প্রকাশ: ১১ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত আলোচিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রীর আইসিটি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় ও সাবেক তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলকের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের বিষয়ে আজ শুনানি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ অনুষ্ঠিতব্য এই শুনানিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গন, আইনজীবী মহল ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ ও আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। মামলাটিকে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ বিচারিক প্রক্রিয়াগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
রোববার (১১ জানুয়ারি) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে এ শুনানি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এদিন প্রথমে রাষ্ট্রপক্ষ তথা প্রসিকিউশন অভিযোগ গঠনের পক্ষে তাদের যুক্তি ও উপস্থাপনা তুলে ধরবে। এরপর আসামিপক্ষের বক্তব্য শোনার জন্য সময় দেবেন ট্রাইব্যুনাল। শুনানির এ ধাপটি মামলার ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, এর আগে গত ৭ জানুয়ারি সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলকের আইনজীবী লিটন আহমেদ অভিযোগ গঠনের শুনানির জন্য প্রস্তুতির সময় চেয়ে ১৪ জানুয়ারি পর্যন্ত সময় আবেদন করেন। অপরদিকে, পলাতক আসামি হিসেবে চিহ্নিত সজীব ওয়াজেদ জয়ের পক্ষে রাষ্ট্রের খরচে নিয়োগ পাওয়া স্টেট ডিফেন্স আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন অ্যাডভোকেট মনজুর আলম। আইন অনুযায়ী, কোনো আসামি পলাতক থাকলেও তার পক্ষে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া হয়।
এই মামলায় এর আগে নির্ধারিত দিনে শুনানি হওয়ার কথা থাকলেও কিছু প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতার কারণে তা পিছিয়ে যায়। গত ১৭ ডিসেম্বর আদালত রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী নিয়োগের আদেশ দিলেও সংশ্লিষ্ট চিঠি যথাসময়ে ইস্যু না হওয়ায় শুনানি কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়নি। ফলে ট্রাইব্যুনাল আজকের দিনটি নতুন করে ধার্য করেন। এরই ধারাবাহিকতায় আজ প্রসিকিউশন পক্ষ তাদের শুনানি শুরু করতে যাচ্ছে।
মামলার পটভূমি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় সংঘটিত সহিংসতা ও প্রাণহানির ঘটনাগুলোকে কেন্দ্র করে এই মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা দায়ের করা হয়। অভিযোগে বলা হয়েছে, ওই সময় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ এবং ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে গণহত্যা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের তথ্য গোপন করার চেষ্টা করা হয়। এ পরিকল্পনার নেপথ্য কারিগর হিসেবে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর পুত্র ও তৎকালীন আইসিটি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বসে জয় ইন্টারনেট বন্ধের কৌশলগত সিদ্ধান্তে ভূমিকা রাখেন। অন্যদিকে, মাঠপর্যায়ে ও প্রশাসনিকভাবে এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করেন তৎকালীন আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক। ইন্টারনেট ও যোগাযোগব্যবস্থা বন্ধ থাকার ফলে সহিংসতার প্রকৃত চিত্র দেশ-বিদেশে পৌঁছাতে বিলম্ব হয় এবং এতে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের পথ আরও সুগম হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর আগে গত ৪ ডিসেম্বর প্রসিকিউশনের দাখিল করা ফরমাল চার্জ বা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এরপর ১০ ডিসেম্বর ট্রাইব্যুনাল সজীব ওয়াজেদ জয়কে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিয়ে দুটি জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আদেশ দেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তিনি আত্মসমর্পণ না করায় তাকে পলাতক আসামি হিসেবে বিবেচনা করে বিচার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মামলার শুনানি শুধু ব্যক্তিবিশেষের বিচার নয়, বরং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার, নাগরিক অধিকার হরণ এবং তথ্যপ্রযুক্তিকে দমনমূলক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগের বিচার হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কাঠামো ও বিচারিক ক্ষমতা অনুযায়ী, অভিযোগ গঠনের পর্যায়ে আদালত নিশ্চিত করবেন যে মামলায় উত্থাপিত অভিযোগগুলো বিচারযোগ্য কি না এবং প্রাথমিকভাবে অপরাধ সংঘটনের উপাদান রয়েছে কি না।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা আশা প্রকাশ করেছেন, আজকের শুনানিতে তারা পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত, সাক্ষ্যপ্রমাণ ও আইনি যুক্তির মাধ্যমে অভিযোগ গঠনের যৌক্তিকতা প্রমাণ করতে সক্ষম হবেন। অপরদিকে, আসামিপক্ষ অভিযোগগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং আইনি ভিত্তিহীন দাবি করে তা খারিজের আবেদন জানাতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই মামলাকে কেন্দ্র করে জনমনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। একাংশ মনে করছে, মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দায়ীদের বিচার নিশ্চিত করা দেশের আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের জন্য অপরিহার্য। অন্যদিকে, কেউ কেউ আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, বিচার প্রক্রিয়া যেন রাজনৈতিক প্রতিহিংসার রূপ না নেয়। এ কারণে ট্রাইব্যুনালের নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছতা ও পেশাদারিত্বের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
সব মিলিয়ে, সজীব ওয়াজেদ জয় ও জুনায়েদ আহমেদ পলকের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের শুনানি দেশের বিচারিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আজকের শুনানির মাধ্যমে মামলাটি নতুন ধাপে প্রবেশ করবে, যা ভবিষ্যতে বিচার কার্যক্রমের গতি ও দিকনির্দেশনা নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে। দেশের মানুষ এখন তাকিয়ে আছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দিকে, যেখানে আইনের আলোকে সত্য উদঘাটন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা সবার।