মুকসুদপুরে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পাট পুড়ে ছাই, ক্ষতি কোটি টাকা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১০ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৬৬ বার
মুকসুদপুরে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পাট পুড়ে ছাই, ক্ষতি কোটি টাকা

প্রকাশ: ১০ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলায় গভীর রাতে সংঘটিত এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে তিনটি পাটের গুদাম পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। এ ঘটনায় প্রায় ১ হাজার ৮০০ মণ পাট সম্পূর্ণভাবে নষ্ট হয়েছে, যার আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক এক কোটি টাকা বলে জানিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টরা। মুহূর্তের মধ্যেই আগুনের লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের গুদামগুলোতে, ফলে এক রাতেই নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন স্থানীয় তিন পাট ব্যবসায়ী।

শুক্রবার দিবাগত রাত আনুমানিক আড়াইটার দিকে মুকসুদপুর সরকারি টিঅ্যান্ডটি অফিসের সামনের একটি পাটের গুদামে প্রথমে আগুনের সূত্রপাত ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হঠাৎ করেই গুদামের ভেতর থেকে ধোঁয়া ও আগুনের শিখা দেখা যায়। রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়তে থাকে এবং পাশের আরও দুটি গুদামে সংরক্ষিত বিপুল পরিমাণ পাট আগুনের কবলে পড়ে। পাট অত্যন্ত দাহ্য হওয়ায় আগুন নিয়ন্ত্রণের আগেই অধিকাংশ মালামাল পুড়ে যায়।

স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে দ্রুত ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেওয়া হয়। খবর পেয়ে মুকসুদপুর ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন মাস্টার মেহেদি হাসানের নেতৃত্বে মুকসুদপুর ও কাশিয়ানী ফায়ার সার্ভিসের মোট চারটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। দীর্ঘ সময় ধরে চেষ্টা চালিয়ে ভোরের দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়। তবে ততক্ষণে তিনটি গুদামে থাকা প্রায় ১ হাজার ৮০০ মণ পাট সম্পূর্ণভাবে পুড়ে ছাই হয়ে যায়।

এই অগ্নিকাণ্ডে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন পাট ব্যবসায়ী সুনীল সাহা। তাঁর গুদামে সংরক্ষিত প্রায় ১ হাজার ৩০০ মণ পাট আগুনে পুড়ে গেছে। এছাড়া নির্মল সাহার ১৭৫ মণ এবং ইকরাম মিয়ার প্রায় ৩০০ মণ পাটও সম্পূর্ণভাবে নষ্ট হয়েছে। তিন ব্যবসায়ীর পাটের মোট পরিমাণ যোগ করলে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১ হাজার ৭৭৫ মণ, যা স্থানীয়ভাবে প্রায় ১ হাজার ৮০০ মণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী সুনীল সাহা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, প্রতিদিনের মতো কাজ শেষ করে রাত আটটার দিকে গুদাম বন্ধ করে বাড়ি ফিরেছিলেন তিনি। গভীর রাতে আগুন লাগার খবর পেয়ে ছুটে এসে দেখেন, তাঁর বহু বছরের পরিশ্রমের ফল এক রাতেই পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। তিনি বলেন, কীভাবে আগুন লেগেছে তা বলতে পারছেন না, তবে এই ক্ষতি তাঁর পক্ষে পুষিয়ে ওঠা প্রায় অসম্ভব। ব্যাংক ঋণ, মহাজনের দেনা আর শ্রমিকদের বকেয়া—সব মিলিয়ে তিনি এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন।

আরেক ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী ইকরাম মিয়া বলেন, তাঁর গুদামে প্রায় ৩০০ মণ পাট ছিল। সারা মৌসুমের সঞ্চয় ছিল এই পাট। আগুনে সব শেষ হয়ে যাওয়ায় তিনি পরিবার নিয়ে কীভাবে চলবেন তা ভেবে পাচ্ছেন না। তাঁর ভাষায়, এই ক্ষতি শুধু অর্থনৈতিক নয়, মানসিকভাবেও তাঁকে ভেঙে দিয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আগুন লাগার পরপরই তারা নিজেদের মতো করে আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু পাটের গুদামে আগুন খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় সাধারণ মানুষের পক্ষে তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন, আগুন আশপাশের বসতবাড়ি বা সরকারি স্থাপনাতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফায়ার সার্ভিসের দ্রুত উপস্থিতির কারণে বড় ধরনের প্রাণহানি বা আরও বিস্তৃত ক্ষতি থেকে এলাকাটি রক্ষা পেয়েছে বলে তারা মনে করেন।

মুকসুদপুর ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার মেহেদি হাসান জানান, রাত আড়াইটার দিকে অগ্নিকাণ্ডের সংবাদ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। মুকসুদপুর ও কাশিয়ানী ইউনিটের চারটি গাড়ি দীর্ঘ সময় কাজ করে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়। তিনি বলেন, কীভাবে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে, তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, গুদামঘরের পেছনে রাখা কাঠের গুড়ি বা দাহ্য কোনো বস্তু থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সঠিক কারণ বলা সম্ভব নয়।

এই ঘটনায় এলাকায় পাট ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। অনেক ব্যবসায়ীই বলছেন, শীত মৌসুমে পাটের গুদামে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি থাকে। বিদ্যুৎ সংযোগ, শুকনো কাঠ বা খড়জাতীয় উপকরণ, এমনকি সিগারেটের আগুন থেকেও বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তারা গুদামগুলোতে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের দাবি জানিয়েছেন।

পাট বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী ও গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল। গ্রামীণ অর্থনীতিতে পাট ব্যবসার ভূমিকা অপরিসীম। মুকসুদপুরসহ গোপালগঞ্জ অঞ্চলে অসংখ্য মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। তাই এই অগ্নিকাণ্ড শুধু কয়েকজন ব্যবসায়ীর ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এর প্রভাব পড়বে স্থানীয় শ্রমিক, পরিবহন শ্রমিক এবং কৃষকদের ওপরও। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা সরকারি সহায়তা ও সহজ শর্তে ঋণের দাবি জানিয়েছেন, যাতে তারা আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারেন।

স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতির তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে গুদাম এলাকায় অগ্নিনিরাপত্তা সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

এক রাতের আগুনে পুড়ে যাওয়া পাটের স্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে হতবিহ্বল ব্যবসায়ীদের চোখেমুখে ছিল অসহায়ত্বের ছাপ। ধোঁয়ার গন্ধ আর ছাইয়ের স্তূপ যেন সাক্ষ্য দিচ্ছিল তাদের স্বপ্নভঙ্গের গল্প। এই অগ্নিকাণ্ড আবারও মনে করিয়ে দিল, সামান্য অবহেলা কিংবা অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা কীভাবে মুহূর্তে বদলে দিতে পারে বহু মানুষের জীবনের গতিপথ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত