সীমান্তে বিজিবির মানবিকতায় বাঁচল ৯০ শালিকের প্রাণ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৪ নভেম্বর, ২০২৫
  • ২৫ বার
সীমান্তে বিজিবির মানবিকতায় বাঁচল ৯০ শালিকের প্রাণ

প্রকাশ: ২৪ নভেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন 

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্যদের মানবিক হস্তক্ষেপে ফেনীর ছাগলনাইয়া উপজেলার দক্ষিণ গুথুমা সীমান্ত থেকে উদ্ধার পাওয়া ৯০টি শালিক পাখি ফিরে পেয়েছে মুক্ত আকাশ। চোরা শিকারিদের হাত থেকে বন্যপ্রাণী রক্ষার এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করেছে—সীমান্তরক্ষার পাশাপাশি জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণেও বিজিবি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে আসছে।

২৪ নভেম্বর সোমবার ভোরবেলা দক্ষিণ গুথুমা বিজিবি ক্যাম্পের টহল দল সীমান্তবর্তী এলাকায় নিয়মিত দায়িত্ব পালনের সময় বাঁশের বড় ঝুড়ি হাতে সন্দেহজনক একজন ব্যক্তিকে দেখতে পায়। টহল দলের উপস্থিতি টের পেয়ে ব্যক্তি দৌড়ে পালিয়ে যায় এবং ঝুড়িটি ফেলে রেখে সীমান্তের অন্ধকারে মিলিয়ে যায়। বিজিবি সদস্যরা সাবধানে ঝুড়িটি খুলে দেখেন—তার ভিতর করে রাখা হয়েছে অসংখ্য ক্ষুদ্র প্রাণ। শিকারিদের হাতে বন্দী ৯০টি শালিক পাখি সেখানে গাদাগাদি করে নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট পাচ্ছিল।

বিজিবি সূত্র জানায়, ঝুড়ির অভ্যন্তরীণ খাঁচাগুলোতে পাখিগুলোকে এমনভাবে বেঁধে রাখা হয়েছিল যে অনেক পাখিই ক্লান্ত ও দুর্বল হয়ে পড়ে। ভয় আর আতঙ্কে তারা একেবারে নিস্তব্ধ, যেন মুক্তির আকুতি নিয়ে তাকিয়ে আছে মানুষের দিকে। টহল দলের সদস্যরা দ্রুত খাঁচা খুলে পাখিগুলোকে নিরাপদে বের করে আনেন এবং কিছুক্ষণ পর ধীরে ধীরে তাদের ছেড়ে দেন খোলা আকাশে। মুক্ত হাওয়ায় পাখিগুলোর পাখা মেলার সেই দৃশ্য সীমান্তরক্ষীদের জন্যও ছিল এক অন্যরকম অনুভূতির মুহূর্ত।

দক্ষিণ গুথুমা সীমান্তে দীর্ঘদিন ধরে বন্যপ্রাণী পাচারকারীরা সক্রিয়। বিভিন্ন খাঁচায় পাখি ধরে ভারতের বাজারে পাচারের চেষ্টা করা হয়। শীতের মৌসুমে এসব অবৈধ কার্যক্রম আরও বেড়ে যায়। শালিক, দোয়েল, ঘুঘুসহ বিভিন্ন বন্য পাখি পাচারকারীদের লক্ষ্যবস্তুতে পড়ে, যা দেশের জীববৈচিত্র্যকে হুমকির মুখে ফেলে। কিন্তু বিজিবি সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এ ধরনের চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করেছে। সোমবার সকালে উদ্ধার হওয়া ৯০টি শালিক তারই অংশ।

ঘটনার সময় উপস্থিত এক বিজিবি সদস্য বলেন, পাখিগুলোর নিস্তেজ দেহ আর ক্লান্ত চোখ দেখে মনে হচ্ছিল তারা অনেকক্ষণ ধরে অক্সিজেনের অভাবে শ্বাস নিতে পারছিল না। খোলা আকাশে উড়তে শুরু করলে যেন তাদের প্রাণ ফিরে আসে।

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের ফেনী ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন বলেন, “এটা কোনো বিশেষ অভিযান ছিল না। সীমান্তের কঠোরতার ভেতরেও আমরা বারবার প্রমাণ করি—নিরাপত্তার পাশাপাশি মানবিকতা ও সহানুভূতিও আমাদের দায়িত্বের অংশ। শালিক পাখিগুলোকে মুক্ত করে দিতে পেরে আমরা খুশি। এ ধরনের অবৈধ বন্যপ্রাণী বাণিজ্যের বিরুদ্ধে আমাদের তৎপরতা অব্যাহত থাকবে।”

বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা জানান, শালিক বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে অত্যন্ত পরিচিত ও উপকারী পাখি। তারা ফসলের পোকামাকড় খেয়ে কৃষিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে নির্বিচারে শিকার ও পাচারের কারণে অনেক এলাকায় শালিকের সংখ্যা কমে গেছে। বিশেষজ্ঞ মহল মনে করে, বন্যপ্রাণী রক্ষায় বিজিবির মতো আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সক্রিয়তা পরিবেশের জন্য আশাজনক।

স্থানীয় বাসিন্দারাও বিজিবির এ মানবিক উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। দক্ষিণ গুথুমার বাসিন্দা আবদুল মান্নান বলেন, “সকালে দেখি আকাশে শালিকের ঝাঁক উড়ছে। পরে শুনলাম বিজিবি তাদের উদ্ধার করেছে। এটা সত্যিই দারুণ। এরকম উদ্যোগ পরিবেশ রক্ষায় খুব জরুরি।”

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সীমান্ত এলাকায় বন্যপ্রাণী পাচার বেড়ে যাওয়ায় বিজিবি, পরিবেশ অধিদপ্তর, বন বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ আরও প্রয়োজন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন কঠোরভাবে প্রয়োগের ওপর তারা গুরুত্ব দেন।

এদিন উদ্ধার হওয়া পাখিগুলোর বেশিরভাগ ছিল অল্পবয়সী শালিক। বন থেকে ধরে এনে গাদাগাদি করে খাঁচায় ভরে রাখা হচ্ছিল তাদের। যা তাদের স্বাভাবিক জীবনধারাকে পুরোপুরি বিপর্যস্ত করে দেয়। বিজিবির দ্রুত পদক্ষেপ না থাকলে এই ৯০টি শালিক হয়তো আর কখনোই দিনের আলো দেখতে পেত না।

ঘটনার পর বিজিবি ওই এলাকা জুড়ে টহল জোরদার করেছে এবং শিকারি চক্র সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ শুরু করেছে। তবে পাচারকারীকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। বিজিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সীমান্তজুড়ে নিয়মিত টহল এবং স্থানীয়দের সহযোগিতা থাকলে এ ধরনের অবৈধ বন্যপ্রাণী বাণিজ্য অনেকটাই রোধ করা সম্ভব।

মানবিকতা, দায়বদ্ধতা ও পরিবেশ রক্ষার এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে এই উদ্ধার অভিযানকে স্থানীয়রা মনে রাখবেন দীর্ঘদিন। সীমান্তরক্ষীদের চোখে এটি ছিল দায়িত্বের অংশ; আর প্রকৃতির কাছে এটি ছিল প্রাণ ফিরিয়ে আনার এক বিরল মুহূর্ত।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত