সুযোগ পেলেই চালের দাম বাড়াতে তৎপর সিন্ডিকেট

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৩৬ বার

প্রকাশ: ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন 

চালের দাম বাড়ানোর সিন্ডিকেট—এই কথাটিই এখন দেশের বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করছেন ব্যবসায়ী ও বিশ্লেষকেরা। কারণ, সরকারের নানামুখী পদক্ষেপে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে চালের বাজার তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকলেও করপোরেট কোম্পানি ও বড় মিলমালিকদের একটি অংশ যে সুযোগের অপেক্ষায় রয়েছে, তা বাজারের ভেতরের খবরেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

গত কয়েকদিনে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে মোটা ও মাঝারি চালের দাম কেজিতে তিন থেকে চার টাকা পর্যন্ত কমেছে। নতুন ধান বাজারে আসা এবং সরবরাহ কিছুটা বাড়ার কারণে এই স্বস্তি দেখা যাচ্ছে। তবে এই ইতিবাচক চিত্রের মধ্যেও একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতা রয়েছে—সরু চালের দাম গত তিন সপ্তাহেও কমেনি। বরং কিছু ক্ষেত্রে তা আগের উচ্চ পর্যায়েই স্থির আছে। বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, এখানেই লুকিয়ে আছে সিন্ডিকেটের ভবিষ্যৎ কৌশল।

রাজধানীর তেজগাঁওয়ের পাইকারি বাজারে কথা হয় চাঁদপুর রাইস এজেন্সির স্বত্বাধিকারী বাচ্চু মিয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন, আগের বছরগুলোতে করপোরেট হাউসগুলো একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ চাল আমদানির অনুমতি পেয়ে তার চেয়েও বেশি চাল কিনে মজুত করত। পরে ধাপে ধাপে সেই চাল বাজারে ছেড়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানো হতো। কিন্তু এবার সরকারের আমদানি নীতি ভিন্ন হওয়ায় তারা সেই সুযোগ পায়নি। অল্প অল্প করে এবং দীর্ঘ সময় ধরে আমদানির অনুমতি দেওয়ায় বাজারে একসঙ্গে বড় মজুত গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। ফলে সিন্ডিকেট চক্র এবার অনেকটাই বেকায়দায় পড়েছে।

তিনি আরও জানান, গত তিন সপ্তাহে মাঝারি ও মোটা চালের দাম কেজিতে তিন থেকে চার টাকা কমেছে। নতুন ধান উঠতে শুরু করায় সামনে দাম আরও কিছুটা কমার সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে মিনিকেটসহ সরু চালের ক্ষেত্রে ভিন্ন চিত্র। এসব চাল আগের বাড়তি দামেই বিক্রি করছে বড় কোম্পানিগুলো। এতে বোঝা যায়, তারা পুরোপুরি পিছু হটেনি; বরং উপযুক্ত সময়ের অপেক্ষায় রয়েছে।

রোববার রাজধানীর বিভিন্ন খুচরা বাজার ঘুরে দেখা যায়, গুটি, স্বর্ণা, পাইজাম, ব্রি-২৮ ও ব্রি-২৯ জাতের চালের সরবরাহ তুলনামূলকভাবে বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে দামে। এসব চালের দাম কেজিতে দুই থেকে তিন টাকা পর্যন্ত কমেছে। খুচরা বাজারে নাজিরশাইল ও জিরাশাইলসহ সরু চাল কেজিতে ৬৮ থেকে ৭৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা এক সপ্তাহ আগেও ছিল ৭০ থেকে ৮০ টাকা। নতুন গুটি স্বর্ণা মানভেদে বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৫৫ টাকায়। অন্যদিকে মিনিকেট চালের দাম এখনো ৭৪ থেকে ৮৫ টাকার মধ্যে ঘোরাফেরা করছে।

তেজগাঁওয়ের জনতা রাইস এজেন্সির মালিক হাজি আবু ওসমান বলেন, ধীরে ধীরে বাজারে চালের সরবরাহ বাড়ছে। এর ফলে সামনের দিনগুলোতে দাম আরও কমতে পারে। বর্তমানে মোটা চাল ৫০ থেকে ৬০ টাকার মধ্যে, মাঝারি চাল ৬৫ থেকে ৭০ টাকার মধ্যে এবং সরু চাল ৭৫ থেকে ৮৫ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। তবে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, বেসরকারি আমদানি পুরোপুরি বন্ধ থাকলে করপোরেট কোম্পানিগুলো আবার সুযোগ নিতে পারে।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বেসরকারি আমদানি বন্ধ হয়ে যাওয়াটাই এখন সিন্ডিকেটের জন্য সবচেয়ে বড় আশার জায়গা। সরকারি আমদানির ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হলে বাজারে সরবরাহে সামান্য ঘাটতি তৈরি হলেই দাম বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়। বিশেষ করে সরু ও ব্র্যান্ডেড চালের ক্ষেত্রে করপোরেট কোম্পানিগুলোর প্রভাব বেশি থাকায় তারা সহজেই দাম বাড়াতে পারে।

এদিকে সিদ্ধ চালের দাম কিছুটা কমলেও পোলাও ও আতপ চালের বাজারে ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। মানভেদে পোলাও চালের দাম কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। মোজাম্মেল কোম্পানির পোলাও চাল সর্বোচ্চ ১৪০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। অন্য কোম্পানির আতপ চাল মানভেদে ১২০ থেকে ১৩০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। এতে মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের চাপ বাড়ছে, কারণ উৎসব ও সামাজিক অনুষ্ঠানে এসব চালের চাহিদা তুলনামূলক বেশি।

সরকারি বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের সর্বশেষ দৈনিক মূল্যতালিকা অনুযায়ী, মোটা চালের দাম কেজিতে সর্বনিম্ন ৫৪ টাকা ও সর্বোচ্চ ৬০ টাকা, মাঝারি চাল ৫৮ থেকে ৬৮ টাকা এবং সরু চাল ৭০ থেকে ৮৫ টাকার মধ্যে রয়েছে। টিসিবির হিসাবে গত এক মাসে সরু চালের দাম কমেছে গড়ে ১ দশমিক ২৭ টাকা এবং মাঝারি চালের দাম কমেছে প্রায় ১ দশমিক ৫৬ শতাংশ। যদিও এই পরিসংখ্যান সামান্য স্বস্তির ইঙ্গিত দেয়, বাস্তবে সাধারণ ভোক্তাদের কাছে সরু চালের দাম এখনও বেশ চড়া।

খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে বর্তমানে পর্যাপ্ত চালের মজুত রয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম তুলনামূলকভাবে কমেছে এবং ভারতের বিকল্প উৎসও রয়েছে। এসব কারণে আগামী দিনগুলোতে চালের বাজার বড় ধরনের অস্থিরতায় পড়ার আশঙ্কা কম। তবে তারা স্বীকার করছেন, বাজারে নজরদারি শিথিল হলেই সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে।

অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, চালের বাজার স্থিতিশীল রাখতে হলে শুধু আমদানি নয়, অভ্যন্তরীণ মজুত, মিল পর্যায়ের নজরদারি এবং করপোরেট কোম্পানির কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। নইলে সুযোগ পেলেই চালের দাম বাড়ানোর সিন্ডিকেট আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। সাধারণ ভোক্তা তখন আবারও মূল্যস্ফীতির চাপে পড়বে।

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত