প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা, বাংলাদেশ ডেস্ক, একটি বাংলাদেশ অনলাইন
মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলায় রোববার এক বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশে ঘোর হুড়োহুড়ি দেখা গেছে; দাবিটা স্পষ্ট—হিন্দুত্ববাদী উগ্র সংগঠন হিসেবে উঠে আসা ইসকনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে হবে। সভায় অংশগ্রহণকারীরা দাবি করেছেন, দলটি দেশের ধর্মীয় সংহতি নষ্ট করছে, মুসলিমদের ওপর ধাপিয়ে পড়ছে, এবং ‘দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র’-এ জড়িত নীতিহীন কার্যকলাপে লিপ্ত রয়েছে। এমন অভিযোগ তুলে তারা বলছেন যে, ইসকনের কার্যক্রম শিবচরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ইতোমধ্যে ধীরেই সক্রিয় হয়ে উঠেছে। উপস্থিত জনতা মিছিল শুরু করে উপজেলার ৭১ চত্বরে, সেখান থেকে বিভিন্ন প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে একই স্থানে ফিরে এসে বিক্ষোভ সমাবেশে মিলিত হয়। মিছিল ও সমাবেশ শেষে অংশগ্রহণকারীরা সরকারের কাছে দাবি জানান—ততক্ষণ শিবচরের মাটিতে ইসকনের কোনো কার্যক্রম চলতে দেওয়া হবে না।
সমাবেশের সভাপতির বক্তব্যে হাজী শরীয়তুল্লাহ (রহ.) সমাজ কল্যাণ পরিষদের পীরজাদা হানজালা বলেন, “ইসকন একটি উগ্র সংগঠন, যারা ধর্মের নামে সন্ত্রাস চালাচ্ছে। আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী ভাইদের শত্রু নই, তারা এ দেশের নাগরিক এবং আমরা তাদের সম্মান করি। তবে ইসকনের বিচার না হওয়া পর্যন্ত শিবচরের মাটিতে তাদের আর কোনো কার্যক্রম চলতে দেয়া হবে না।” তিনি আরও বলেন যে, শুধু স্থানীয় নয়—দেশজুড়ে বিভিন্ন এলাকায় মুসলিম খতিব ও ওলামাদের গুম, আইনজীবী হত্যা, নারী নির্যাতন, ধর্ষণ ও উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ইসকনের নাম যুক্ত হয়েছে। এই অবস্থায় তারা বলছেন, শুধুই বিক্ষোভ বা প্রতিবাদ নয়—সরকার থেকে প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ চাই।
তবে এই সমাবেশ ও দাবির প্রেক্ষাপটে অনলাইনভাবে খোঁজ নেওয়া তথ্য মোতাবেক দেখা গেছে, ইসকন-সংক্রান্ত অভিযোগ-বিচার এখনো নির্ভরযোগ্যভাবে প্রমাণিত হয়নি। উদাহরণস্বরূপ, গত বছর ২৮ নভেম্বর Dhaka High Court-র একটি রায়ে ইসকনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার আবেদন খারিজ করে দেওয়া হয়; আদালতে বলা হয়, সরকার ইতিমধ্যে বিষয়টি নিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে। পাশাপাশি আদালত মন্তব্য করেছে যে, দেশের ধর্মীয় সম্প্রীতি ও বন্ধুত্ব বজায় রাখতে হবে। এই রায়ের পর থেকে সমালোচনার পর্যায়ে রয়েছে—একদিকে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার ও নিরাপত্তা-প্রেক্ষাপট, অন্যদিকে ‘উগ্র সংগঠন’ হিসেবে ইসকনের বিরুদ্ধে তোলা অভিযোগের অনুসন্ধান ও প্রমাণের ঘাটতি।
ইসকন বাংলাদেশ অবশ্য অভিযোগ ব্যাপকভাবে অস্বীকার করেছে। তারা বলেছে যে, তাদের সংগঠনের বিরুদ্ধে প্রচার করা হচ্ছে ভুল ও বানোয়াট তথ্যের ধারাবাহিক প্রচেষ্টা। সংগঠন জানায়, “আমরা কখনও সন্ত্রাস বা উসকানিমূলক কার্যক্রমে লিপ্ত ছিলাম না। তথাপি বিভিন্ন মহল আমাদের দায়ী করছে।” তাদের যুক্তি যে, কিছু ব্যক্তিগতভাবে সংগঠনের নাম ব্যবহার করেছে এবং তাদের সঙ্গে সংগঠন-রসিদগত কোনো সম্পর্ক নেই।
বর্তমানে শিবচরের বিক্ষোভ কার্যক্রম রাজনৈতিক ও সামাজিক দুই দিকেই বিশ্লেষণ সাপেক্ষ। এক দিকে আছে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও ভাবমূর্তিকে ঘিরে উদ্বেগ, অন্য দিকে রয়েছে অধিকার-সংহতির দাবি ও ধর্মীয় রূপান্তর-বিষয়ক দুর্বলতাগুলো নিয়ে বৃহত্তর প্রশ্ন। সেখানে ইসকন‐বিরোধী এই মিছিলে অংশগ্রহণ ও সমাবেশ আয়োজন করেছে “হাজী শরীয়তুল্লাহ (রহ.) সমাজ কল্যাণ পরিষদ” নামে একটি সংগঠন, যার বক্তব্য মুসলিম সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও সংহতির কথা বলে। স্থানীয় আলোচনা বলছে, এসব বিক্ষোভের পেছনে রয়েছে ভেতরের রাজনৈতিক প্রভাবও—নির্বাচনবর্তী সময় অঞ্চলে ধর্মীয় আবেগ ও রাজনৈতিক উত্তেজনা উভয়ের সংমিশ্রণ দেখা দিচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে সরকারের এগিয়ে আসা জরুরি। কারণ, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা, ধর্মীয় সম্প্রীতি ও আইন ও শৃঙ্খলার তত্ত্বাবধান—তিনটি একসঙ্গে নিশ্চিত না হলে দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি তুলনায় স্বীকারযোগ্য হবে। এখনও দেখা যায়নি যে, বিক্ষোভে তোলা দাবিগুলি অনুসন্ধান-হিসাব পর্যন্ত গিয়েছে কি না, বা সংশ্লিষ্ট দৃষ্টিকোণ থেকে তদন্ত কতদূর এগিয়েছে। তবে শিবচরের মঞ্চ থেকে উঠে আসা এক-কথায় চ্যালেঞ্জ স্পষ্ট: “ইসকনকে বিচার ও নিষিদ্ধ করা হোক।”
আমরা এই প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্য সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট, অনলাইন সংবাদমাধ্যম এবং আদালত ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর বিবৃতির পর্যালোচনায় তৈরি করেছি। সংগঠন টিকিয়ে রাখা হয়েছে নিরপেক্ষভাবে—যে কোনো পক্ষের সমর্থন-বিরোধেই আমরা থাকিনি। দৈর্ঘ্য ও ভাষা-গঠন পেশাদারিত্ব ও দায়বদ্ধতা বিবেচনায় রেখে করা হয়েছে। আগামী দিনে এই বিষয় নিয়ে আরও অনুসন্ধান ও সাক্ষ্যভিত্তিক প্রতিবেদনের সম্ভাবনা রয়েছে।