প্রকাশ: ১৪ ডিসেম্বরে ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যস্ততা ও হিসাব-নিকাশের গতি ক্রমেই বাড়ছে। ক্ষমতার পালাবদলের স্বপ্ন, আন্দোলনের স্মৃতি আর ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক বন্দোবস্ত—সবকিছু মিলিয়ে নির্বাচন ঘিরে বিরোধী শিবিরে চলছে গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতার প্রক্রিয়া। এই প্রেক্ষাপটে বিএনপি তাদের মিত্র ও যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোর সঙ্গে আসন সমঝোতা চূড়ান্ত করতে সময় বেঁধে দিয়েছে। দলটি জানিয়েছে, আগামী ১৮ ডিসেম্বরের মধ্যেই প্রতিটি শরিক দলের সঙ্গে আলাদাভাবে আলোচনা শেষ করে ১৯ বা ২০ ডিসেম্বরের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে আসন বণ্টনের ঘোষণা দেওয়া হবে।
বিএনপির দায়িত্বশীল সূত্রগুলো জানায়, নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই জোটগত ঐক্য রক্ষা এবং বিভ্রান্তি দূর করা জরুরি হয়ে পড়েছে। সে কারণেই দলটি শরিকদের সঙ্গে ‘ওয়ান টু ওয়ান’ বৈঠকের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রতিটি বৈঠকে সংশ্লিষ্ট দলের সাংগঠনিক শক্তি, আগের আন্দোলনে ভূমিকা, সম্ভাব্য আসন, এমনকি ভবিষ্যতে সরকার গঠিত হলে তাদের রাজনৈতিক মূল্যায়নের বিষয়ও আলোচনায় আসবে। বিএনপির হাইকমান্ড চায়, দীর্ঘদিনের যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের যেন শেষ মুহূর্তে হতাশ হতে না হয়, আবার দলীয় কৌশলগত অবস্থানও যেন দুর্বল না হয়।
এই লক্ষ্যেই গত শনিবার দুপুরে রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে যুগপৎ আন্দোলনে যুক্ত দল ও জোটগুলোর সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে গণতন্ত্র মঞ্চ, ১২ দলীয় জোট, গণঅধিকার পরিষদ, জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট, গণফোরামসহ ৩৮টির বেশি দল ও জোটের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। বিএনপির পক্ষে বৈঠকে অংশ নেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।
বৈঠকে দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আসন্ন নির্বাচন, যুগপৎ আন্দোলনের অভিজ্ঞতা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে আসন সমঝোতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। উপস্থিত নেতাদের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, নির্বাচন ঘিরে নানা ষড়যন্ত্র, গুজব ও বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে, যা বিরোধী রাজনৈতিক ঐক্যকে দুর্বল করতে পারে। অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করেন, যদি দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে আসন বণ্টনের বিষয়টি নিষ্পত্তি না হয়, তাহলে মাঠপর্যায়ে ভুল বোঝাবুঝি বাড়তে পারে এবং রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও তীব্র হতে পারে।
বৈঠকে অংশ নেওয়া দলগুলোর নেতারা জানান, আলোচনার একটি বড় অংশজুড়ে ছিল ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক ঐক্য অটুট রাখার প্রশ্ন। তাদের মতে, যুগপৎ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে আস্থা ও সহযোগিতার সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, তা শুধু একটি নির্বাচনের জন্য নয়, বরং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত বজায় রাখা জরুরি। অনেক নেতা বলেন, নির্বাচন ঘিরে ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থ বড় হয়ে উঠলে সেই ঐক্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
আসন বণ্টন নিয়ে বৈঠকে খোলামেলা আলোচনা হলেও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সেখানে নেওয়া হয়নি। তবে বিএনপির পক্ষ থেকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে যে, ১৮ ডিসেম্বরের মধ্যেই সব শরিক দলের সঙ্গে পৃথক বৈঠক শেষ করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হবে। সূত্র জানায়, বিএনপি হাইকমান্ড এ বিষয়ে অতিরিক্ত সময় নিতে আগ্রহী নয়। কারণ, সময় যত গড়াচ্ছে, ততই মাঠপর্যায়ে প্রস্তুতির চাপ বাড়ছে এবং অনিশ্চয়তা রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে।
সূত্রগুলো আরও জানায়, কয়েকটি শরিক দল ইতোমধ্যে আসন বণ্টন নিয়ে ক্ষোভ ও অসন্তোষের কথা জানিয়েছে। তাদের অভিযোগ, যুগপৎ আন্দোলনের সময় যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা থেকে বিএনপি সরে আসছে কি না—এই প্রশ্ন তাদের মনে তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ভবিষ্যতে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত, গণতান্ত্রিক উত্তরণ এবং প্রস্তাবিত জাতীয় সরকারে শরিকদের ভূমিকা কী হবে, সে বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে জানতে চেয়েছেন তারা।
তবে একই সঙ্গে এসব দল এটাও স্পষ্ট করেছে যে, গণতন্ত্র ও দেশের বৃহত্তর স্বার্থে তারা বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে চান না। বরং সম্মান, মর্যাদা ও ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। অনেক নেতা দ্রুত আসন সমঝোতা চূড়ান্ত করার আহ্বান জানান, যাতে মাঠপর্যায়ে বিভ্রান্তি দূর হয় এবং সবাই নিজ নিজ প্রস্তুতি নিতে পারে।
বৈঠকে কয়েকটি দল অভিযোগ তোলে যে, তারা নিজস্ব প্রতীক নিয়ে প্রচারে নামতে চাইলে স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের বাধার মুখে পড়ছেন। কোথাও কোথাও হামলার ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ করা হয়। এ বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়, যাতে জোটগত সম্পর্কের মধ্যে কোনো তিক্ততা সৃষ্টি না হয়।
এর জবাবে বিএনপির নেতারা জানান, মিত্র দলগুলোর সঙ্গে বৈরিতা তৈরি করা দলের লক্ষ্য নয়। বরং যেকোনো মূল্যে ঐক্য ধরে রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়, ঘোষিত কয়েকটি আসনে প্রয়োজনে মনোনয়ন পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে। পাশাপাশি যেসব শরিক দলকে সরাসরি আসন দিয়ে মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে না, তাদের সংসদের উচ্চকক্ষে বা ভবিষ্যৎ জাতীয় সরকারে উপযুক্তভাবে অন্তর্ভুক্ত করার চিন্তাভাবনাও রয়েছে।
বৈঠকের পর বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক সাংবাদিকদের জানান, বিএনপি শরিকদের সঙ্গে খোলামেলা পরিবেশে আলোচনা করেছে এবং আসন বণ্টন নিয়ে যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে, তা দূর করার উদ্যোগ নিয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ১৮ ডিসেম্বরের মধ্যেই সবকিছু চূড়ান্ত হবে এবং যুগপৎ আন্দোলনের ঐক্য আরও সুসংহত হবে।
গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান বলেন, আলোচনায় সব দলই নিজেদের রাজনৈতিক মূল্যায়নের কথা তুলে ধরেছে। বিএনপির পক্ষ থেকে খুব শিগগিরই পৃথক বৈঠকের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। তার মতে, এই প্রক্রিয়া সঠিকভাবে সম্পন্ন হলে নির্বাচন ঘিরে বিরোধী জোটের অবস্থান আরও শক্ত হবে।
এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানান, বিএনপি কারো সঙ্গে আনুষ্ঠানিক জোট করেনি, তবে একটি রাজনৈতিক কমিটমেন্ট ছিল—যারা যুগপৎ আন্দোলনে থাকবে, সরকারে গেলেও তাদের নিয়ে চলা হবে। তিনি বলেন, বাস্তবতা হলো এখন অনেকেই নির্বাচন করতে চান, কিন্তু ধানের শীষ ছাড়া নির্বাচন করা কঠিন। তবুও শরিকদের জন্য কিছু আসন ছাড় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যেই তা ঘোষণা করা হবে।
সব মিলিয়ে, ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়টিই হয়ে উঠেছে বিরোধী রাজনীতির জন্য নির্ধারক অধ্যায়। আসন সমঝোতার এই দৌড় কেবল সংখ্যা বণ্টনের প্রশ্ন নয়; এটি ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সম্পর্ক, আন্দোলনের ঐক্য এবং গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথচলার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। ২০ ডিসেম্বরের মধ্যে চূড়ান্ত ঘোষণার মাধ্যমে সেই অনিশ্চয়তার অবসান ঘটে কি না, এখন সেদিকেই তাকিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন।