প্রকাশ: ১৪ নভেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
প্রচণ্ড গরমে হাঁটাহাঁটি বা বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডার সময়, কিংবা পারিবারিক আড্ডা—যেকোনো উপলক্ষ্যেই সোফট ড্রিংকস যেন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। কোমল পানীয়ের চটজলদি ঠান্ডা স্বস্তি দেয়ার ক্ষমতা তরুণদের কাছে আকর্ষণীয় মনে হলেও এই অভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি।
একটি সাধারণ ২৫০ মিলিলিটার সোফট ড্রিংকে গড়ে ৭ থেকে ১০ চা চামচ চিনি থাকে। এটি আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) যে পরিমাণ চিনি একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দৈনিক গ্রহণের সীমা হিসেবে নির্ধারণ করেছে, তার চেয়ে অনেক বেশি। অর্থাৎ, এক গ্লাসই পুরো দিনের চাহিদা অতিক্রম করে, এবং অন্যান্য খাবারের সঙ্গে মিলিয়ে দৈনিক চিনি গ্রহণ অনেক বেশি হয়ে যায়।
বাংলাদেশে ২৫ বছরের কম বয়সী তরুণদের মধ্যেও টাইপ-২ ডায়াবেটিসের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। একসময় এই রোগকে শুধু বয়স্কদের রোগ বলে মনে করা হতো। তবে চিকিৎসকেরা বলছেন, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, রাত জাগা, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এবং প্রতিদিনের মিষ্টি পানীয়—এসবই মূল কারণ। বিশেষ করে তরুণরা প্রতিদিনের এই অভ্যাসের ফলে ধীরে ধীরে শরীরে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স তৈরি করছে।
এন্ডোক্রাইন বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, নিয়মিত সফট ড্রিংকস খাওয়ার ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা ধীরে ধীরে বেড়ে যায়। তরুণরা প্রাথমিক পর্যায়ে এতে সচেতন হন না, ফলে টাইপ-২ ডায়াবেটিস নীরবে বাড়ছে। চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন, রোগ প্রতিরোধে সচেতন হওয়া খুবই জরুরি।
অনেকে মনে করেন, ‘ডায়েট কোক’ বা ‘জিরো সুগার’ লেখা পানীয় খেলে স্বাস্থ্য ঝুঁকি কমে। কিন্তু এ ধরনের পানীয়েও কৃত্রিম মিষ্টিকারক যেমন অ্যাসপারটেম, সুক্রালোজ থাকে, যা দীর্ঘমেয়াদে লিভার, কিডনি এবং অন্ত্রের স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, এগুলোও ইনসুলিন সেনসিটিভিটি কমিয়ে দেয়। তাই শুধুমাত্র ক্যালোরি বা চিনির মান কমানোই নিরাপদ নয়।
সফট ড্রিংকের বিকল্প হিসেবে প্রাকৃতিক ও স্বাস্থ্যকর পানীয় গ্রহণ করা যেতে পারে। লেবুর শরবত বা ফলের পানি, যেখানে চিনি অল্প বা নেই, খাবারের পরে হজমে সাহায্য করে। ডাবের পানি প্রাকৃতিক ইলেকট্রোলাইট সমৃদ্ধ এবং কম ক্যালোরিযুক্ত। গ্রিন টি বা লেমন টি ফাস্টফুড জাতীয় খাবারের পর গ্রহণ করলে হজমে সাহায্য করে এবং অ্যান্টি অক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ।
ডায়াবেটিস শুধু বয়সের নয়, এটি অভ্যাসের রোগ। সফট ড্রিংকস মূর্তিতে গলা ভেজায় এবং তৃষ্ণা মেটায়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে শরীরে মিষ্টি ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তরুণদের উচিত এখন থেকেই পানীয়ের অভ্যাস পরিবর্তন করা। স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি করা, প্রাকৃতিক ও কম চিনি যুক্ত পানীয় গ্রহণ করা, এবং নিয়মিত শারীরিক ক্রিয়াকলাপ ডায়াবেটিস প্রতিরোধে সহায়ক।
চিকিৎসকরা সতর্ক করে বলেন, “প্রতিদিনের ছোট অভ্যাসই দীর্ঘমেয়াদে বড় প্রভাব ফেলে। তরুণরা যদি এখনই সচেতন না হয়, তবে ভবিষ্যতে টাইপ-২ ডায়াবেটিস ও সংশ্লিষ্ট জটিলতায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি।” তারা আরও বলেন, পরিবারের মধ্যেও তরুণদের স্বাস্থ্য সচেতন করার দায়িত্ব আছে। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে স্বাস্থ্য সচেতনতা কর্মসূচি গ্রহণ করা যেতে পারে।
সফট ড্রিংকসের প্রতি তাত্ক্ষণিক আকর্ষণ অনেক হলেও, তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব মারাত্মক। তরুণদের উচিত সচেতন হওয়া এবং স্বাস্থ্যকর বিকল্প পানীয় বেছে নেওয়া। ডায়াবেটিস প্রতিরোধ শুধু ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যের জন্য নয়, এটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।
এভাবে, তরুণদের মধ্যে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে প্রয়োজন জীবনধারায় পরিবর্তন, সঠিক খাদ্যাভ্যাস এবং স্বাস্থ্যকর পানীয়ের দিকে মনোযোগ দেওয়া। শুধু মিষ্টি স্বাদ নয়, স্বাস্থ্যই বড় সম্পদ—এটি তরুণদের মনে রাখতে হবে।