বিপদে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখাই শান্তির পথ

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৬৯ বার
বিপদে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখাই শান্তির পথ

প্রকাশ: ০১ ডিসেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জীবনের প্রতিটি মানুষের জীবনে এমন মুহূর্ত আসে, যখন মনে হয় সব আশা শেষ, ভবিষ্যৎ অন্ধকারে ঢাকা, এবং সমস্যার সমাধান নেই। এই প্রতিকূল সময়ে মানুষ প্রায়ই দুশ্চিন্তায় ভুগে এবং হতাশার শিকার হয়। তখন কেউ যদি বলে, “আল্লাহর ওপর ভরসা করো,” শুনতে হয় সহজ, কিন্তু তা বাস্তবে প্রয়োগ করা সবসময়ই কঠিন হয়ে ওঠে। ইসলাম এই ভরসাকে বিশেষ গুরুত্ব দেয় এবং এটিকে তাওয়াক্কুল বলা হয়। তাওয়াক্কুল শুধু কল্পনা বা মনকে শান্ত রাখার উপায় নয়, বরং এটি একটি শক্তিশালী আত্মিক প্রক্রিয়া, যা বিপদ, অসুবিধা ও সংকটের মুহূর্তে মানুষকে স্থির ও দৃঢ় রাখে।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে, যিনি তাঁর ওপর নির্ভরশীল, তিনি কখনো হতাশ হবেন না। “যে আল্লাহর ওপর নির্ভর করে, আল্লাহ তার জন্য যথেষ্ট।” (সুরা আত-তালাক, আয়াত: ৩)। এই আয়াত আমাদের শিক্ষা দেয় যে, আমাদের চেষ্টা ও পরিশ্রম অবশ্যই প্রয়োজন, তবে চূড়ান্ত ফলাফল আল্লাহর হাতে। তাওয়াক্কুল মানে কেবল বসে থাকা নয়; বরং পরিকল্পনা করা, যথাযথ চেষ্টা করা এবং তারপরে আল্লাহর উপর পুরোপুরি ভরসা স্থাপন করা।

তাওয়াক্কুলের অর্থ বোঝার জন্য ইবনে আতা বলেছেন, “পরিকল্পনা কর, করণীয় ঠিকভাবে সম্পন্ন কর, তারপর দুশ্চিন্তা ছেড়ে দাও। যে কাজ আল্লাহ নিজের দায়িত্বে নিয়েছেন, তা নিয়ে তুমি কেন ভাববে?” অর্থাৎ, জীবনকে দায়িত্বশীল ও সচেতনভাবে পরিচালনা করতে হবে, কিন্তু ফলাফল নিয়েও দুশ্চিন্তায় ভুগতে হবে না। উদাহরণস্বরূপ, চিকিৎসার প্রয়োজন হলে সর্বোত্তম চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে, পড়াশোনায় সঠিক প্রস্তুতি নিতে হবে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি আবেদনপত্র নিখুঁতভাবে পূরণ করতে হবে। এই সবই বাহ্যিক চেষ্টা। কিন্তু একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, আল্লাহই সমস্ত কিছু দেখভাল করছেন। তিনি কখনো বান্দাকে অসম্মানিত বা অবহেলিত রাখেন না।

আল্লাহর ক্ষমতার ওপর সঠিক ধারণা রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোরআনে আল্লাহর ওপর নির্ভরতার সঙ্গে তাঁর ক্ষমতার দিকও স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, তিনি পূর্ব ও পশ্চিমের রব, তাঁর ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই। (সুরা মুযযাম্মিল, আয়াত: ৯)। এই আয়াত আমাদের শেখায় যে, আল্লাহই সবকিছুর নিয়ন্ত্রণকারী, এবং আমাদের সমস্ত প্রয়োজন ও সংকটের সমাধান তাঁর হাতে। আরেকটি আয়াত আরও স্পষ্টভাবে নির্দেশ দেয়, “যে চিরঞ্জীবের উপর ভরসা রাখে, তিনি কখনো মারা যান না।” (সুরা ফুরকান, আয়াত: ৫৮)। আল্লাহর শাশ্বত ক্ষমতা ও শাসন আমাদের আত্মবিশ্বাস এবং স্থিতি দেয়, যা বিপদ ও সমস্যার সময়ে অপরিহার্য।

বিপদ বা উপায়হীনতার সময় আল্লাহর ওপর নির্ভর করা কতটা শক্তিশালী হতে পারে, তা প্রমাণ করেন ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)। তিনি তার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিন হিসেবে স্মরণ করেন সেই দিন, যখন ঘুম থেকে উঠলেন এবং দেখলেন ঘরে কোনো খাবার নেই। সেই দিন তিনি পুরোপুরি আল্লাহর ওপর নির্ভর করেছিলেন। কোনো বাহ্যিক উপায় ছিল না, তাই তার একমাত্র ভরসা ছিল আল্লাহর প্রতি। এই অভিজ্ঞতা তাকে আত্মিক শক্তি ও অভ্যন্তরীণ শান্তি প্রদান করেছিল।

তাওয়াক্কুলের প্রভাব কেবল ব্যক্তিগত জীবনে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি সমাজের জন্যও শান্তি ও স্থিতি আনে। যখন মানুষ বিপদে আল্লাহর ওপর ভরসা স্থাপন করে, তখন তার মানসিক চাপ কমে এবং সে ধৈর্য, সহনশীলতা ও সহমর্মিতা প্রদর্শন করতে সক্ষম হয়। এই মনস্তাত্ত্বিক স্থিতি শুধুমাত্র ব্যক্তিকে শান্ত রাখে না, বরং তার আশেপাশের মানুষকেও প্রভাবিত করে। একজন স্থির ও দৃঢ় বিশ্বাসী ব্যক্তি যখন সমস্যার মুখোমুখি হয়, তখন তার আশেপাশের মানুষও সাহস ও ধৈর্য পায়।

তাওয়াক্কুল কেবল ঈমানের অঙ্গ নয়, এটি কর্ম ও পরিকল্পনার সঙ্গে মিলিত হলে আরও কার্যকর হয়। একজন শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে পারে, কিন্তু তার চূড়ান্ত ফলাফলের ওপর সম্পূর্ণ আল্লাহর ওপর ভরসা রাখতে হবে। একজন রোগী সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ করতে পারে, তবে রোগ নিরাময়ের চূড়ান্ত ফলাফল আল্লাহর হাতে। এই বিশ্বাস ও প্রার্থনা একত্রিত হলে মানুষ মানসিকভাবে শক্তিশালী হয় এবং বিপদের মুখে হাল ছাড়ে না।

আজকের দ্রুত পরিবর্তনশীল ও চাপপূর্ণ জীবনে, মানুষ নানা রকম অনিশ্চয়তা ও বিপদের মুখোমুখি হয়। এই পরিস্থিতিতে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা মানে আত্মার শান্তি, মানসিক স্থিতিশীলতা এবং ধৈর্যের প্রশিক্ষণ। তাওয়াক্কুল কেবল দুঃসময়ে আত্মনির্ভরতার এক মাত্র উপায় নয়, বরং এটি জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে আলোকিত করে, প্রতিটি চ্যালেঞ্জকে সহজ করে তোলে।

সংক্ষিপ্তভাবে বলতে গেলে, তাওয়াক্কুল হলো আল্লাহর প্রতি সম্পূর্ণ ভরসা, যথাযথ চেষ্টা এবং ফলাফলের প্রতি ধৈর্য। এটি ব্যক্তি ও সমাজের জন্য শান্তি, স্থিতি এবং আত্মনির্ভরতার এক অপরিহার্য শিক্ষণ। বিপদে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা কেবল ধর্মীয় অনুশীলন নয়, বরং মানবিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি, যা মানুষকে মানসিক দৃঢ়তা, সাহস ও সহানুভূতি প্রদান করে। বিপদে ভরসা রাখলে মানুষ হতাশা ও দুশ্চিন্তার খেলা থেকে মুক্ত থাকে এবং জীবনের প্রতিটি কঠিন মুহূর্তকে সৌভাগ্যবানভাবে মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়।

তাওয়াক্কুলের বাস্তব প্রয়োগের মাধ্যমে জীবনকে আরও মানবিক, দায়িত্বশীল ও সমৃদ্ধ করা সম্ভব। বিপদ, সংকট বা অনিশ্চয়তার সময়ে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখার শিক্ষা কেবল ব্যক্তি নয়, পুরো সমাজের জন্যই শান্তি ও উন্নতির পথ তৈরি করে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত