শিশুদের থাইরয়েড রোগ: নীরব সংকট ও প্রতিরোধের পথ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১০ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৯ বার
শিশুদের থাইরয়েড রোগের কারণ

প্রকাশ: ১০ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজধানীর সেগুনবাগিচায় অবস্থিত বারডেম জেনারেল হাসপাতালের মা ও শিশু বিভাগের সামনে প্রতিদিনই দেখা যায় উৎকণ্ঠিত অভিভাবকদের ভিড়। তাদের কারও কোলে নবজাতক, কারও হাত ধরে একটু বড় শিশু। এমনই এক সকালে হাসপাতালের করিডোরে চোখে পড়ে সাবিনা বেগমকে। কোলে তার এক বছরের কন্যাশিশু মৌমিতা। শিশুটি জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে, মাঝে মাঝেই চিৎকার করে কাঁদছে। মায়ের চোখে আতঙ্ক আর অসহায়ত্ব। কথা বলে জানা যায়, মৌমিতা জন্মের পর থেকেই থাইরয়েড সমস্যায় ভুগছে। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, জন্মগত এই সমস্যার কারণেই শিশুটি ধীরে ধীরে দীর্ঘস্থায়ী জন্ডিসে আক্রান্ত হয়েছে।

সাবিনার অভিজ্ঞতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বারডেম হাসপাতালসহ ঢাকার বিভিন্ন বিশেষায়িত চিকিৎসা কেন্দ্রে প্রতিদিনই অন্তত আট থেকে দশজন অভিভাবক থাইরয়েডে আক্রান্ত শিশু ও কিশোরদের নিয়ে আসেন। সরেজমিনে অপেক্ষমাণ অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অনেক শিশুই স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠতে পারছে না, কারও শারীরিক বৃদ্ধি থমকে গেছে, কারও আবার মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কেউ কেউ স্কুলে মনোযোগ ধরে রাখতে পারছে না, কেউ আবার অস্বাভাবিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে।

চিকিৎসকদের ভাষায়, শিশুর জীবনের প্রথম তিন বছর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ের মধ্যেই মস্তিষ্কের বিকাশ প্রায় সম্পন্ন হয়, যার বড় অংশ ঘটে প্রথম বছরেই। শিশুর স্বাভাবিক শারীরিক বৃদ্ধি, বুদ্ধির বিকাশ ও মানসিক সক্ষমতা গড়ে তুলতে থাইরয়েড হরমোন অপরিহার্য। এই হরমোনের ঘাটতি হলে শিশুর দেহ ও মস্তিষ্ক সঠিকভাবে বিকশিত হতে পারে না। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় কনজেনিটাল হাইপোথাইরয়েডিজম। সাধারণত থাইরয়েড গ্রন্থি সম্পূর্ণভাবে গঠিত না হওয়া, হরমোন তৈরিতে জন্মগত ত্রুটি বা হরমোন নিঃসরণে সমস্যা হলে এই রোগ দেখা দেয়।

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্সেস বিভাগের একাধিক গবেষণায় উঠে এসেছে, থাইরয়েড রোগ কোনো সংক্রামক ব্যাধি নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটি বংশানুক্রমিক ও জিনগত। গবেষণা অনুযায়ী, প্রতি দুই হাজার ৩০০ জন শিশুর মধ্যে একজন জন্মগতভাবে থাইরয়েড সমস্যায় আক্রান্ত হয়। নারীদের মধ্যে এই রোগের প্রকোপ তুলনামূলকভাবে বেশি। পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি ১০ জন নারীর মধ্যে একজন থাইরয়েড সমস্যায় ভুগছেন। বাবা-মায়ের একজন বা দুজনের থাইরয়েড সমস্যা থাকলে সন্তানের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়।

তবে শুধু বংশগত কারণেই নয়, পরিবেশগত ও পুষ্টিগত ঘাটতিও শিশুদের থাইরয়েড সমস্যার জন্য দায়ী। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা জানান, আয়োডিনের অভাব থাইরয়েড রোগের অন্যতম বড় কারণ। আয়োডিন থাইরয়েড হরমোন তৈরির জন্য অপরিহার্য উপাদান। শরীরে পর্যাপ্ত আয়োডিন না থাকলে হরমোন উৎপাদন ব্যাহত হয়। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডায়াবেটিস ও হরমোন বিভাগের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের অধিকাংশ স্কুলগামী শিশু ও অন্তঃসত্ত্বা নারীর শরীরে আয়োডিনের ঘাটতি রয়েছে। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্যের ওপর।

কিছু ক্ষেত্রে থাইরয়েড সমস্যার পেছনে ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও ভূমিকা রাখে। বিশেষ কিছু ওষুধ দীর্ঘদিন সেবনের ফলে থাইরয়েড হরমোনের নিঃসরণ কমে যেতে পারে বা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। যদিও এ ধরনের ঘটনা নবজাতকের মধ্যে খুব কম দেখা যায়, তবে বড় শিশু ও কিশোরদের ক্ষেত্রে এমন ঝুঁকি থেকে যায়। চিকিৎসকেরা বলছেন, মাতৃগর্ভে থাকাকালীন শিশুর সঠিক বৃদ্ধি ও বিকাশের জন্যও থাইরয়েড হরমোন অত্যন্ত জরুরি। তাই অন্তঃসত্ত্বা নারীদের থাইরয়েড পরীক্ষা করা এবং প্রয়োজনে চিকিৎসা নেওয়া অত্যাবশ্যক।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসক শাহজাদা সেলিম বলেন, শিশুদের থাইরয়েড সমস্যা হলে থাইরয়েড গ্রন্থি পর্যাপ্ত হরমোন উৎপাদনে ব্যর্থ হয়। এর ফলে শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি, উচ্চতা, ওজন ও বুদ্ধির বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। জন্মের পর দীর্ঘস্থায়ী জন্ডিস, অতিরিক্ত ঘুম, খাওয়ায় অনীহা, হঠাৎ ওজন বৃদ্ধি কিংবা অস্বাভাবিক দুর্বলতা এসবই হতে পারে থাইরয়েড সমস্যার লক্ষণ।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে থাইরয়েড সমস্যা প্রধানত দুই ধরনের। একদিকে রয়েছে হাইপোথাইরয়েডিজম, যেখানে হরমোন কম নিঃসৃত হয়। অন্যদিকে হাইপারথাইরয়েডিজম, যেখানে হরমোনের নিঃসরণ অস্বাভাবিকভাবে বেশি হয়। শিশুদের ক্ষেত্রে প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি হাইপোথাইরয়েডিজম বেশি দেখা যায়। ছোট শিশুদের হাইপোথাইরয়েডিজম হলে উচ্চতা ও ওজন ঠিকমতো বাড়ে না, কোষ্ঠকাঠিন্য, ত্বকের শুষ্কতা, পেট ফুলে যাওয়া এবং চেহারায় অস্বাভাবিকতা দেখা দিতে পারে। একটু বড় বয়সে এই সমস্যা হলে বয়ঃসন্ধি দেরিতে আসার মতো জটিলতাও তৈরি হয়।

তবে আশার কথা হলো, সময়মতো সঠিক চিকিৎসা পেলে থাইরয়েডে আক্রান্ত শিশুরাও সুস্থ, স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে। ডা. শাহজাদা সেলিমের ভাষায়, শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধি সম্পন্ন হওয়ার আগেই রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা শুরু করা গেলে স্থায়ী ক্ষতি এড়ানো সম্ভব। এমনকি বড় বয়সে থাইরয়েড সমস্যা ধরা পড়লেও নিয়মিত চিকিৎসায় স্বাভাবিক জীবনযাপন সম্ভব।

ডা. সিরাজুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হরমোন ও ডায়াবেটিক বিশেষজ্ঞ মাজহারুল হক তানিম জানান, থাইরয়েড রোগীদের মধ্যে প্রতি ১০ জনের ৯ জনই নারী। প্রায় ৮ শতাংশ মানুষ সাব-ক্লিনিক্যাল হাইপোথাইরয়েডিজমে ভুগছেন, যার অধিকাংশই জানেন না যে তারা এই সমস্যায় আক্রান্ত। এর ফলে রোগটি নীরবে জটিল আকার ধারণ করে।

দেশে থাইরয়েড রোগের চিকিৎসা ব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে উন্নত। বারডেম হাসপাতাল, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজসহ দেশের প্রায় সব মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও পরমাণু চিকিৎসাকেন্দ্রে থাইরয়েড রোগের আধুনিক চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে বিএমইউর থাইরয়েড ক্লিনিক তিন দশকের বেশি সময় ধরে হাজার হাজার রোগীকে সমন্বিত চিকিৎসা সেবা দিয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, থাইরয়েড রোগ প্রতিরোধে সচেতনতার বিকল্প নেই। আয়োডিনযুক্ত লবণ নিয়মিত খাওয়া, অপ্রয়োজনীয় রেডিয়েশন এড়িয়ে চলা এবং বিশেষ করে অন্তঃসত্ত্বা নারীদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা জরুরি। শিশুর শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধি স্বাভাবিক না হলে, ঠান্ডা বা গরম সহ্য করতে সমস্যা হলে, বুক ধড়ফড় করা কিংবা খাওয়া কমলেও ওজন বাড়া বা কমার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকেরা।

একটি সুস্থ প্রজন্ম গড়ে তুলতে শিশুদের থাইরয়েড রোগকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। সময়মতো সঠিক পদক্ষেপ নিলে এই নীরব সংকটকে বড় মানবিক বিপর্যয়ে পরিণত হওয়া থেকে রক্ষা করা সম্ভব।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত