বয়সভেদে প্রোটিনের চাহিদা কতটা, জানলে থাকবেন সুস্থ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১০ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৯ বার
বয়সভেদে প্রোটিনের চাহিদা কতটা, জানলে থাকবেন সুস্থ

প্রকাশ:  ১০ জানুয়ারি ২০২৬। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বর্তমান সময়ে সুস্থতা ও ফিটনেস নিয়ে মানুষের আগ্রহ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ইউটিউব কিংবা জিম সংস্কৃতির প্রভাবে অনেকেই মনে করছেন, সুস্থ থাকতে হলে যত বেশি প্রোটিন খাওয়া যায় ততই ভালো। ফলে ডিমের সাদা অংশ, প্রোটিন শেক, সাপ্লিমেন্ট, মুরগির বুকের মাংস—এসব যেন প্রতিদিনের খাদ্যতালিকার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, শরীরের জন্য কি সত্যিই প্রতিদিন এত বিপুল পরিমাণ প্রোটিন প্রয়োজন? পুষ্টিবিদরা বলছেন, না। বরং বয়স, ওজন ও শারীরিক অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য না রেখে অতিরিক্ত প্রোটিন গ্রহণ করলে উপকারের চেয়ে ক্ষতির আশঙ্কাই বেশি।

প্রোটিন মানবদেহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পুষ্টি উপাদান। পেশি গঠন, কোষ মেরামত, হরমোন ও এনজাইম তৈরিসহ শরীরের নানা জৈবিক প্রক্রিয়ায় প্রোটিন অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে। তবে এই প্রয়োজন সবার জন্য একরকম নয়। বয়সভেদে শরীরের গঠন, কাজের ধরন ও বিপাকীয় চাহিদা পরিবর্তিত হয়। ফলে প্রোটিনের পরিমাণও বয়স অনুযায়ী ভিন্ন হওয়াই স্বাভাবিক।

পুষ্টিবিদদের মতে, একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দৈনিক প্রোটিনের সাধারণ হিসাব করা হয় শরীরের ওজন অনুযায়ী। প্রতি কেজি ওজনের জন্য গড়ে ০.৮ গ্রাম প্রোটিন যথেষ্ট বলে ধরা হয়। অর্থাৎ কারও ওজন যদি ৭০ কেজি হয়, তবে তার দৈনিক প্রোটিনের চাহিদা প্রায় ৫৫ থেকে ৫৬ গ্রাম। অথচ অনেক মানুষ ফিটনেসের নামে এর দ্বিগুণ বা তারও বেশি প্রোটিন গ্রহণ করছেন। দীর্ঘদিন এমন অভ্যাস চলতে থাকলে কিডনি ও লিভারের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে, যা ভবিষ্যতে জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

শিশুদের ক্ষেত্রে প্রোটিনের ভূমিকা আরও সংবেদনশীল। শিশুকালেই শরীরের ভিত্তি তৈরি হয়। চার থেকে আট বছর বয়সী শিশুদের দৈনিক প্রোটিনের প্রয়োজন গড়ে ২০ থেকে ২৫ গ্রাম। এই সময় পর্যাপ্ত প্রোটিন না পেলে শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। নয় থেকে তেরো বছর বয়সে শিশুরা দ্রুত মানসিক ও শারীরিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়। এ সময় দৈনিক প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ গ্রাম প্রোটিন প্রয়োজন হয়। ডিম, দুধ, মাছ, ডাল ও শাকসবজি এই বয়সের জন্য নিরাপদ ও উপকারী প্রোটিনের উৎস।

কিশোর বয়সে শরীরের বৃদ্ধি সবচেয়ে দ্রুত ঘটে। চৌদ্দ থেকে আঠারো বছর বয়সে ছেলেদের দৈনিক প্রোটিনের চাহিদা প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ গ্রাম এবং মেয়েদের ক্ষেত্রে ৪৫ থেকে ৫০ গ্রাম। এই সময় সঠিক পরিমাণ প্রোটিন না পেলে উচ্চতা বৃদ্ধি, পেশি গঠন ও হরমোনের স্বাভাবিক বিকাশে সমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে এখানেও মনে রাখতে হবে, অতিরিক্ত প্রোটিন নয়, বরং সুষম খাদ্যই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ থেকে পঞ্চাশ বছর বয়স পর্যন্ত সময়টিকে কর্মজীবনের সবচেয়ে ব্যস্ত ও সক্রিয় সময় বলা যায়। এ বয়সে মানুষ শারীরিক ও মানসিকভাবে বেশি পরিশ্রম করে। পুরুষদের দৈনিক প্রোটিনের প্রয়োজন গড়ে ৫৫ থেকে ৬০ গ্রাম এবং নারীদের ক্ষেত্রে ৪৫ থেকে ৫০ গ্রাম যথেষ্ট। যারা নিয়মিত ভারী ব্যায়াম করেন বা শারীরিক শ্রমে যুক্ত, তাদের ক্ষেত্রে এই চাহিদা সামান্য বাড়তে পারে। তবে সেটিও চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী হওয়া উচিত।

গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী মায়েদের প্রোটিনের চাহিদা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি। কারণ এই সময় শুধু নিজের শরীর নয়, অনাগত শিশু বা নবজাতকের পুষ্টির ভারও মায়ের ওপর থাকে। পর্যাপ্ত প্রোটিন না পেলে মা যেমন দুর্বল হয়ে পড়েন, তেমনি শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে। তাই এই সময় নিরাপদ উৎস থেকে বাড়তি প্রোটিন গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি।

ষাট বছরের পর শরীরে স্বাভাবিকভাবেই পেশি ক্ষয় শুরু হয়, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় সারকোপেনিয়া বলা হয়। এই বয়সে প্রোটিন কম হলে দুর্বলতা, হাড় ভাঙার ঝুঁকি ও চলাফেরায় সমস্যা বাড়ে। পুষ্টিবিদদের মতে, বয়স্কদের ক্ষেত্রে শরীরের প্রতি কেজি ওজন অনুযায়ী এক থেকে ১.২ গ্রাম প্রোটিন প্রয়োজন হতে পারে। তবে যাদের কিডনি সমস্যা আছে, তাদের ক্ষেত্রে এই হিসাব আলাদা হতে পারে এবং অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

প্রোটিনের উৎস নির্বাচনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডিম, মাছ, মুরগির মাংস, দুধ, দই, পনিরের মতো প্রাণিজ প্রোটিন যেমন উপকারী, তেমনি ডাল, ছোলা, সয়াবিন, বাদাম ও বিভিন্ন বীজ উদ্ভিজ্জ প্রোটিনের ভালো উৎস। প্রাণিজ ও উদ্ভিজ্জ প্রোটিনের সমন্বয় করলে শরীর প্রয়োজনীয় অ্যামিনো অ্যাসিড সহজে পায়।

বর্তমানে অনেকেই সাপ্লিমেন্টের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন। অথচ স্বাভাবিক খাবার থেকেই বেশির ভাগ মানুষের প্রোটিনের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘদিন প্রোটিন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করলে কিডনি, লিভার ও হজমজনিত সমস্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেশি প্রোটিন মানেই বেশি সুস্থতা—এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল।

সুস্থ থাকার মূল চাবিকাঠি হলো বয়স, ওজন ও শারীরিক অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সুষম খাদ্য গ্রহণ। প্রোটিন অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু তার সঙ্গে শর্করা, চর্বি, ভিটামিন ও খনিজ উপাদানের ভারসাম্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নিজের শরীরের প্রয়োজন বুঝে সচেতনভাবে খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুললেই দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ থাকা সম্ভব।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত