শেয়ারবাজারে সরাসরি তালিকাভুক্তি নিয়ে নতুন আলোচনা জোরালো

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৭২ বার
শেয়ারবাজারে সরাসরি তালিকাভুক্তি নিয়ে নতুন আলোচনা জোরালো

প্রকাশ: ০১ ডিসেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে বেসরকারি কোম্পানির সরাসরি তালিকাভুক্তির বিষয়টি পুনরায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দেশীয় বাজারে সেরা মানের কোম্পানি, বিশেষ করে বিদেশি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান এবং বৃহৎ মূলধনী বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ দেওয়া উচিত। তাদের মতে, এতে শুধু নতুন অর্থের প্রবাহ নয়, বরং বাজারে শেয়ারের সরবরাহও বাড়বে, যা শেয়ারবাজারকে আরও কার্যকর এবং স্বচ্ছ করবে।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সম্প্রতি বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) ইনিশিয়াল পাবলিক অফারিং (আইপিও) বিধিমালা, ২০২৫-এর খসড়া নিয়ে অংশীজনদের সঙ্গে একটি বৈঠক আয়োজন করে। সেই বৈঠকে সরাসরি তালিকাভুক্তির বিষয়টি আবার আলোচনায় উঠে আসে। পাশাপাশি ডিএসই ব্রোকারেজ অ্যাসোসিয়েশন (ডিবিএ) এর পক্ষ থেকেও বহুজাতিক ও বেসরকারি খাতের বড় কোম্পানিগুলোর জন্য সরাসরি তালিকাভুক্তি নিশ্চিত করতে প্রধান নিয়ন্ত্রকের হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়। টাস্কফোর্স কমিটি, যা শেয়ারবাজার সংস্কারের কাজ করছে, ইতিমধ্যেই খসড়া আইপো আইনে বড় কোম্পানিগুলোকে সরাসরি তালিকাভুক্তির সুপারিশ করেছিল। কিন্তু বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বিএসইসির খসড়া আইপো বিধিমালায় এই সুপারিশটি যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়নি।

ডিবিএ সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, “আমরা আইপিও বিধিমালায় বেসরকারি কোম্পানির সরাসরি তালিকাভুক্তি চালুর জন্য একটি হাইব্রিড মডেল প্রস্তাব করেছি। এতে উদ্যোক্তা বা পরিচালকরা শেয়ার বিক্রি করতে পারবেন, কিন্তু আইপিওর মূল শেয়ার বিতরণে তাদের সরাসরি আর্থিক লাভ হবে না। এই সুযোগটি বাজারে ভালো কোম্পানির আসা নিশ্চিত করবে এবং শেয়ারের সরবরাহ বৃদ্ধি পাবে। বর্তমানে বেসরকারি কোম্পানির জন্য নিষেধাজ্ঞা থাকায় এটি করা সম্ভব হচ্ছে না। একই বাজারে সরকারি কোম্পানির জন্য সুবিধা থাকা আর বেসরকারি কোম্পানির জন্য না থাকা একটি অসঙ্গতি, যা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের পরিপন্থী।”

বিএসইসির পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বলেন, “তালিকাভুক্তির জন্য যে লিস্টিং রেগুলেশন রয়েছে, সেখানে সরাসরি তালিকাভুক্তির বিষয়টি ইতিমধ্যেই অন্তর্ভুক্ত। তবে আমরা নির্দেশনা দিয়েছি যে বেসরকারি কোম্পানিগুলো সরাসরি তালিকাভুক্ত হতে পারবে না, যেখানে সরকারি কোম্পানির জন্য এ সুযোগ রয়েছে। আইপিও বিধিমালা মূলত প্রাইমারি মার্কেটের জন্য, আর সরাসরি তালিকাভুক্তি সেকেন্ডারি মার্কেটের সঙ্গে সম্পর্কিত। অনেকেই হয়তো এই পার্থক্য বুঝতে পারছেন না।”

সরাসরি তালিকাভুক্তি এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে কোম্পানি নতুন শেয়ার ইস্যু করে না। বরং, কোম্পানির উদ্যোক্তা বা পরিচালকরা তাদের শেয়ার সেকেন্ডারি মার্কেটে সরাসরি বিক্রি করতে পারেন। এতে কোম্পানির জন্য নতুন পুঁজি আসে না, তবে উদ্যোক্তা বা পরিচালকেরা বাজার থেকে অর্থ তুলে নিতে পারেন। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কোম্পানির শেয়ারবাজারে উপস্থিতি বৃদ্ধি পায় এবং বিনিয়োগকারীরা কোম্পানির শেয়ার কিনতে পারেন।

বাংলাদেশে সরাসরি তালিকাভুক্তির ইতিহাসও সমালোচনার মুক্ত ছিল না। ২০০৯ সালের জুনে ডিএসই পরিচালনা পর্ষদ বেসরকারি খাতের কোম্পানির সরাসরি তালিকাভুক্তি বন্ধ করে দেয়। এর আগে সামিট গ্রুপের দুটি কোম্পানি—খুলনা পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (কেপিসিএল) এবং ওশ্যান কনটেইনার লিমিটেড (ওসিএল)—শেয়ারবাজারে সরাসরি তালিকাভুক্ত হয়। তদন্তে প্রকাশিত হয়, উদ্যোক্তারা কারসাজির মাধ্যমে এক হাজার ৬০০ কোটি টাকা বাজার থেকে তুলে নিয়েছিলেন। ২০১০ সালের বাজার ধসের পর এই প্রক্রিয়া নিয়ে আরও সতর্কতা দেখানো হয়। ২০১৬ সালে বেস্ট হোল্ডিংস নামক একটি বেসরকারি কোম্পানি সরকারী অংশীদারের মাধ্যমে সরাসরি তালিকাভুক্তির চেষ্টা করলেও তা সফল হয়নি। বিএসইসির ২০১৫ সালের লিস্টিং রেগুলেশন অনুযায়ী বেসরকারি কোম্পানির সরাসরি তালিকাভুক্তি ২০১৬ সালে রহিত হয়।

তবে বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বাজারে আস্থা ও তারল্য ফিরিয়ে আনার জন্য এবং নতুন কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত করতে সরাসরি তালিকাভুক্তি প্রক্রিয়া অপরিহার্য। শেয়ারবাজারের সম্প্রসারণ ও বৈচিত্র্য নিশ্চিত করতে এটি সময়ের দাবি। বিএসইসির যদি বর্তমানে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়, তাহলে বেসরকারি কোম্পানির জন্য আর কোনো বাধা থাকবে না।

টাস্কফোর্সের সদস্য অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, “টাস্কফোর্সের সুপারিশে সরাসরি তালিকাভুক্তি অন্তর্ভুক্ত ছিল, তবে এখন মনে নেই ঠিক কতটা। বিএসইসি চাইলে প্রস্তাবিত সুপারিশ অনুযায়ী সংশোধন আনতে পারে। এটি শেয়ারবাজারে নতুন কোম্পানি এবং বিনিয়োগকারীর জন্য সহায়ক হবে।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন কোম্পানির সরাসরি তালিকাভুক্তি বাজারকে আরও স্বচ্ছ ও স্থিতিশীল করবে। এতে বিনিয়োগকারীরা বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার সরাসরি কিনতে পারবেন এবং বেসরকারি উদ্যোক্তারা তাদের শেয়ার বিক্রি করে বাজার থেকে অর্থ তুলে নিতে পারবেন। এর ফলে বাজারে শেয়ারের সরবরাহ বৃদ্ধি পাবে, আস্থা ফিরবে এবং নতুন বিনিয়োগ আকর্ষিত হবে।

বর্তমানে গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে শেয়ারবাজারে নতুন কোনো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়নি। এই পরিস্থিতিতে সরাসরি তালিকাভুক্তি বাস্তবায়ন হলে বাজারে সাড়া পড়বে এবং দেশের পুঁজিবাজারে নতুন জীবন সঞ্চারিত হবে। বাংলাদেশে শেয়ারবাজারে দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা এবং উন্নয়ন নিশ্চিত করতে এই উদ্যোগকে অনেকেই সময়োপযোগী ও প্রয়োজনীয় বলেই মনে করছেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত