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে প্রভাব পড়েছে। বিমানবন্দরের পরিচালনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর পরবর্তী সময়ে ফ্লাইট চলাচল স্বাভাবিক হচ্ছে, তবে ক্ষতিগ্রস্ত সামগ্রী পুনরায় সরবরাহ এবং নতুন অগ্নি সুরক্ষা ব্যবস্থা স্থাপনের জন্য সময় লাগবে।

এই দুর্ঘটনা দেশের বড় একটি বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা সামনে নিয়ে এসেছে। ব্যবসায়ী, কর্মকর্তা এবং সরকারের নজরদারি প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে একমত হয়েছেন। অনেকেই বলছেন, কার্গো ভিলেজে এমন ধরনের দাহ্য পদার্থ সংরক্ষণের জন্য আরও কঠোর নিয়ম থাকা উচিত এবং আগুন নেভানোর আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষিত কর্মী থাকা আবশ্যক।

পরবর্তী সময়ে ফায়ার সার্ভিস, বিমান কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক সংগঠন যৌথভাবে তদন্ত শুরু করবে এবং আগুন লাগার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করবে। তবে প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, কার্গো ভিলেজের কুরিয়ার শাখায় কোনো বৈদ্যুতিক সমস্যা বা ছোট আগুন থেকেই এই বড় অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হতে পারে।

এ ঘটনা দেশের নাগরিক ও ব্যবসায়িক মহলে সতর্কবার্তা হিসেবে ধরা হচ্ছে। অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, যদি ভবিষ্যতে আরও কড়াকড়ি না করা হয়, তবে এমন ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে। ফলে বিমানবন্দর ও কার্গো ব্যবস্থার নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা এখন সময়ের দাবি।

এভাবে সাত ঘণ্টা ফ্লাইট বন্ধ থাকায় যাত্রী, ব্যবসায়ী এবং বিমানবন্দর কর্মীরা ব্যাপক অসুবিধার মুখোমুখি হন। সরকারের পক্ষ থেকে জানিয়েছে, ক্ষতির পরিমাণ চূড়ান্তভাবে নিরূপণ করা হবে এবং যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তবে এ ঘটনায় ব্যবসায়ীদের আর্থিক ক্ষতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিরূপ প্রভাব যে দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে, তা সকলেই মানছেন।

এভাবেই ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের মুখোমুখি হয়েছে, যা দেশের বিমান ও বাণিজ্য ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত