প্রকাশ: ২০ নভেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর সংক্রমণ এ বছর অস্বাভাবিকভাবে দীর্ঘস্থায়ী ও বিস্তৃত হয়ে পড়েছে। সাধারণত বর্ষা মৌসুম কিংবা তার ঠিক পরের মাসগুলোতে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ে; কিন্তু চলতি বছর নভেম্বরেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের পরিসংখ্যান বলছে, অক্টোবরের তুলনায় নভেম্বর মাসে প্রতিদিন গড়ে আরও বেশি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছেন। এ বছর মৃত্যুর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম হলেও মোট আক্রান্তের সংখ্যা গত বছরের চেয়েও বেশি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এতে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত সবাইকে বাড়তি সতর্কতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
গত অক্টোবর মাসে চট্টগ্রামে ৯৯০ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছিলেন, অর্থাৎ প্রতিদিন আক্রান্ত হয়েছিলেন গড়ে প্রায় ৩২ জন। অথচ নভেম্বরের প্রথম ১৯ দিনেই আক্রান্ত হয়েছেন ৭০৪ জন, যা প্রতিদিন গড়ে ৩৭ জন। এটি শুধু অক্টোবরের চেয়ে বেশি নয়, বরং চলতি বছরের যেকোনো মাসের তুলনায় দৈনিক আক্রান্তের হিসেবে সর্বোচ্চ। গতকাল বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৪২ জন রোগী শনাক্ত হওয়ায় পুরো বছরের মোট আক্রান্তের সংখ্যা এসে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ২০৯ জনে। ইতোমধ্যে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা ২২ জনে পৌঁছেছে। সর্বশেষ ১১ নভেম্বর ১০ বছরের শিশু নাদিয়া জান্নাত তাসকিয়ার মৃত্যু এই পরিস্থিতিকে আরও মানবিকভাবে বেদনাদায়ক করে তুলেছে।
চট্টগ্রাম শহর ও উপজেলার তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নভেম্বর মাসে নগর এলাকায় আক্রান্তের সংখ্যা বেশি। গতকাল পর্যন্ত নগরে আক্রান্ত হয়েছেন ৪০২ জন এবং উপজেলাগুলোতে আক্রান্ত ৩০২ জন। উপজেলাগুলোর মধ্যে সীতাকুণ্ড সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত, যেখানে বছরজুড়ে আক্রান্ত হয়েছেন ৮৫৪ জন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানুষের ঘনবসতি, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, মশার প্রজননক্ষেত্র হিসেবে ছাদ, ড্রেন কিংবা পরিত্যক্ত আবাসিক স্থানে জমে থাকা পানি নগরে ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
গত তিন বছরের তথ্য বিশ্লেষণেও দেখা গেছে, শীতের আগমুহূর্তে ডেঙ্গু সংক্রমণ বেড়ে যায়। বিশেষ করে অক্টোবর ও নভেম্বর—এই দুই মাসে সংক্রমণ সাধারণত ঊর্ধ্বমুখী থাকে। এ বছরের আবহাওয়াও ডেঙ্গুর বিস্তারে বড় ভূমিকা রেখেছে। জুন মাসে বর্ষার স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত কিছুটা কম হলেও পরবর্তী মাসগুলোতে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়েছে। নভেম্বরে দুই দফা বৃষ্টি আঘাত হানায় মশার প্রজননচক্র নতুন করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। চট্টগ্রামের কীটতত্ত্ববিদেরা মনে করেন, উচ্চ তাপমাত্রা এবং অসময়ে বৃষ্টির সমন্বয় ডেঙ্গু পরিস্থিতিকে দীর্ঘায়িত করার অন্যতম কারণ।
চট্টগ্রামের প্রধান হাসপাতালগুলোর ওপরও এই বাড়তি চাপ স্পষ্ট। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল, বিআইটিআইডি, সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল চট্টগ্রাম, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে গতকাল পর্যন্ত ভর্তি ছিলেন ১৩৪ জন রোগী। হাসপাতালগুলোর অধিকাংশেই পেডিয়াট্রিক ও মেডিসিন ওয়ার্ডে ডেঙ্গুর রোগীদের জন্য আলাদা বেড রাখার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
চট্টগ্রামের ডেপুটি সিভিল সার্জন মোহাম্মদ তৌহিদুল আনোয়ার বলেন, সাধারণত বৃষ্টি হওয়ার পর ২৮ দিন পর্যন্ত এডিস মশার প্রজনন বাড়ে এবং মশার ঘনত্ব বেশি থাকে। নভেম্বরের অসময়ের বৃষ্টি সেই ঝুঁকি আরও বাড়িয়েছে। থেমে থেমে বৃষ্টি হলে ডেঙ্গুর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, বৃষ্টি আর তাপমাত্রা একইসঙ্গে উচ্চ থাকলে সংক্রমণ আরও বাড়তে পারে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘশ্বাস ফেলা এই পরিস্থিতিতে শুধু স্বাস্থ্যসেবা নয়, নগর ব্যবস্থাপনাও কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে। এর মধ্যে পরিচ্ছন্নতার অভাব, নির্মাণস্থলে ফেলে রাখা সামগ্রী, অযত্নে থাকা বাসাবাড়ির কোণ কিংবা ছাদে জমে থাকা পানি ডেঙ্গুর বিস্তারকে আরও ত্বরান্বিত করছে। নগরের বিভিন্ন এলাকায় এখনো অনেক ড্রেন অচল বা অর্ধেক ভরা অবস্থায় পড়ে আছে। এসব ড্রেনে জমে থাকা বর্জ্য ও পানি এডিস মশার জন্মের বড় ক্ষেত্র তৈরি করে। অথচ স্থানীয়ভাবে এই বর্ষা–পরবর্তী মৌসুমকে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের জন্য সবচেয়ে জরুরি সময় বলা হয়।
জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তারা আরও বলছেন, ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত পরীক্ষা ও চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে যাওয়া অত্যন্ত জরুরি। এখনো অনেক মানুষ প্রথম দিকে উপসর্গকে সাধারণ জ্বর ভেবে অবহেলা করেন, যা পরবর্তীতে জটিলতার ঝুঁকি বাড়ায়। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি দ্রুত খারাপ হতে পারে। চট্টগ্রামে মৃত্যুর সংখ্যা কম থাকলেও প্রতি বছরই গুরুতর রোগী বাড়ছে, যা পরিষ্কারভাবে বলে দেয়—ঝুঁকি কমে যায়নি।
মশা নিয়ন্ত্রণে নগর কর্তৃপক্ষ ফগিং, বিটুমিন স্প্রে ও লার্ভা ধ্বংসে কাজ চালালেও বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ফগিংয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়, কারণ এডিস মশা দিনের বেলায় এবং ঘরের ভেতরে কামড়ায়। তাই ঘরে জমে থাকা পানি, ফুলের টব, ফ্রিজের ট্রে, ব্যবহারহীন বোতল ও কন্টেইনারে পানি যাতে জমে না থাকে, সে বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি। বাসাবাড়ির পাশাপাশি বাণিজ্যিক ভবন, স্কুল-কলেজ ও নির্মাণস্থলে পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্বও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
চট্টগ্রামের ডেঙ্গু পরিস্থিতি তাই এক কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরছে—এটি মৌসুমি রোগ নয়, বরং সারা বছরজুড়ে প্রসারমান একটি জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রোগ নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া কেবল স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। মানুষকে সচেতন করা, নগর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, আবর্জনা ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে ডেঙ্গু প্রতিরোধমূলক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সময়ের দাবি।
চট্টগ্রামবাসীর জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সতর্কতা। কোনো ধরনের পানিজমে থাকা জায়গাকে অবহেলা করা যাবে না। প্রতিটি পরিবারকে প্রতি সপ্তাহে অন্তত একদিন ১০ মিনিট সময় নিয়ে বাড়ির ভেতর-বাহিরে মশার প্রজননক্ষেত্র দূর করার পরামর্শ দিচ্ছেন স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা। সামান্য অবহেলায় একটি পরিবার থেকে পুরো এলাকায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই এই সপ্তাহগুলো ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
চট্টগ্রামের চলমান ডেঙ্গু পরিস্থিতি তাই আর শুধুমাত্র সংখ্যা বা পরিসংখ্যানের বিষয় নয়; এটি মানুষের জীবন ও নিরাপত্তার প্রশ্ন। বর্ষা পেরিয়ে শীতের দিকে এগোলেও সংক্রমণ বাড়ছে—যা জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য বড় সতর্কবার্তা। এখনই কঠোর প্রয়াস না নিলে এই প্রবণতা আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।