জলবায়ু পরিবর্তনে বিপন্ন হচ্ছে ইউনেস্কো ঐতিহ্য ষাটগম্বুজ মসজিদ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৪ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৩২ বার
জলবায়ু পরিবর্তনে বিপন্ন হচ্ছে ইউনেস্কো ঐতিহ্য ষাটগম্বুজ মসজিদ

প্রকাশ: ২৪ নভেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন 

বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের প্রাচীন ইসলামিক স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য ষাটগম্বুজ মসজিদ আজ এক ভয়াবহ সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। জলবায়ু পরিবর্তন, ভূগর্ভস্থ লবণাক্ততা বৃদ্ধি, তাপমাত্রার ওঠানামা এবং শিল্প দূষণের প্রভাবে স্থাপনাটির পুরো কাঠামো দ্রুত ক্ষয়ে যাচ্ছে। দৃশ্যমান ক্ষয় এখন শুধুমাত্র বাইরের সৌন্দর্য নষ্ট করছে না, বরং স্থাপনাটির মূল গঠনকেও বিপদে ফেলছে বলে জানিয়েছে একাধিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান।

বাগেরহাট জেলার ঐতিহাসিক খানজাহান আলী নগরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত এই স্থাপনাটিতে প্রতিদিন হাজারো দেশি-বিদেশি পর্যটকের ভিড় থাকলেও প্রকৃতির নির্মম ক্ষয় থামাতে পারছে না কোনো প্রচেষ্টা। বিশেষ করে সাম্প্রতিক ভিজ্যুয়াল পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, মসজিদের দেয়াল, গম্বুজ, স্তম্ভ এবং মিহরাবে গভীর ফাটল তৈরি হয়েছে। বহু স্থানে চুন খসে পড়ছে এবং দেয়ালের ওপরে সাদা লবণের আস্তরণ দিনের আলোতেই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, নিচের মাটি থেকে উঠে আসা অতিরিক্ত নোনা পানি ইটের ভেতরে লবণ ক্রিস্টাল তৈরি করছে, যা ধীরে ধীরে স্থাপনার শক্তি ও গঠনক্ষমতাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক সোসাইটি এবং আইকমস বাংলাদেশের যৌথ গবেষণায় উদ্বেগজনক পর্যবেক্ষণ উঠে এসেছে। গবেষণায় বলা হয়, বর্ষায় অতিরিক্ত আর্দ্রতা, শুষ্ক মৌসুমে উষ্ণতার তারতম্য, শিল্পদূষণের রাসায়নিক প্রভাব এবং ভূগর্ভস্থ পানির লবণাক্ততা—সবকিছু মিলে ষাটগম্বুজ মসজিদকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। গবেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলে যে নোনা পানির চাপ বাড়ছে, তার সরাসরি আঘাত পড়ছে মসজিদের ভিত্তি এবং ইট-বালির গঠনে। দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা লবণ যখন ইটের ভেতর ক্রিস্টাল আকারে বৃদ্ধি পায়, তখন তা ভেতর থেকে বাইরে চাপ সৃষ্টি করে এবং ফাটল তৈরি করে। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্থাপনার ওজন বহনক্ষমতা কমে আসে, যা আজ স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয়েছে।

এত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হুমকির মুখে পড়ায় প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর জরুরি ভিত্তিতে একটি পাঁচ সদস্যের বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করেছে। সাবেক ডিজি ড. মো. শফিকুল আলমের নেতৃত্বে গঠিত এই কমিটি ইতোমধ্যে মসজিদের বিভিন্ন অংশে সরেজমিন তদন্ত করেছে। তদন্তে দেখা গেছে, বিশেষ করে মিহরাবের গঠন এতটাই দুর্বল হয়ে গেছে যে যেকোনো সময় এটি ধসে পড়তে পারে। মসজিদের ঐতিহাসিক মিহরাবটি পাথরের টুকরা ও চুন-সুরকির মিশ্রণ দিয়ে তৈরি। সেই পাথরগুলোর ভর বহনক্ষমতা ধরে রাখতে যে লোহার ক্ল্যাম্প ব্যবহার করা হয়েছিল, সেগুলোতে জং ধরেছে এবং কিছু অংশে ক্ল্যাম্প ভেঙেও গেছে। ফলে পাথরের ব্লকগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি দেখা দিয়েছে।

আঞ্চলিক প্রত্নতত্ত্ব পরিচালক লাভলী ইয়াসমিন জানিয়েছেন, ইউনেস্কোর সহায়তায় মসজিদের পূর্ণ ক্ষয়-মানচিত্র বা ডিজিটাল ড্যামেজ ম্যাপিং তৈরি করা হবে। এই মানচিত্রে সুনির্দিষ্টভাবে বোঝা যাবে কোন অংশ কী পরিমাণ ক্ষতিগ্রস্ত এবং কোথায় তাৎক্ষণিক মেরামত প্রয়োজন। তিনি বলেন, ইউনেস্কোর ঢাকা অফিস থেকে ইতোমধ্যে বেশ কিছু কারিগরি পরামর্শ এসেছে। সেই পরামর্শের ভিত্তিতে সাময়িক সংরক্ষণ কাজ দ্রুত শুরু করার সুপারিশও করা হয়েছে। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, শুধু সাময়িক মেরামত নয়, দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ পরিকল্পনাও এখন সময়ের দাবি। কারণ স্থাপনাটির ক্ষয় যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, তা থামাতে না পারলে ভবিষ্যতে এটি ‘বিপন্ন বিশ্ব ঐতিহ্য’ হিসেবে তালিকাভুক্ত হতে পারে। এমন সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জন্য শুধু সাংস্কৃতিক বা ঐতিহাসিক ক্ষতি নয়, বরং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বড় ধরনের ভাবমূর্তি সংকট তৈরি করবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ষাটগম্বুজ মসজিদের মতো স্থাপত্যে ব্যবহৃত ঐতিহ্যবাহী উপকরণ আজকে জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবে নতুনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ঐতিহাসিক মসজিদের ইট, চুন-সুরকি, গম্বুজের বাঁকানো নকশা এবং স্থাপত্যশৈলীর বিশেষ বৈশিষ্ট্য সবকিছুই উচ্চ লবণাক্ত পরিবেশের সঙ্গে দীর্ঘদিন লড়াই করতে পারছে না। বাগেরহাট অঞ্চলের মাটি ও পানির নোনা ভাব বাড়ায় মসজিদের নিচের ভিত্তিও অসম শক্তি বহন করছে। বর্ষাকালে অতিরিক্ত আর্দ্রতা ইটের জলীয় অংশ বাড়িয়ে দেয় এবং শুষ্ক মৌসুমে একই ইট দ্রুত শুষ্ক হয়ে ক্ষীণ হয়ে পড়ে, যার ফলে দেয়ালের ভেতরে চাপ সৃষ্টি হয়।

এ এলাকার স্থানীয় মানুষ, মসজিদের ইমাম, মাদ্রাসাশিক্ষক এবং পর্যটকরা খুব উদ্বেগের সঙ্গে এ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। অনেকেই বলেছেন, তাদের শৈশবের স্মৃতি, ইতিহাসের পাঠ এবং ধর্মীয় ঐতিহ্য এই মসজিদের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে। কিন্তু আজ স্থাপনাটি চোখের সামনে ক্ষয়ে যেতে দেখে তারা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা মনে করেন, এই মসজিদ শুধু ধর্মীয় স্থান নয়, পর্যটন শিল্পেরও বড় ভিত্তি। বছরজুড়ে হাজারো মানুষের আগমন অঞ্চলের অর্থনীতিকে সক্রিয় রাখে। আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত শহরটির উন্নয়নেও এর ভূমিকা অপরিহার্য। ফলে মসজিদটির অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়লে তার বহুমাত্রিক ক্ষতি হবে।

গবেষণা প্রতিবেদনে আরও উঠে এসেছে যে শিল্প দূষণ এবং অনিয়ন্ত্রিত যানবাহনের কালো ধোঁয়া মসজিদের বাইরের দেয়ালে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটাচ্ছে। এই বিক্রিয়া চুন-সুরকি ও ইটের বাইরের স্তরে ক্ষয় তৈরি করছে এবং সূক্ষ্ম ধুলো জমে মসজিদের নকশায় অপরিষ্কার স্তর তৈরি করছে। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা অভিমত দিয়েছেন যে, স্থাপনাটিকে ঘিরে থাকা পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণে না আনলে কোনো সংরক্ষণ উদ্যোগই দীর্ঘ সময় কার্যকর থাকবে না।

মসজিদ সংরক্ষণে কাজ করা একটি বিদেশি গবেষণা দল উল্লেখ করেছে যে, দক্ষিণ এশিয়ার অনেক ঐতিহাসিক স্থাপনার মতো এখানেও জলবায়ু পরিবর্তনের চাপ প্রকট হয়ে উঠেছে। তারা মনে করেন, লবণাক্ত মাটিতে নতুন পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা তৈরি, মসজিদের চারপাশে আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা স্থাপন এবং ইট-চুনের আধুনিক সংরক্ষণ প্রযুক্তি প্রয়োগ এখন অত্যাবশ্যক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইউনেস্কোর পরামর্শ অনুযায়ী, জরুরি ভিত্তিতে সাময়িক সংরক্ষণের কাজ দ্রুত শুরু হবে। এতে মিহরাবকে কাঠামোগতভাবে নিরাপদে বেঁধে রাখা, গম্বুজের ভেতরের ফাটলকে শক্তিশালী করা, দেয়ালের ভাঙা অংশে সাময়িক চুন-সুরকি লাগানো এবং লবণাক্ততা প্রতিরোধে তাত্ক্ষণিক লবণ-মুক্তকরণ পদক্ষেপ গ্রহণ অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংরক্ষণকাজ যথাযথভাবে শুরু হলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে মসজিদটির ক্ষয় অনেকটা থামানো সম্ভব হবে। তবে এর জন্য দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় পরিকল্পনা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যা শুধু একটি স্থাপনার ক্ষয় নয়, বরং পুরো অঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট করছে।

ষাটগম্বুজ মসজিদ দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও স্থাপত্য ঐতিহ্যের একটি অনন্য প্রতীক। এই ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখা শুধু সরকারের নয়, বরং দেশের মানুষেরও দায়িত্ব। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সময় এখনই। আরও দেরি হলে ক্ষয় এমন পর্যায়ে পৌঁছবে যেখানে সংরক্ষণ আর সম্ভব হবে না। তাই ষাটগম্বুজ মসজিদ রক্ষায় দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর এখন জাতীয়ভাবে জোর দেওয়া প্রয়োজন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত