খালেদা জিয়া সিসিইউতে, সারাদেশে দোয়া আজ

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৮ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৩৫ বার
তামিম ইকবাল খালেদা জিয়ার অসুস্থতাকে মানবিক দৃষ্টিতে দেখার আহ্বান

প্রকাশ: ২৮ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিএনপি চেয়ারপারসন ও দেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাকে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালের কেবিন থেকে করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) স্থানান্তর করা হয়েছে। দেশি–বিদেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে গঠিত মেডিকেল বোর্ডের নিবিড় পর্যবেক্ষণেই এখন তার চিকিৎসা চলছে। রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মধ্যেও তার জন্য উদ্বেগ ও প্রার্থনার সুর ছড়িয়ে পড়েছে। সারাদেশে আজ বাদ জুমা বিশেষ দোয়া অনুষ্ঠিত হওয়ার ঘোষণা আসার পর বিষয়টি আরও আলোচিত হয়ে উঠেছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক এজেডএম জাহিদ হোসেন জানান, গত কয়েক দিন ধরে তার শারীরিক অবস্থার ওঠানামা হচ্ছিল। গত রোববার রাতে হঠাৎ শ্বাসকষ্ট শুরু হলে তাকে দ্রুত হাসপাতালে আনা হয়। জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা সম্পন্ন করার পর চিকিৎসকরা পরামর্শ দেন সিসিইউতে স্থানান্তরের। সেখানে হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ, লিভার বিশেষজ্ঞ, নেফ্রোলজি বিভাগের চিকিৎসকসহ বেশ কয়েকজন বিশেষজ্ঞ মিলে তার সার্বিক চিকিৎসা পরিচালনা করছেন।

দীর্ঘদিন ধরেই খালেদা জিয়া নানা গুরুতর শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন। বয়স প্রায় ৮০ ছুঁইছুঁই হওয়ায় তার শারীরিক ঝুঁকি বেশি বলে জানিয়েছেন দায়িত্বে থাকা চিকিৎসকেরা। হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, আর্থ্রাইটিস, কিডনি জটিলতা ও লিভার সিরোসিস—এ সব মিলেই তার দৈনন্দিন স্বাস্থ্যপরিস্থিতি অনেক সময় অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দেয়। চিকিৎসকেরা নিয়মিত তাকে পর্যবেক্ষণ করছেন এবং প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন পরিস্থিতি বিবেচনা করে।

এই অবস্থায় বিএনপির পক্ষ থেকে দেশব্যাপী দোয়ার ঘোষণা আসায় রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। আজ শুক্রবার বাদ জুমা দেশের সব জেলা, মহানগর ও উপজেলা পর্যায়ে দলীয় কার্যালয় ও বিভিন্ন মসজিদে খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনায় দোয়া অনুষ্ঠিত হবে। রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত মোনাজাতে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত থাকবেন বলে জানা গেছে। তাদের সঙ্গে সাধারণ নেতাকর্মী ও সমর্থকদেরও যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে।

দেশব্যাপী সংগঠনের নেতাকর্মীরা ইতোমধ্যেই দোয়া অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি শুরু করেছেন। অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খালেদা জিয়ার দ্রুত আরোগ্য কামনায় বার্তা প্রকাশ করছেন। ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলায়ও একই চিত্র দেখা গেছে—ব্যানার, পোস্টার এবং সংগঠনের উদ্যোগে স্থানীয় মসজিদগুলোতে আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। রাজনৈতিক ভেদাভেদ ভুলে সাধারণ মানুষও সামাজিক মাধ্যমে তার সুস্থতা কামনায় প্রার্থনা জানাচ্ছেন।

গত ১৫ অক্টোবরও খালেদা জিয়া অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। সেবারও তিনি কিছুদিন চিকিৎসাধীন ছিলেন এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে বাসায় ফেরেন। তার শারীরিক অবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই ওঠানামা করায় চিকিৎসকদের বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হচ্ছে। প্রতিটি পরিবর্তনই গুরুত্ব দিয়ে পর্যবেক্ষণ করছেন তারা।

এর আগে চলতি বছরের ৮ জানুয়ারি উন্নত চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যের লন্ডনে গিয়েছিলেন তিনি। লন্ডনের বিভিন্ন বিশেষায়িত চিকিৎসা কেন্দ্র ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে তিনি টানা কয়েক সপ্তাহ চিকিৎসা নেন। প্রথমে তিনি ভর্তি ছিলেন লন্ডন ক্লিনিকে, যেখানে ১৭ দিন ধরে বিভিন্ন পরীক্ষা ও চিকিৎসা চালানো হয়। এরপর ছেলে তারেক রহমানের বাসায়ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নিয়মিত পর্যবেক্ষণে ছিলেন তিনি। যুক্তরাজ্যে তার চিকিৎসার দায়িত্বে থাকা বিশেষজ্ঞরা জানান, বয়সের কারণে খালেদা জিয়ার নিয়মিত চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

লন্ডনে প্রায় চার মাস থাকার পর গত ৬ মে তিনি দেশে ফেরেন। প্রত্যাবর্তনের পর থেকেই তিনি গুলশানের বাসায় এভারকেয়ার হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে ছিলেন। অধ্যাপক শাহাবুদ্দিন তালুকদারের নেতৃত্বে গঠিত একটি মেডিকেল টিম তাকে নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসছিল। বাসায় থাকা অবস্থাতেও তার শারীরিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রায়ই উদ্বেগ প্রকাশ করতেন বিশেষজ্ঞরা।

বর্তমানে সিসিইউতে স্থানান্তরের বিষয়টি ঘিরে বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। একাধিক সিনিয়র নেতা জানিয়েছেন, নেত্রীকে সিসিইউতে নেওয়া হয়েছে মানেই পরিস্থিতি জটিল—এ ধারণা স্বাভাবিকভাবেই দলে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। অনেকেই হাসপাতালে গিয়ে খোঁজখবর নিচ্ছেন, তবে প্রবেশ সীমিত থাকায় সরাসরি দেখা করার অনুমতি নেই। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, এমন অবস্থায় বিশ্রাম ও পর্যবেক্ষণই তার জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।

সাধারণ মানুষ এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, খালেদা জিয়া দেশের রাজনীতি এবং ইতিহাসের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তাই তার অসুস্থতা শুধু রাজনৈতিক দল বা সমর্থকদের মধ্যে নয়, সমাজের বৃহত্তর অংশেও উদ্বেগ সৃষ্টি করে। রাজনৈতিক মতভেদ থাকা সত্ত্বেও দেশের বিভিন্ন স্থানে তার সুস্থতা কামনায় দোয়ার আয়োজনের পদক্ষেপটি মানবিক মূল্যবোধকেই তুলে ধরে।

অনেক রাজনৈতিক নেতাই বলছেন, তিনি দীর্ঘ চার দশকের রাজনৈতিক জীবনে নানা উত্থান–পতনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। এমন একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর অসুস্থতা নিয়ে দেশব্যাপী মানুষের প্রার্থনা সামাজিক ও রাজনৈতিক একাত্মতারও প্রতিফলন।

এদিকে চিকিৎসকদের মতে, বেগম খালেদা জিয়ার বর্তমান অবস্থা স্থিতিশীল রাখতে সিসিইউতে রাখাই সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত। সেখানে প্রয়োজনীয় সব চিকিৎসা, যন্ত্রপাতি এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দল সবসময় প্রস্তুত থাকে। তার শ্বাসকষ্ট দেখা দেওয়ার পর যেসব পরীক্ষা করা হয়েছে, তার রিপোর্ট বিশ্লেষণ করে চিকিৎসকেরা নিয়মিত সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী চিকিৎসা পরিকল্পনা সাজানো হচ্ছে। পরিবারের সদস্যরা হাসপাতালের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে তার চিকিৎসা সম্পর্কে অবগত থাকছেন।

এভারকেয়ার হাসপাতালের চারপাশেও আজ সকাল থেকেই গণমাধ্যমকর্মী ও সাধারণ মানুষের ভিড় দেখা গেছে। তার অসুস্থতার খবর ছড়িয়ে পড়তেই রাজনৈতিক অঙ্গনব্যাপী আলোচনার শুরু হয়। বিএনপির নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও সেখানে এসে খবর নিচ্ছেন।

দেশের রাজনীতির এই বর্ষীয়ান নেত্রীর দ্রুত সুস্থতার জন্য আজকের দোয়া ও মোনাজাত সারাদেশে এক মানবিক আবেগের আবহ সৃষ্টি করেছে। রাজনৈতিক উত্তাপের ভিড়ে মানুষের এই প্রার্থনা হয়তো মনে করিয়ে দিচ্ছে—ক্ষমতা, মতাদর্শ ও অবস্থান ভিন্ন হলেও মানবিকতাই শেষ পর্যন্ত মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত