প্রকাশ: ১৬ নভেম্বর ২০২৫ রবিবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
গাজায় যুদ্ধবিরতি চুক্তির আংশিক বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে আরও ১৫ জন ফিলিস্তিনির লাশ ফেরত দিয়েছে ইসরাইল। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির মাধ্যমে লাশগুলো তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। গাজার আকাশে বোমার গর্জন কিছুটা থেমে গেলেও, ফেরত আসা নিথর দেহগুলো যেন যুদ্ধের নিষ্ঠুরতার সবচেয়ে ভয়াবহ সাক্ষ্য হয়ে প্রতিদিন মানবতার বিরুদ্ধে চলমান অপরাধের ইতিহাস লিখে যাচ্ছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, চলতি বছরের ১০ অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত মোট ৩৩০ জন ফিলিস্তিনির লাশ ইসরাইল ফেরত দিয়েছে। এই লাশগুলোর মধ্যে অনেকের পরিচয় এখনও অজানা। ফরেনসিক দলের সদস্যরা এখন পর্যন্ত মাত্র ৯৭টি লাশ শনাক্ত করতে পেরেছে। তারা প্রতিটি দেহ পরীক্ষা করে নথিভুক্ত করছেন, যাতে অন্তত পরিবারের হাতে একবার হলেও স্বজনকে তুলে দেওয়া যায়।
লাশ শনাক্তের এই ধাপটি এখন সবচেয়ে কঠিন হয়ে উঠেছে। কারণ, নিরবচ্ছিন্ন ইসরাইলি হামলায় গাজার প্রায় সব ফরেনসিক ল্যাবরেটরি ইতিমধ্যেই ধ্বংস হয়ে গেছে। যেসব কেন্দ্রগুলো লাশ শনাক্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত, সেগুলো এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত। ফলে অনেক পরিবার পোশাক, শরীরের দাগ বা কোনো পুরোনো চিহ্ন ধরে ধরে প্রিয়জনকে শনাক্ত করার চেষ্টা করছেন—যা কোনো সভ্য সমাজে কল্পনাতীত এক মানবিক যন্ত্রণা।
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ইসরাইল থেকে ফেরত আসা অনেক লাশের শরীরে নির্যাতনের স্পষ্ট চিহ্ন দেখা গেছে। কারও হাত বাঁধা, কারও চোখ বেঁধে রাখা, কারও ওপর দেখা গেছে প্রচণ্ড মারধরের চিহ্ন। অনেকের মুখ বিকৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে, যাদের শেষ চেহারা দেখাটাই হয়ে যাচ্ছে পরিবারের জন্য নতুন এক মানসিক আঘাত। সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো—অসংখ্য লাশ কোনো পরিচয়পত্র বা নথি ছাড়া ফেরত পাঠানো হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে দাফন-কাফন, শোক পালন এমনকি সঠিকভাবে নাম ধরে শেষ বিদায় জানানোও হয়ে উঠছে দুঃসাধ্য।
এদিকে ইসরাইলি দৈনিক হারেৎজ জানিয়েছে, দক্ষিণ ইসরাইলের কুখ্যাত সামরিক ঘাঁটি সদে তেইমানে প্রায় এক হাজার পাঁচশ ফিলিস্তিনির লাশ আটকে রাখা হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো দাবী করছে, এসব লাশ ‘যুদ্ধবন্দির মর্যাদা’ পায়নি, বরং অনেক ক্ষেত্রে তারা জীবিত অবস্থায় নির্যাতনের শিকার হয়েছেন কি না—সেটি নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠছে। আন্তর্জাতিক মহলও এই অমানবিক আচরণের নিন্দা জানিয়েছে, তবে যুদ্ধক্ষেত্রে বাস্তব পরিস্থিতি বদলাতে সেই নিন্দা এখনো কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি।
গাজার মানবিক পরিস্থিতি দীর্ঘদিন ধরে ভয়াবহ। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরাইলের লাগাতার আক্রমণে প্রায় ৬৯ হাজার দুইশ মানুষ নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে এক লাখ সত্তর হাজার সাতশরও বেশি মানুষ। এ সংখ্যাগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়—প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি গল্প, একটি ভবিষ্যৎ, যা এই যুদ্ধের আগুনে এক নিমেষে ভেঙে গেছে।
গাজার হাসপাতালগুলোতে আহতদের জায়গা নেই, জীবন রক্ষার সরঞ্জাম নেই, এক ফোঁটা নিরাপদ পানিও অনেক সময় মিলছে না। এমন অবস্থায় ফেরত আসা প্রতিটি লাশ যেন মানুষের হতাশা আরও গভীর করছে। একদিকে শোক, অন্যদিকে যুদ্ধের ভয়—সব মিলিয়ে গাজায় মানবিক বিপর্যয় এখন চরমে।
ইসরাইল কর্তৃপক্ষ এই লাশ ফেরত দেওয়া প্রক্রিয়াকে ‘যুদ্ধবিরতি চুক্তির অংশ’ হিসেবে দেখলেও, গাজার মানুষ বলছে—এটা কোনো মানবিকতা নয়, বরং নিহতদের প্রতি ন্যূনতম সম্মান দেখানোও যথাযথভাবে হচ্ছে না। তাদের অভিযোগ, লাশগুলোর ওপর বহুদিন ধরে নির্যাতনের চিহ্ন, ক্ষত-বিক্ষত দেহ এবং পরিচয়হীন অবস্থার মধ্যেই প্রমাণ মিলছে যে যোদ্ধা ও সাধারণ মানুষ—ইসরাইলের কাছে সকল ফিলিস্তিনিই যেন এক রকম শত্রু।
সংলাপ, যুদ্ধবিরতি, আন্তর্জাতিক চাপে অস্ত্রবিরতি—এসবের মধ্যেই গাজার মানুষের জীবন প্রতিটি মুহূর্তে দোলাচলে ঝুলে আছে। তবে একটি ভাঙা শহর, বিধ্বস্ত পরিবার আর প্রতিদিন ফেরত আসা লাশের পরও তারা এখনো বেঁচে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
গাজার এই চলমান মানবিক ট্র্যাজেডি নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় নতুন করে ভাববে কি না তা সময়ই বলবে। কিন্তু প্রতিটি ফেরত আসা লাশ যেন বারবার এই প্রশ্নটাই তুলে ধরছে—মানবতার কাছে গাজায় আর কত মৃত্যু, কত যন্ত্রণা দেখতে হবে?