রফতানি বন্ধে কমেছে নাটোরের বিষমুক্ত শুঁটকির দাম

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৭০ বার
নাটোরের বিষমুক্ত শুঁটকির দাম কমেছে স্থানীয় বাজারে

প্রকাশ: ০৩ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নাটোরের চলনবিলে শুঁটকি উৎপাদন ও বিক্রিতে রফতানি বিপর্যয়ের প্রভাব স্পষ্ট। ভারতের বাজারে শুঁটকির রফতানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চলনবিলের শুঁটকি উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। এর সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় বাজারেও কমেছে বিষমুক্ত শুঁটকির দাম। উৎপাদনকারীরা মূলত স্থানীয় চাহিদার ভিত্তিতে শুঁটকি তৈরি করে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন। তবে রফতানি শুরু না হলে উৎপাদনের পাশাপাশি শুঁটকির বাজার মূল্যও আগের অবস্থায় ফিরবে না বলে মনে করছেন মৎস্য কর্মকর্তারা।

সিংড়ার নেঙ্গুন শুঁটকি পল্লীতে সরেজমিনে দেখা গেছে, সকাল থেকে নারী শ্রমিকরা ব্যস্ত সময় পার করছেন মাছ কুটা, ধোঁয়া দিয়ে শুকানো এবং পরিষ্কার করার কাজে। এখানে শুঁটকি তৈরিতে কোনো ধরনের বিষ ব্যবহার করা হয় না। কাঁচা মাছ বাজার থেকে এনে সঠিকভাবে প্রক্রিয়াজাত করা হয় এবং এরপর বিক্রি করা হয়। নাটোর-বগুড়া মহাসড়কের পাশে হওয়ায় যাত্রীরা মোটরসাইকেল বা ছোট যানবাহনে এসে পছন্দমতো শুঁটকি কিনছেন। চলনবিলের নানা প্রজাতির মাছের শুঁটকির দাম এখন কেজিতে ১৫০ থেকে ৯০০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। নিরাপদ শুঁটকি সাশ্রয়ী দামে পেয়ে ক্রেতারা সন্তুষ্ট।

বগুড়ার শাহজাহান আলী জানান, তিনি প্রতি সপ্তাহে মোটরসাইকেল নিয়ে নাটোর যান এবং ফেরার পথে শুঁটকি কিনে নেন। তাঁর মতে, বর্তমানে উৎপাদিত শুঁটকিতে বিষ ব্যবহার করা হয় না এবং দামও সাশ্রয়ী। কিন্তু তিনি উদ্বিগ্ন যে, রফতানি বন্ধ থাকায় বাজারে শুঁটকির চাহিদা সীমিত এবং উৎপাদনও কমেছে। চলতি বছরে এখনও কোনো প্রকার শুঁটকি রফতানি হয়নি। ফলে ছোট ও মাঝারি মাছের শুঁটকির দাম কমে গেছে।

উৎপাদনকারী বাবু জানান, প্রতি বছর নাটোরের শুঁটকি ভারতে রফতানি করা হতো। চলতি বছর এক কেজি শুঁটকিও রফতানি হয়নি। এর ফলে উৎপাদনকারীরা উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছেন। রফতানিকারকরা আগের মতো ছোট মাছের শুঁটকি কেজিতে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায় কিনতেন, কিন্তু এখন সেগুলো ১৫০ থেকে ১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। উৎপাদনকারীরা মূলত স্থানীয় বাজারের চাহিদা অনুযায়ী শুঁটকি তৈরি করে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন।

নাটোর জেলা মৎস্য অফিসার মো. ওমর আলী বলেন, চলতি বছর চলনবিলের মাছের উৎপাদন কম হওয়ায় শুঁটকি উৎপাদনও কমার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি আরও বলেন, সরকারের উদ্যোগে পুনরায় রফতানি ব্যবস্থা শুরু হলে উৎপাদনকারীরা ভালো দাম পাবেন। গত বছর চলনবিলের সিংড়া উপজেলার অংশ থেকে ৩২০ মেট্রিক টন শুঁটকি উৎপাদন হয়।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুঁটকির উৎপাদন ও রফতানি পুনরায় শুরু করতে হলে সরকারের সক্রিয় পদক্ষেপ প্রয়োজন। এটি কেবল উৎপাদনকারীদের অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা নিশ্চিত করবে না, বরং স্থানীয় মৎস্যশিল্পের টেকসই বিকাশে সহায়ক হবে। রফতানি পুনঃপ্রারম্ভ হলে শুধুমাত্র উৎপাদনের বৃদ্ধি নয়, নিরাপদ ও বিষমুক্ত শুঁটকির মানও ধরে রাখা সম্ভব হবে।

চলনবিলের শুঁটকি পল্লীর এই দৃশ্য এবং স্থানীয়দের আয় নির্ভর করে শুঁটকির উপর, তাই রফতানির সুযোগ না থাকলে ক্ষতি এড়ানো কঠিন। উৎপাদনকারীরা আশা করছেন, ভারতসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক বাজারে রফতানি আবার শুরু হবে এবং শুঁটকির ভালো দাম ফিরে আসবে। একই সঙ্গে তারা চান, নিরাপদ উৎপাদন ও সঠিক বাজার ব্যবস্থার মাধ্যমে তাদের প্রক্রিয়াজাত পণ্যের চাহিদা নিশ্চিত হোক।

নাটোরের শুঁটকি পল্লীর নারীরা প্রতিদিন কুটা, ধোঁয়া, শুকানো এবং বাজারজাতের কাজে নিয়োজিত থাকেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে তাদের মূল চাহিদা হলো, উৎপাদিত শুঁটকি যেন রফতানি মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে স্থান পায় এবং আয় বৃদ্ধি পায়। সঠিক বাজার ব্যবস্থা ও সরকারের সহযোগিতা থাকলে উৎপাদনকারীরা শুধুমাত্র স্থানীয় বাজারে সীমাবদ্ধ না থেকে আন্তর্জাতিক বাজারেও অংশ নিতে পারবেন।

শুঁটকির এই পরিস্থিতি স্থানীয় অর্থনীতির জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। উৎপাদন কমে যাওয়া, রফতানি বন্ধ এবং বাজার মূল্য হ্রাস—এই সব মিলিয়ে শিল্পে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। তবে উৎপাদনকারীদের আত্মনির্ভরতা ও স্থানীয় চাহিদার ভিত্তিতে কাজ চালিয়ে যাওয়াই বর্তমানে তাদের একমাত্র উপায়। সঠিক সরকারি উদ্যোগ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পুনঃপ্রবেশের ব্যবস্থা করা হলে নাটোরের শুঁটকির উৎপাদন ও রফতানি আবার সমৃদ্ধির পথে ফিরবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত