রেকর্ড ভাঙা স্বর্ণের দাম: ২০ অক্টোবরের নতুন মূল্য

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৪৪ বার
দেশে স্বর্ণের বাজারে নতুন দামের পরিসংখ্যান

প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৫। নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের বাজারে আবারও বেড়েছে স্বর্ণের দাম, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ দামের নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। রোববার (১৯ অক্টোবর) বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি (বাজুস)-এর স্ট্যান্ডিং কমিটি অন প্রাইসিং অ্যান্ড প্রাইস মনিটরিং-এর বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠক শেষে বাজুসের চেয়ারম্যান মাসুদুর রহমান স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে নতুন দামের ঘোষণা দেওয়া হয়, যা সোমবার (২০ অক্টোবর) থেকে সারা দেশে কার্যকর হচ্ছে।

বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, সবচেয়ে ভালো মানের বা ২২ ক্যারেট স্বর্ণের প্রতি ভরির দাম বেড়েছে এক হাজার ৫০ টাকা। ফলে এক ভরি (১১ দশমিক ৬৬৪ গ্রাম) স্বর্ণের দাম এখন দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ১৭ হাজার ৩৮২ টাকা। একই সঙ্গে ২১, ১৮ এবং ১৪ ক্যারেট স্বর্ণের দামও সমন্বয় করা হয়েছে অনুপাতে। নতুন এই মূল্য নির্ধারণ কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম ইতিহাসের সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছেছে।

বাজুসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণ বা ‘পাকা সোনা’র দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ওঠানামা ও স্থানীয় বাজারে সরবরাহ ব্যয়ের চাপের কারণে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দফায় দফায় দাম বাড়ছে। প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, স্থানীয় বাজারে স্বর্ণ আমদানির খরচ ও ডলারের মূল্যবৃদ্ধির চাপও এর পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে।

বাজুসের এক সিনিয়র কর্মকর্তা বলেন, “আমরা নিয়মিতভাবে বিশ্ববাজার ও দেশীয় বাজারের স্বর্ণের মূল্যের পার্থক্য পর্যবেক্ষণ করি। সাম্প্রতিক সময়ে স্থানীয় চাহিদা ও কাঁচা সোনার মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় সমন্বয় ছাড়া উপায় ছিল না।”

তবে আন্তর্জাতিক বাজারে গত সপ্তাহে স্বর্ণের দাম উল্টো নিম্নমুখী ছিল। শুক্রবার (১৭ অক্টোবর) নিউইয়র্ক কমোডিটি এক্সচেঞ্জে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম হঠাৎ কমে ২ শতাংশেরও বেশি নেমে আসে। বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীনকে কেন্দ্র করে নতুন অর্থনৈতিক মন্তব্য এবং ডলারের শক্তিশালী অবস্থান বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম কমিয়ে দিয়েছে। বিনিয়োগকারীরা ডলারে ঝুঁকেছেন, ফলে স্বর্ণে বিনিয়োগ কিছুটা কমেছে।

কিন্তু বাংলাদেশে তার বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে। বিশ্ববাজারে দাম কমলেও দেশীয় বাজারে সোনার দাম বাড়ছে ধারাবাহিকভাবে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাংলাদেশে স্বর্ণ আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক, ডলার সংকট, পরিবহন ব্যয় ও কাঁচামালের সরবরাহ সংকটের কারণে বিশ্ববাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দাম কমানো সম্ভব হচ্ছে না।

রাজধানীর বায়তুল মোকাররম জুয়েলারি মার্কেটের একজন অভিজ্ঞ স্বর্ণ ব্যবসায়ী মো. কামাল উদ্দিন বলেন, “বিশ্ববাজারে দাম কমলেও দেশে সরবরাহে সমস্যা রয়েছে। অনেক জুয়েলারি প্রতিষ্ঠান পুরনো দামে কেনা কাঁচা স্বর্ণ বিক্রি করছে নতুন মূল্যে। ফলে বাজারে দামের সমন্বয় দ্রুত হয় না।”

তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশে এখন বিয়ের মৌসুম সামনে। এ সময়টায় স্বর্ণের চাহিদা বাড়ে। ফলে ব্যবসায়ীরা কিছুটা বাড়তি দাম রাখতে বাধ্য হন। তবে এটি দীর্ঘমেয়াদি নয়, ডলার ও সরবরাহ পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে দাম আবার কিছুটা কমতে পারে।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে স্বর্ণের বাজার এখন অনেকটাই মনস্তাত্ত্বিক চাপে চলছে। ক্রেতারা মনে করছেন দাম আরও বাড়বে, ফলে আগেভাগেই ক্রয় করছেন। এই ‘প্রত্যাশার অর্থনীতি’ বাজারে কৃত্রিম চাহিদা তৈরি করছে। এতে ছোট ও মধ্যম আয়ের মানুষ স্বর্ণ কেনায় নিরুৎসাহিত হচ্ছেন, অথচ বিয়ের মৌসুমে এটি প্রয়োজনীয় পণ্য হিসেবে রয়ে গেছে।

অর্থনীতিবিদ ড. আসাদুজ্জামান বলেন, “বাংলাদেশের স্বর্ণবাজার এখন বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। ডলারের দাম বাড়লেই আমদানিকৃত পণ্যের খরচ বাড়ে, স্বর্ণও তার ব্যতিক্রম নয়। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলে ব্যাঘাত এবং স্থানীয় ট্যাক্স কাঠামোর প্রভাবও এখানে কাজ করছে।”

গত এক বছরে দেশে স্বর্ণের দাম বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ। ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে যেখানে ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম ছিল এক লাখ ৫৫ হাজার টাকার নিচে, সেখানে মাত্র এক বছরে তা ২ লাখ ১৭ হাজার টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। এই দামে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত ক্রেতাদের জন্য স্বর্ণ এখন অনেকটাই ‘অপূরণীয় বিলাসপণ্য’।

অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক বাজারে সম্প্রতি রেকর্ড ভাঙা দামের পর হঠাৎ পতনের পেছনে ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাও বড় ভূমিকা রাখছে। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা, মার্কিন অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত এবং বৈশ্বিক মুদ্রানীতি কড়াকড়ির কারণে বিনিয়োগকারীরা ধীরে ধীরে স্বর্ণ থেকে সরে যাচ্ছেন। এর ফলে গত সপ্তাহে বিশ্ববাজারে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম নেমে এসেছে ২,৩২৫ ডলারে।

তবুও বাংলাদেশের বাজারে স্বর্ণের দাম বাড়ানোর পেছনে যুক্তি হিসেবে বাজুস বলছে, দেশের ভেতরকার উৎপাদন খরচ, ডলার ঘাটতি এবং আমদানিনির্ভর কাঁচা স্বর্ণের মূল্যবৃদ্ধি আন্তর্জাতিক প্রবণতার চেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে। তারা আশ্বস্ত করেছে, বৈশ্বিক বাজারে দাম কমা স্থায়ী হলে দেশের বাজারেও তার প্রতিফলন পড়বে।

এদিকে নতুন এই মূল্য বৃদ্ধির পর বাজারে স্বর্ণ বিক্রি কিছুটা ধীরগতিতে শুরু হয়েছে। রাজধানীর নিউমার্কেট, বায়তুল মোকাররম ও ধানমন্ডি এলাকার দোকানগুলোতে রবিবার বিকেলে ক্রেতাদের উপস্থিতি ছিল তুলনামূলক কম। দোকান মালিকরা বলছেন, দাম আরও বাড়ার আশঙ্কায় কেউ কেউ এখনই কিনে নিচ্ছেন, আবার অনেকেই অপেক্ষায় আছেন দাম কমার।

এমন প্রেক্ষাপটে সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। গৃহিণী লায়লা পারভীন বলেন, “গত বছর আমার মেয়ের জন্য এক ভরি স্বর্ণ কিনেছিলাম এক লাখ ৬০ হাজার টাকায়, এখন সেটা কিনতে গেলে দিতে হচ্ছে আরও প্রায় ৬০ হাজার টাকা বেশি। এটা সত্যিই হতাশাজনক।”

স্বর্ণের দাম এভাবে ক্রমাগত বাড়তে থাকলে সেটি দেশের গয়না শিল্পেও প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন কারিগররা। স্বর্ণকার ইউনিয়নের সভাপতি শহীদুল ইসলাম বলেন, “কাঁচামালের দাম বাড়লে আমাদের উৎপাদন খরচও বাড়ে। এতে ছোট ব্যবসায়ীরা টিকতে পারে না, কাজের অর্ডারও কমে যায়। অনেক কারিগর এখন অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন।”

বাংলাদেশের স্বর্ণবাজারে ২০২৫ সালের অক্টোবরের এই রেকর্ড মূল্য আবারও প্রমাণ করল, বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রভাব স্থানীয় বাজারে কতটা গভীরভাবে কাজ করছে। ডলারের শক্তিশালী অবস্থান, স্থানীয় চাহিদা বৃদ্ধি, আমদানি খরচ এবং সরবরাহের জট—সব মিলিয়ে এই মুহূর্তে স্বর্ণের বাজার যেন ‘গরম আগুনে হাত’ দেওয়ার মতো অবস্থায় পৌঁছেছে। এখন কেবল সময়ই বলে দেবে, এই রেকর্ড দাম স্থায়ী হয় কি না, নাকি বিশ্ববাজারের মতোই হঠাৎ একদিন স্বর্ণের বাজারেও ঠান্ডা বাতাস বইবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত