প্রকাশ: ২৮ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা নতুন করে ঘনীভূত হয়েছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘাতের অভিযোগ ওঠার পর। নির্বাচনী প্রচারের সময় বিএনপির নেতাকর্মী ও স্থানীয় সাধারণ মানুষের ওপর পরিকল্পিতভাবে হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করেছে বিএনপি। দলটির অভিযোগ, হামলাটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত এবং এর নেতৃত্ব দিয়েছেন জামায়াতে ইসলামী মনোনীত স্থানীয় সংসদ সদস্য প্রার্থী আবু তালেব মণ্ডল। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যেও বিরাজ করছে ভীতিকর পরিবেশ।
বুধবার সন্ধ্যায় পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানান। তিনি বলেন, ঈশ্বরদীতে নির্বাচনী প্রচার চলাকালীন বিএনপি নেতাকর্মীরা সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে কথা বলছিলেন এবং শান্তিপূর্ণভাবে প্রচার চালাচ্ছিলেন। এ সময় হঠাৎ করে জামায়াতের কর্মীরা আক্রমণাত্মক আচরণ শুরু করে। বিএনপির দাবি, এই আক্রমণে অর্ধ-শতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন এবং তাদের অনেকেই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। আহতদের মধ্যে কেউ কেউ গুরুতর অবস্থায় রয়েছেন বলে দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
বিএনপির অভিযোগ অনুযায়ী, নির্বাচনী প্রচারের সময় জামায়াত কর্মীরা সাধারণ মানুষকে ‘ধর্মীয় আবেগে প্রলুব্ধ করার মতো আপত্তিকর বার্তা’ দিচ্ছিলেন। এমনকি ‘জান্নাতের টিকেট’ দেওয়ার মতো মন্তব্য ব্যবহার করে ভোটারদের মন প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হচ্ছিল। ধর্মপ্রাণ সাধারণ মানুষ এসব আচরণের প্রতিবাদ জানালে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে জামায়াত কর্মীরা। পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং কথাকাটাকাটির এক পর্যায়ে জামায়াতের কর্মীরা সাধারণ মানুষের ওপর হামলা চালায়। বিএনপির ভাষ্য, এর কিছুক্ষণ পরেই শান্তিপূর্ণভাবে প্রচাররত বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর অতর্কিতে হামলা শুরু হয়। তারা দাবি করে, এই হামলা ছিল বিনা প্ররোচনায় এবং সম্পূর্ণ পরিকল্পিত।
বিএনপির পাঠানো প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে স্থানীয় একটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবির উল্লেখও করা হয়েছে। সেখানে দেখা গেছে, জামায়াতকর্মী তুষার নামে একজন অস্ত্র হাতে হামলা চালাচ্ছেন। বিএনপির দাবি, এই প্রমাণই যথেষ্ট যে হামলার সময় হামলাকারীরা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে মাঠে নেমেছিল এবং পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করে তুলেছিল। এ ঘটনার মাধ্যমে নির্বাচনী প্রচারে অংশগ্রহণকারী নেতাকর্মীদের অনিরাপত্তা আরও প্রকট হয়ে উঠেছে বলে দলটির অভিযোগ।
রুহুল কবির রিজভী বলেন, কিছু গণমাধ্যমে ঘটনাটিকে ‘ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার উদ্দেশ্যে বিভ্রান্তিকর সংবাদ’ প্রচার করা হচ্ছে। তিনি অভিযোগ করেন, এসব সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করা এবং হামলার ঘটনাকে দুর্বল বা অস্পষ্ট করে দেখানোর চেষ্টা চলছে। রিজভীর দাবি, বিএনপি সবসময় সংযম ও ধৈর্যের সঙ্গে প্রতিক্রিয়া জানায় এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও অবনতি না হওয়ার চেষ্টা করে। তিনি বলেন, “আমরা সুশৃঙ্খলভাবে নির্বাচনী মাঠে থাকতে চাই, কারণ জানি—আগামী জাতীয় নির্বাচন যদি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তাহলে জনগণের বহুল প্রত্যাশিত গণতান্ত্রিক উত্তরণের স্বপ্ন ভেঙে যাবে।”
বিএনপি তাদের বিবৃতিতে দাবি করেছে যে, হামলার ঘটনায় একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া অত্যন্ত জরুরি। দলটি মনে করে, এই হামলার পেছনে যারা ছিল বা যারা নির্দেশ দিয়েছেন, তাদের বিচারের আওতায় আনা না হলে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আরও বাড়তে পারে। তারা সরকারের প্রতি আহ্বান জানায়, নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ রাখতে অবিলম্বে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হোক। দলটির দাবি, দেশের মানুষ মুক্ত ও ন্যায়সঙ্গতভাবে ভোট দিতে চায় এবং এজন্য প্রয়োজন নিরাপদ পরিবেশ।
এদিকে ঈশ্বরদীর সাধারণ মানুষও ঘটনাটি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। স্থানীয়দের ধারণা, নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসায় রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে এবং সহিংসতার ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে। অনেকেই মনে করছেন, রাজনৈতিক দলগুলো যদি নিজেদের কর্মীদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারে, তাহলে সাধারণ মানুষের অনিরাপত্তা আরও বেড়ে যাবে। এলাকার প্রবীণ নাগরিকদের মতে, রাজনৈতিক সহিংসতা শুধু নির্বাচনী পরিবেশ নষ্ট করে না, বরং মানুষের মধ্যে ভয়ের সঞ্চার করে গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে।
বিভিন্ন সূত্র জানায়, হামলার ঘটনার পর এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহল জোরদার করা হয়েছে। যদিও এখনো কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেফতার হয়েছেন বলে নিশ্চিত হওয়া যায়নি, তবে স্থানীয় প্রশাসন বিষয়টি তদন্তের আশ্বাস দিয়েছে। স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, হামলার বিষয়টি এখন জাতীয় পর্যায়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে, এবং নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে এই ধরনের ঘটনা আরও মনোযোগের দাবি রাখে।
বিএনপি তাদের বিবৃতির শেষাংশে উল্লেখ করেছে, দেশের জনগণ শান্তিপূর্ণ নির্বাচন চায় এবং রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব হলো সেই পরিবেশ নিশ্চিত করা। দলটি আশা প্রকাশ করেছে, দেশের মানুষ তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করতে পারবে এবং কোনো ধরনের ভয় বা চাপের মুখে পড়বে না। তারা আবারও হামলার ঘটনায় নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, নির্বাচনী মাঠে সহিংসতা গণতন্ত্রকে দুর্বল করে এবং জনগণের আস্থা নষ্ট করে।
ঈশ্বরদীর এই ঘটনা নির্বাচনী উত্তেজনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা—রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রশাসন কার্যকর পদক্ষেপ নেবে এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করবে, যাতে জনগণ নির্বিঘ্নে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে।