প্রকাশ: ১০ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদের মনোনয়নপত্রকে বৈধ ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে করা আপিল শুনানি শেষে শনিবার (১০ জানুয়ারি) রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে এই সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়। এর ফলে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কক্সবাজার-২ (মহেশখালী-কুতুবদিয়া) আসনে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অংশ নেওয়ার পথে থাকা সব আইনি বাধা দূর হলো তার। কমিশনের এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে উপকূলীয় এই গুরুত্বপূর্ণ আসনে নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে।
আপিল শুনানি শেষে কমিশনের সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর দলীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে স্বস্তি ও উচ্ছ্বাস দেখা যায়। নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা জানান, প্রার্থীর দাখিল করা কাগজপত্র, হলফনামার তথ্য এবং আইনগত ব্যাখ্যা পর্যালোচনা করে কমিশন সর্বসম্মতভাবে মনোনয়ন বৈধ বলে বিবেচনা করেছে। এই প্রক্রিয়া নির্বাচন আইনের আওতায় স্বচ্ছতা ও ন্যায়সংগততা নিশ্চিত করার অংশ হিসেবে সম্পন্ন হয়েছে বলে কমিশনের দায়িত্বশীল সূত্রগুলো উল্লেখ করেছে।
হামিদুর রহমান আযাদ কক্সবাজার-২ আসনের পরিচিত রাজনৈতিক মুখ। মহেশখালী ও কুতুবদিয়ার মতো দ্বীপাঞ্চল ও উপকূলীয় জনপদের মানুষের সঙ্গে দীর্ঘদিনের যোগাযোগ, সাংগঠনিক রাজনীতি ও সংসদীয় অভিজ্ঞতা তাকে এই আসনে প্রভাবশালী করে তুলেছে। আসন্ন নির্বাচনে তিনি আবারও এই এলাকার উন্নয়ন, অবকাঠামো, বিদ্যুৎ-জ্বালানি, নৌযোগাযোগ, মৎস্য ও উপকূলীয় জনজীবনের নিরাপত্তা—এসব ইস্যুকে সামনে রেখে প্রচারণা চালাবেন বলে তার ঘনিষ্ঠরা জানিয়েছেন।
ঘটনার পেছনের প্রেক্ষাপট ছিল জটিল। গত ২ জানুয়ারি হলফনামায় দেওয়া মামলার তথ্য সংক্রান্ত একটি বিষয়ে অস্পষ্টতা ও নথিগত জটিলতার কারণে কক্সবাজারের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান তার মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করেন। ওই সিদ্ধান্তের ফলে নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। তবে নির্বাচন আইনের বিধান অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই তিনি নির্বাচন কমিশনে আপিল করেন। আপিলে তিনি প্রয়োজনীয় নথিপত্র, ব্যাখ্যা ও আইনগত যুক্তি উপস্থাপন করেন। শুনানিতে কমিশন উভয় পক্ষের বক্তব্য ও দাখিল করা কাগজপত্র পর্যালোচনা করে রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্ত বাতিল করে তার প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা করে।
এই সিদ্ধান্ত নির্বাচনী প্রক্রিয়ার আপিল ব্যবস্থার কার্যকারিতা তুলে ধরেছে বলে আইন ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। তাদের মতে, প্রাথমিক যাচাই-বাছাইয়ে কোনো ত্রুটি বা ব্যাখ্যার ভিন্নতা থাকলেও আপিলের মাধ্যমে প্রার্থী তার সাংবিধানিক অধিকার প্রয়োগের সুযোগ পান। কমিশনের এই রায় সেই ভারসাম্য রক্ষারই একটি উদাহরণ, যা ভবিষ্যতেও প্রার্থীদের জন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে কাজ করবে।
কক্সবাজার-২ আসনটি ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মহেশখালী ও কুতুবদিয়া দ্বীপের মানুষের জীবনে বিদ্যুৎ, সুপেয় পানি, উপকূল রক্ষা বাঁধ, নৌ-পরিবহন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ বড় চ্যালেঞ্জ। গত কয়েক বছরে মহেশখালীতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রকল্পসহ বড় অবকাঠামো উদ্যোগ নেওয়া হলেও স্থানীয়দের মতে, দ্বীপাঞ্চলের প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতে সেবা পৌঁছাতে এখনও ঘাটতি রয়ে গেছে। হামিদুর রহমান আযাদের সমর্থকরা বলছেন, তার সংসদীয় অভিজ্ঞতা ও জাতীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক যোগাযোগ এই উন্নয়ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারে।
জামায়াতে ইসলামীর সাংগঠনিক দিক থেকেও এই সিদ্ধান্ত তাৎপর্যপূর্ণ। দলটি নির্বাচনী মাঠে নিজেদের অবস্থান জোরদার করতে পরিচিত ও অভিজ্ঞ নেতৃত্বকে সামনে আনতে চায়। হামিদুর রহমান আযাদ দীর্ঘদিন ধরে দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং সাংগঠনিক দক্ষতার জন্য পরিচিত। তার প্রার্থিতা বৈধ হওয়ায় দলীয় কর্মীদের মধ্যে মাঠে সক্রিয়তা বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনেও এই রায় ঘিরে আলোচনা চলছে। সমর্থকরা এটিকে ‘ন্যায়বিচারের জয়’ হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ কেউ নির্বাচন ব্যবস্থার জটিলতা ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ভিন্নতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। তবে অধিকাংশ বিশ্লেষকই একমত যে, কমিশনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্বাচনী আইনের কাঠামোর মধ্যেই হয়েছে এবং এতে প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বজায় আছে।
নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আপিল শুনানি চলবে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত, এরপর প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সুযোগ থাকবে। চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ ও প্রতীক বরাদ্দের পরই মূল প্রচারণা শুরু হবে। এই সময়ের মধ্যেই প্রার্থীদের মাঠপর্যায়ে সংগঠন জোরদার, ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং বার্তা স্পষ্ট করার কাজ শেষ করতে হবে। দলীয় প্রার্থী হিসেবে হামিদুর রহমান আযাদের জন্য সাংগঠনিক সুবিধা থাকলেও দ্বীপাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতা, যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি প্রচারণায় বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
ভোটারদের দৃষ্টিকোণ থেকে এই সিদ্ধান্ত নির্বাচনী প্রতিযোগিতাকে আরও বহুমুখী করেছে। দলীয় প্রার্থীদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা যত বাড়বে, ভোটারদের সামনে তত বেশি বিকল্প ও নীতিনির্ভর বিতর্কের সুযোগ তৈরি হবে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, তারা এবার প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি বাস্তবায়নের সক্ষমতা ও অতীত কর্মকাণ্ডকে গুরুত্ব দিয়ে ভোট দিতে চান। উপকূলীয় সুরক্ষা, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন—এসব বিষয়েই তারা প্রার্থীদের কাছ থেকে সুস্পষ্ট অঙ্গীকার প্রত্যাশা করছেন।
সব মিলিয়ে, হামিদুর রহমান আযাদের প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণার মধ্য দিয়ে কক্সবাজার-২ আসনের নির্বাচনী লড়াই নতুন গতি পেল। এটি কেবল একজন প্রার্থীর আইনি সাফল্য নয়; বরং নির্বাচন কমিশনের আপিল প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা, প্রার্থী অধিকার সংরক্ষণ এবং বহুমাত্রিক প্রতিযোগিতার প্রতিফলন। সামনে প্রচারণার মাঠে কোন বার্তা ভোটারদের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য হয় এবং কে আস্থার জায়গা তৈরি করতে পারেন—সেটিই শেষ পর্যন্ত এই উপকূলীয় আসনের ভাগ্য নির্ধারণ করবে।