মেট্রোরেলের বিয়ারিং প্যাড দুর্ঘটনা: গুণগত মান যাচাইয়ে কমিটি গঠনের নির্দেশনা চেয়ে রিট

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৫৮ বার

প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৫ | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন

রাজধানীর ফার্মগেট এলাকায় মেট্রোরেলের বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়ে এক যুবকের মৃত্যুর ঘটনায় সারাদেশে আলোচনার ঝড় উঠেছে। ওই দুর্ঘটনার পর মেট্রোরেলের নির্মাণমান ও নিরাপত্তা নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন উঠেছে। ঘটনাটির পরদিন সোমবার হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় মেট্রোরেল ও দেশের বিভিন্ন ফ্লাইওভারের বিয়ারিং প্যাডের গুণগত মান যাচাইয়ের জন্য একটি স্বাধীন বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠনের নির্দেশনা চেয়ে রিট আবেদন করা হয়েছে।

রিটটি দায়ের করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. শাহনেওয়াজ কবির। তিনি জানান, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে চলমান বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর নিরাপত্তা এখন জনআস্থার জায়গা থেকে প্রশ্নের মুখে। মেট্রোরেলের মতো বৃহৎ জাতীয় প্রকল্পে ব্যবহৃত বিয়ারিং প্যাড যদি মানহীন হয়, তবে এটি কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং একটি বড় প্রশাসনিক ও প্রকৌশলগত ব্যর্থতার প্রতিফলন। তাই আদালতের হস্তক্ষেপ এখন অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।

রিটে বিবাদী করা হয়েছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়, ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল), রাজউক, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে। আদালতের কাছে আবেদন জানানো হয়েছে যেন মেট্রোরেল, ফ্লাইওভার ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে ব্যবহৃত বিয়ারিং প্যাডগুলোর গুণগত মান যাচাই করতে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়, যাতে কমিটিতে প্রকৌশলী, সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ এবং বিচার বিভাগের প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত থাকেন।

ভারতে পালানোর পথে ‘আজিজুল ইসলাম আজিজ’ : শামীম ওসমানের সহযোগী গ্রেপ্তার

রিটে আরও দাবি করা হয়েছে, এই ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সরকারের ব্যর্থতা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না এবং নিহত আবুল কালামের পরিবারকে কেন ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে না—এ বিষয়ে রুল জারি করার নির্দেশও দেওয়া হোক।

রবিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে রাজধানীর ফার্মগেট এলাকায় এমআরটি লাইন-৬ এর উড়াল সেতুর নিচে হঠাৎ একটি বিয়ারিং প্যাড খুলে নিচে পড়ে যায়। ওই সময় নিচ দিয়ে যাচ্ছিলেন মোটরসাইকেল আরোহী আবুল কালাম (৩২)। বিয়ারিং প্যাডটি তার মাথায় আঘাত করলে তিনি ঘটনাস্থলেই মারা যান। নিহত আবুল কালামের গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুর জেলার নড়িয়া উপজেলার ঈশরপাটি গ্রামে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ঢাকায় রাইডশেয়ারিং চালক হিসেবে কাজ করতেন।

দুর্ঘটনার পরপরই মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে ট্রেন চলাচল স্থগিত করে এবং অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু করে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও ও ছবিগুলো ছড়িয়ে পড়লে জনমনে ক্ষোভ দেখা দেয়। অনেকে অভিযোগ করেন, মেট্রোরেলের কাজের মান নিয়ে আগেও প্রশ্ন উঠেছিল, কিন্তু তাতে তেমন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাবেক সচিব এম.এ.এন. ছিদ্দিক বলেন, “এটি একটি অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা। আমরা তাৎক্ষণিকভাবে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে, যান্ত্রিক ত্রুটি বা স্থাপনা রক্ষণাবেক্ষণে কোনো দুর্বলতা থেকে এই দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তদন্তের রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না।”

সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এক বিবৃতিতে বলেন, “ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। আমরা প্রকল্প বাস্তবায়নে কোনো গাফিলতি মেনে নেব না। যদি কারও দায়িত্বহীনতা পাওয়া যায়, তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

অন্যদিকে নিহত আবুল কালামের পরিবার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছে, “সরকারি প্রকল্পে যদি এত বড় দুর্ঘটনা ঘটে, তবে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়?” তার ছোট ভাই আব্দুল হালিম বলেন, “আমার ভাই সারা জীবন পরিশ্রম করেছে। এখন যদি একটা লোহার টুকরার নিচে চাপা পড়ে তার মৃত্যু হয়, এর বিচার কে করবে?”

রোববার বিকেলে ফার্মগেটের ঘটনার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন সেতু বিভাগ ও মেট্রোরেল প্রকল্পের কর্মকর্তারা। রাতেই নিহত আবুল কালামের মরদেহ ঢাকা থেকে তার গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুরে পাঠানো হয়। সোমবার সকালে নড়িয়া উপজেলার ইশ্বরপাটি গ্রামে অনুষ্ঠিত হয় তার দ্বিতীয় জানাজা। সেখানে অংশ নেন শত শত মানুষ, যারা ক্ষোভ ও শোক প্রকাশ করেন। পরে স্থানীয় কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিয়ারিং প্যাড হলো যে অংশটি সেতুর গার্ডার ও পিলারের সংযোগস্থলে ভারসাম্য বজায় রাখে। এটি কোনো কারণে আলগা হয়ে পড়লে বড় দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা থাকে। তাদের মতে, সেতু বা উড়ালসেতুর মতো কাঠামোতে এই অংশের রক্ষণাবেক্ষণ নিয়মিত না করলে বিপর্যয় ঘটতে পারে।

প্রকৌশলী ও সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের অনেকে মনে করেন, মেট্রোরেলের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে নিয়মিত নিরাপত্তা অডিট না হওয়ায় এমন দুর্ঘটনা ঘটছে। সাবেক প্রকৌশলী ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক (অব.) ইঞ্জিনিয়ার রফিকুল ইসলাম বলেন, “মেট্রোরেল বা ফ্লাইওভারের মতো স্থাপনায় বিয়ারিং প্যাডের রক্ষণাবেক্ষণ বছরে অন্তত দু’বার করা উচিত। কিন্তু আমাদের দেশে তা নিয়মিত হয় না। সরকারের উচিত এ বিষয়ে একটি স্থায়ী নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা।”

জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামী, মীর কাসেম আলী, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সাবেক সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীসহ অনেক আলেম-ওলামাকে মিথ্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।”

বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি মো. খিজির হায়াতের হাইকোর্ট বেঞ্চে আগামী সপ্তাহে রিটটির শুনানি হতে পারে। আদালত যদি রিট গ্রহণ করে, তবে প্রথমবারের মতো দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগুলোর নিরাপত্তা মান যাচাইয়ের জন্য বিচার বিভাগীয় নজরদারি শুরু হতে পারে।

এই রিটের মাধ্যমে শুধু একটি দুর্ঘটনার বিচার নয়, বরং ভবিষ্যতে এমন নির্মাণ ত্রুটির দায় এড়াতে সরকার ও প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করার পথও উন্মুক্ত হতে পারে।

শেষ পর্যন্ত, আবুল কালামের মৃত্যুর এই ট্র্যাজেডি কেবল এক পরিবারের শোক নয়, বরং একটি বার্তা—বড় প্রকল্পে অবহেলা মানে মানবজীবনের ঝুঁকি। এখন প্রশ্ন হলো, প্রশাসনিক পদক্ষেপের বাইরেও প্রকৃত দায় কার? হাইকোর্টের আসন্ন শুনানিতে হয়তো সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজবে পুরো দেশ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত