হরমুজ প্রণালি আবার অবরোধের ঘোষণা ইরানের

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৬ বার
হরমুজ প্রণালি আবার অবরোধের ঘোষণা ইরানের

প্রকাশ: ১৮ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে আবারও উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য সাময়িকভাবে পথ খুলে দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নতুন করে অবরোধ আরোপের ঘোষণা দিয়েছে ইরান। দেশটির সামরিক ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ এবং বৈশ্বিক রাজনীতিতে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

শনিবার ইরানের প্রতিরক্ষা বাহিনীর যৌথ সামরিক কমান্ড এক বিবৃতিতে জানায়, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে নিয়ন্ত্রণ আবারও আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, হরমুজ প্রণালির সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপত্তা সম্পূর্ণভাবে সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকবে, যেমনটি অতীতেও ছিল।

Strait of Hormuz পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ হিসেবে পরিচিত। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের একটি বড় অংশ এই পথ দিয়েই পরিবহন করা হয়। ফলে এখানে যেকোনো ধরনের উত্তেজনা বা সামরিক নিয়ন্ত্রণ আরোপ আন্তর্জাতিক বাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ফার্স নিউজ এজেন্সি, ইরানিয়ান স্টুডেন্টস নিউজ এজেন্সি এবং আইআরআইবি যৌথভাবে সামরিক কমান্ডের বিবৃতি উদ্ধৃত করে জানায়, প্রণালির নিয়ন্ত্রণ পরিস্থিতি এখন সম্পূর্ণভাবে নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে। যদিও কয়েক ঘণ্টা আগে কিছু বিদেশি জাহাজকে এই পথ অতিক্রম করতে দেখা গিয়েছিল, পরবর্তীতে সামুদ্রিক চলাচলের প্রকৃত পরিস্থিতি নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়।

ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসির বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযোগ আনা হয়েছে। সেখানে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক জলপথে এক ধরনের “দস্যুতা” চালাচ্ছে, যা আসলে সামুদ্রিক ডাকাতির সমান। ইরানের দাবি, তাদের বন্দর ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত চাপ ও অবরোধই এই পদক্ষেপের পেছনে মূল কারণ।

এর আগে ইরান ঘোষণা দিয়েছিল, বিদেশি জাহাজ চলাচলের জন্য প্রণালি সাময়িকভাবে খুলে দেওয়া হবে। বিশেষ করে লেবানন অঞ্চলে যুদ্ধবিরতির পর পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হওয়ায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলে জানানো হয়। তবে সেই সিদ্ধান্ত বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি।

গত শুক্রবার ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে ১০ দিনের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর ইরান জানিয়েছিল, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য হরমুজ প্রণালি খোলা থাকবে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাগচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় বলেন, যুদ্ধবিরতির সময় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সচল রাখতে প্রণালি উন্মুক্ত রাখা হবে, তবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইরানি কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত রুট মেনে চলতে হবে।

তবে এই ঘোষণার পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে মন্তব্য করেন, ইরান প্রণালি খুলে দিলেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত ইরানি বন্দরে অবরোধ অব্যাহত থাকবে। এই বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে ইরান ও পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে যে উত্তেজনা চলে আসছে, এই ঘটনা তারই নতুন অধ্যায়। জ্বালানি নির্ভর বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এই জলপথের নিয়ন্ত্রণ কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এখানে যেকোনো পরিবর্তন বৈশ্বিক তেলের দাম এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলতে পারে।

অন্যদিকে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অবস্থানও এই সিদ্ধান্তে ভূমিকা রেখেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সামরিক কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষার স্বার্থে প্রয়োজন হলে কঠোর পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত তারা।

এদিকে শুধু সমুদ্রপথ নয়, আকাশপথ নিয়েও কিছুটা শিথিলতা দেখিয়েছে ইরান। দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনা জানিয়েছে, আকাশসীমার আংশিক অংশ আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময় সকাল ৭টা থেকে পূর্বাঞ্চলের আকাশপথে সীমিতভাবে ফ্লাইট চলাচল শুরু হয়েছে এবং ধীরে ধীরে তা স্বাভাবিক করার পরিকল্পনা রয়েছে।

এর আগে সাম্প্রতিক উত্তেজনা এবং সামরিক পরিস্থিতির কারণে ইরানের আকাশসীমা প্রায় সম্পূর্ণভাবে বন্ধ ছিল। বিশেষ করে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর থেকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চলাচল স্থগিত করা হয়, যা দেশের বিমান পরিবহন খাতকে বড় ধরনের চাপে ফেলে দেয়।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরানের একদিকে যেমন সামরিক কঠোর অবস্থান স্পষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম কিছুটা পুনরায় চালুর চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে এই দুই অবস্থানের মধ্যে ভারসাম্য কতটা টেকসই হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি আন্তর্জাতিক জলপথে বারবার অবরোধ ও উন্মুক্তকরণের সিদ্ধান্ত শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। বিশেষ করে তেল আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য এটি একটি বড় উদ্বেগের বিষয়।

সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে ইরানের এই নতুন সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আবারও উত্তপ্ত করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক মহল এখন নজর রাখছে, এই সংকট কতদূর গড়ায় এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে এর প্রভাব কতটা গভীর হয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত