প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৫ | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
রাজধানী ঢাকার আগারগাঁওয়ে পরিকল্পনা কমিশনের এনইসি সম্মেলন কক্ষে সোমবার সকালে শুরু হয়েছে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে নবম যৌথ অর্থনৈতিক কমিশনের (জেইসি) বৈঠক। দুই দেশের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক নতুনভাবে গতিশীল করতে আয়োজিত এই বৈঠককে উভয় দেশই বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। দীর্ঘদিনের স্থবির কূটনৈতিক সম্পর্কের পর উচ্চ পর্যায়ের এই বৈঠক দুই দেশের মধ্যে আস্থার সেতুবন্ধন গড়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বাংলাদেশের পক্ষে বৈঠকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ, আর পাকিস্তানের পক্ষে নেতৃত্ব দিচ্ছেন দেশটির পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী আলী পারভেজ মালিক। বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলে ১৫ সদস্য এবং পাকিস্তানের প্রতিনিধি দলে রয়েছেন ১৪ জন কর্মকর্তা। দুই পক্ষই আশা প্রকাশ করেছেন যে বৈঠক শেষে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়াতে কয়েকটি খাতে সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষর হতে পারে।
বৈঠকের আলোচনায় প্রধানত গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ সুরক্ষা, কৃষি, ব্যাংকিং ও আর্থিক সেবা, জ্বালানি খাত, শিক্ষা ও প্রযুক্তি সহযোগিতা ইত্যাদি বিষয়ে। এছাড়া পাকিস্তান থেকে সাশ্রয়ী দামে জ্বালানি আমদানি ও বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, ওষুধ এবং কৃষিপণ্য রপ্তানি বৃদ্ধির বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে বলে জানা গেছে।
কূটনৈতিক সূত্র বলছে, বৈঠকে দুই দেশের প্রতিনিধি দল বাণিজ্য ভারসাম্য পুনঃনির্ধারণ, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কর সুবিধা ও দ্বৈত কর পরিহারের মতো বিষয়েও আলোচনা করছে। বিশেষ করে টেক্সটাইল, চামড়া, ওষুধ শিল্প এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতে যৌথ বিনিয়োগের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বৈঠকের উদ্বোধনী বক্তব্যে বলেন, “দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীল অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানো সময়ের দাবি। বাংলাদেশ ও পাকিস্তান ঐতিহাসিকভাবে পরস্পরের ঘনিষ্ঠ বাণিজ্য অংশীদার হতে পারে, যদি পারস্পরিক আস্থা ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।” তিনি আরও বলেন, “আমরা বিশ্বাস করি, পারস্পরিক বোঝাপড়া ও উন্মুক্ত বাণিজ্যের মধ্য দিয়েই দুই দেশের জনগণ উপকৃত হবে।”
অন্যদিকে পাকিস্তানের প্রতিনিধি দলের প্রধান আলী পারভেজ মালিক বলেন, “বাংলাদেশের দ্রুত অর্থনৈতিক অগ্রগতি দক্ষিণ এশিয়ার জন্য একটি অনুপ্রেরণা। পাকিস্তান বাংলাদেশে জ্বালানি, ব্যাংকিং এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে আগ্রহী।” তিনি আরও জানান, “আমরা চাই দুই দেশ একে অপরের সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক অংশীদারত্বকে আরও দৃঢ় করুক।”
বৈঠকের একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হচ্ছে জ্বালানি সহযোগিতা। পাকিস্তান প্রাকৃতিক গ্যাস এবং পেট্রোলিয়াম পণ্য রপ্তানিতে বাংলাদেশকে প্রযুক্তিগত সহায়তা দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ প্রস্তাব দিয়েছে নবায়নযোগ্য জ্বালানির যৌথ গবেষণা ও উৎপাদনে দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করতে পারে।
এ ছাড়া শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিনিময়, উচ্চশিক্ষায় গবেষণা সহায়তা, এবং ছাত্র বিনিময় কর্মসূচি চালুর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে একাডেমিক সহযোগিতার প্রস্তাব রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ–পাকিস্তান অর্থনৈতিক সম্পর্কের পুনরুজ্জীবন কেবল দুই দেশের জন্য নয়, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্যও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। একসময় রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে স্থবির হয়ে পড়া সম্পর্ক এখন ধীরে ধীরে বাস্তব অর্থনৈতিক স্বার্থের ভিত্তিতে পুনর্গঠনের পথে যাচ্ছে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, বাংলাদেশের দ্রুত প্রবৃদ্ধি ও পাকিস্তানের শিল্পখাতের সম্ভাবনা একে অপরের পরিপূরক হতে পারে। তবে তারা সতর্ক করে দিয়েছেন যে অতীতের রাজনৈতিক অনাস্থা দূর না হলে এই ধরনের বৈঠকের বাস্তব সুফল পাওয়া কঠিন হবে।
বৈঠক শেষে উভয় পক্ষ একটি যৌথ বিবৃতি দিতে পারে বলে সূত্রে জানা গেছে। এতে দুই দেশের মধ্যে “দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সহযোগিতা” প্রতিষ্ঠার রূপরেখা ঘোষণা করা হতে পারে।
বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে জেইসি (Joint Economic Commission) গঠন হয় ১৯৭৮ সালে। সর্বশেষ অষ্টম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১৬ সালে ইসলামাবাদে। প্রায় নয় বছর পর অনুষ্ঠিত নবম এই বৈঠককে দুই দেশের কূটনৈতিক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বৈঠক শেষে আগামীকাল মঙ্গলবার দুই দেশের মধ্যে সম্ভাব্য সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন করার কথা রয়েছে।