প্রকাশ: ০৪ ডিসেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
মা কুকুরের নতুন ছানা পাওয়া তাকে ধীরে ধীরে সুস্থ করে তুলেছে—এমনই এক ছুঁয়ে যাওয়া দৃশ্য দেখা গেছে পাবনার ঈশ্বরদীতে, যেখানে কয়েক দিন আগেও আটটি কুকুরছানা হত্যার সেই নির্মমতার পর শোকে কাতর ছিল নিঃস্ব ও অসহায় একটি মায়ের আকুতিমাখা আর্তনাদ। উপজেলা পরিষদ চত্বরে যখন একে একে উদ্ধার হচ্ছিল ডুবিয়ে মারা ছানাগুলোর নিথর দেহ, তখন মা কুকুরটি ছুটে বেড়াচ্ছিল অস্থির হয়ে, চিৎকার করে কাঁদছিল, আর খুঁজছিল তার সন্তানদের। সেই মুহূর্তের দুঃসহ দৃশ্য স্থানীয় মানুষ ও স্বেচ্ছাসেবীদেরও নাড়িয়ে দিয়েছিল গভীরভাবে।
ঘটনার পর কয়েক ঘণ্টা ধরে কুকুরটির এমন অবস্থায় দেখা যায় সে খাবার খাচ্ছে না, কারও কাছে আসছে না, কাঁদতে কাঁদতে ছুটছে পরিষদ চত্বর থেকে রাস্তায়, আবার ছুটে যাচ্ছে পুকুরপাড়ে। প্রাণহীন ছানাগুলোর দেহ উদ্ধার হওয়ার পরও সে বারবার একই স্থানে ঘুরে বেড়িয়েছে। দুর্বল হয়ে পড়েছিল, চোখে-মুখে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল নিদারুণ শোক। মানুষের মতোই মাতৃত্বজনিত আকুলতা তাকে মুহূর্তে অসহায় করে দিয়েছিল।
ঠিক এমন সময় পাশে দাঁড়ায় স্থানীয় ‘ঈশ্বরদিয়ান’ নামের এক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। সংগঠনের মুখপাত্র শাহরিয়ার অমিত জানান, তারা কয়েক বছর ধরে কুকুর ও বিড়ালের সুরক্ষা, চিকিৎসা ও খাবার প্রদানের কাজে নিয়োজিত। ঘটনাস্থলে পৌঁছে তারা দেখেন, ছানা হারানো মা কুকুরটির আহাজারি থামানো যাচ্ছে না। প্রথমে তারা তাকে শান্ত করার চেষ্টা করেন, কিন্তু সে কারও কাছে আসছিল না—মনে হচ্ছিল মাতৃত্বের শূন্যতা তাকে ভেঙে দিয়েছে।
এরপরই তারা মানবিক এক সিদ্ধান্ত নেন। শাহরিয়ার অমিতের বাড়ির সামনে থাকা পোষা কুকুরের ছানাগুলোর মধ্য থেকে দুটি ছানা ওই মা কুকুরটির কাছে দেওয়া হয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) উপস্থিতিতে। ছানাগুলোর শরীরে ওই মা কুকুরটির গন্ধ লাগানোর জন্য প্রথমে তার বুক থেকে কিছু দুধ সংগ্রহ করে নতুন ছানাগুলোকে খাওয়ানো হয়। এতে নতুন ছানা দুটির শরীরে তার গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। অভিজ্ঞ উদ্ধারকারীরা জানতেন, মায়ের গন্ধ না পেলে অনেক কুকুরই নতুন ছানা গ্রহণ করে না।
প্রথমে মা কুকুরটি একটু দ্বিধাগ্রস্ত ছিল, কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যেই ছানাগুলোর গন্ধ পেয়ে যেন তার মাতৃত্ব আবার জাগ্রত হয়ে ওঠে। ধীরে ধীরে সে ছানাগুলোকে চেটে আদর করতে শুরু করে। কয়েক ঘণ্টা পর দেখা যায়, সে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ছানাগুলোকে বুকে টেনে নিয়ে দুধ পান করাচ্ছে। যেন দীর্ঘ অন্ধকারের পর নতুন আলো ফিরে পেয়েছে।
পরদিন সকালে পরিস্থিতি আরও বদলে যায়। দুটি নতুন অনাথ ছানা—যাদের মা মারা গেছে—স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা ও ইউএনও’র উপস্থিতিতে আবার ওই মা কুকুরটির কাছে দিয়ে আসেন। এবারও সে ছানাগুলোকে গ্রহণ করে। এভাবে মোট চারটি নতুন ছানার মা হন তিনি। যে কুকুরটি মাত্র দুই দিন আগেও শোকে কাতর হয়ে খাবার খাচ্ছিল না, আজ তাকে চারটি ছানার সঙ্গে ব্যস্ত সময় কাটাতে দেখা যাচ্ছে। একদিকে নিজে খাচ্ছে, অপরদিকে নিয়ম করে ছানাগুলোকে দুধ পান করাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, কুকুরের মানসিক ক্ষতও মানুষের মতোই গভীর হতে পারে। মা কুকুরটির আচরণের পরিবর্তন দেখে তা আরও স্পষ্ট হয়েছে। তাকে যত্নে রাখা হয়েছে, খাবার ও চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে, এবং প্রত্যেক দিন তার অবস্থার খবর নেওয়া হচ্ছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান জানান, ঘটনাটি শুধু নির্মমই নয়, বরং আইনগতভাবেও শাস্তিযোগ্য। জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আকলিমা খাতুন বাদী হয়ে হত্যার অভিযোগে মামলা করেন হত্যার অভিযোগ ওঠা অভিযুক্ত নিশি রহমানের বিরুদ্ধে। তিনি গ্রেপ্তার হয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছেন।
ইউএনও মনিরুজ্জামান বলেন, আটটি ছানা ডুবিয়ে হত্যার পর মা কুকুরটির কান্নায় সবাই মর্মাহত হয়েছিল। তাকে শান্ত করা যাচ্ছিল না। কিন্তু নতুন ছানা পাওয়ার পর তার আচরণ সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে। এখন সে স্বাভাবিক, খাচ্ছে, খেলছে, ছানাদের আগলে রাখছে। তিনি আরও বলেন, উপজেলা প্রশাসন কুকুরগুলোর দেখভাল অব্যাহত রেখেছে। নিয়মিত খাবার, চিকিৎসা এবং প্রয়োজনীয় সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়।
স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীরা জানান, সমাজে সব প্রাণীর জীবনই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে পথকুকুরদের ক্ষেত্রে মানবিক আচরণ নিশ্চিত করা জরুরি। একদিকে নিষ্ঠুরতার নজির তৈরি হলেও, অন্যদিকে মানুষিক সহানুভূতি ও উদ্যোগ যে প্রাণীর জীবনও বদলে দিতে পারে, এই ঘটনাটি তারই জীবন্ত প্রমাণ।
আজ দুপুরে শাহরিয়ার অমিত ও এই প্রতিবেদক গিয়ে দেখেন, মা কুকুরটি আগের তুলনায় অনেক বেশি চনমনে। চারটি ছানাকে কেন্দ্র করে তার নতুন জীবন যেন আবার ফিরে এসেছে। ছানাগুলো ঘুমালে সে পাশে শুয়ে থাকে, আর যখন তারা কাঁদে, সাথে সাথে গিয়ে তাদের আদর করে শান্ত করে। মাঝে মাঝে ছানাদের সঙ্গে লেজ নেড়ে খেলতেও দেখা যায়।
এই দৃশ্য দেখে স্থানীয় মানুষদের চোখেও গভীর আবেগ ফুটে ওঠে। কয়েকজন বলছিলেন, প্রাণীদেরও অনুভূতি আছে—তাদের ভালোবাসা আর বেদনা বোঝার দায়িত্ব মানুষেরই।
নির্মমভাবে আটটি ছানা হত্যার ঘটনায় যদিও ক্ষোভ ও সমালোচনা দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে, তবে নতুন চারটি ছানাকে বুকে টেনে নেওয়া মা কুকুরটিকে ঘিরে মানবিকতার যে উজ্জ্বল ছবি তৈরি হয়েছে, তা আবারও মনে করিয়ে দেয়—স্বল্প একটু যত্নই পারে জীবন বাঁচাতে, পারে শোকের ঘন অন্ধকার সরিয়ে নতুন আলো দেখাতে।