সঠিক সময়ে রাতের খাবার সুস্থ জীবনের চাবিকাঠি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ১১ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৬৩ বার
সঠিক সময়ে রাতের খাবার সুস্থ জীবনের চাবিকাঠি

প্রকাশ: ১১ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আধুনিক জীবনের ব্যস্ততায় অনেকেই খাবারের সময়ের প্রতি তেমন গুরুত্ব দেন না। কখনো অফিসের কাজ, কখনো পড়াশোনা, আবার কখনো সামাজিক ব্যস্ততার কারণে রাতের খাবার দেরিতে খাওয়ার প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। অথচ পুষ্টিবিদ ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বারবার বলে আসছেন, শরীরের জন্য শুধু কী খাচ্ছেন সেটাই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং কখন খাচ্ছেন সেটাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে রাতের খাবারের সময় ঠিক না হলে তার প্রভাব পড়ে হজমশক্তি, ঘুম, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপর।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রাতের খাবার শরীরের স্বাভাবিক জৈবঘড়ির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। আমাদের শরীর দিনের আলো-আঁধারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে হরমোন নিঃসরণ, হজমপ্রক্রিয়া ও মেটাবলিজম পরিচালনা করে। সন্ধ্যার পর ধীরে ধীরে শরীর বিশ্রামের প্রস্তুতি নেয়। এই সময় ভারী বা দেরিতে খাবার খেলে শরীর ঠিকভাবে তা হজম করতে পারে না। ফলে বদহজম, এসিডিটি, গ্যাস, বুকজ্বালার মতো সমস্যা দেখা দেয়, যা দীর্ঘদিন চলতে থাকলে গ্যাস্ট্রিক ও অন্যান্য জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।

রাতের খাবার সঠিক সময়ে খাওয়ার একটি বড় উপকার হলো খাবার সহজে হজম হওয়া। সাধারণত সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ৮টার মধ্যে রাতের খাবার খেলে শরীর তা ভালোভাবে ভাঙতে ও শোষণ করতে পারে। কারণ এই সময় হজমের জন্য প্রয়োজনীয় এনজাইম ও অ্যাসিড শরীরে সক্রিয় থাকে। কিন্তু রাত ৯টা বা ১০টার পর ভারী খাবার খেলে সেই খাবার হজম হতে সময় বেশি লাগে এবং পাকস্থলীতে চাপ পড়ে। এর ফলে পরদিন সকালে অস্বস্তি, বমি বমি ভাব কিংবা গ্যাসের সমস্যা দেখা দিতে পারে।

ঘুমের মান ভালো রাখার ক্ষেত্রেও রাতের খাবারের সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেরিতে বা অতিরিক্ত খাবার খেয়ে শুয়ে পড়লে শরীর বিশ্রাম নিতে পারে না। তখন পাকস্থলী সারারাত কাজ করতে থাকে, যার প্রভাব পড়ে ঘুমের ওপর। অনেকেই রাতে ঘনঘন ঘুম ভেঙে যাওয়ার বা গভীর ঘুম না হওয়ার অভিযোগ করেন, যার একটি বড় কারণ হলো অনিয়মিত বা দেরিতে রাতের খাবার। অপরদিকে, নির্দিষ্ট সময়ে হালকা খাবার খেলে শরীর দ্রুত হজম শেষ করে বিশ্রামে যেতে পারে, ফলে ঘুম হয় গভীর ও আরামদায়ক।

ওজন নিয়ন্ত্রণের সঙ্গেও রাতের খাবারের সময় সরাসরি জড়িত। অনেকক্ষণ না খেয়ে হঠাৎ করে রাতের বেলায় বেশি খাবার খেলে শরীর সেই অতিরিক্ত ক্যালোরি সহজে খরচ করতে পারে না। তখন শরীর তা চর্বি হিসেবে জমা করতে শুরু করে। বিশেষ করে পেট ও কোমরের চারপাশে মেদ জমার প্রবণতা বাড়ে। নিয়মিত দেরিতে রাতের খাবার খাওয়ার অভ্যাস থাকলে ধীরে ধীরে ওজন বাড়তে থাকে, যা পরবর্তীতে স্থূলতা ও হৃদরোগের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য রাতের খাবারের সময় আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দেরিতে খাবার খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে, যা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে বাধা সৃষ্টি করে। নির্দিষ্ট সময়ে এবং হালকা খাবার খেলে ইনসুলিনের কার্যকারিতা ভালো থাকে এবং ব্লাড সুগার তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত থাকে। তাই চিকিৎসকরাও ডায়াবেটিস রোগীদের রাতের খাবারের সময় ও পরিমাণ নিয়ে বিশেষভাবে সচেতন থাকতে পরামর্শ দেন।

রাতের খাবার কেমন হওয়া উচিত, সেটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। বিশেষজ্ঞরা বলেন, রাতের খাবার যতটা সম্ভব হালকা ও সহজপাচ্য হওয়া উচিত। অতিরিক্ত তেল-মসলা, ভাজাভুজি, ফাস্টফুড বা খুব ঝাল খাবার রাতে এড়িয়ে চলাই ভালো। এসব খাবার হজমে সময় নেয় এবং পাকস্থলীতে জ্বালাপোড়া তৈরি করে। পরিবর্তে ভাতের পরিমাণ কম রেখে শাকসবজি, ডাল, মাছ বা হালকা প্রোটিনজাতীয় খাবার রাখা যেতে পারে। এতে শরীর প্রয়োজনীয় পুষ্টি পায়, আবার হজমেও সমস্যা হয় না।

রাতের খাবার শেষ করার পর সঙ্গে সঙ্গে শুয়ে পড়াও স্বাস্থ্যসম্মত নয়। খাবার খাওয়ার পর অন্তত এক ঘণ্টা স্বাভাবিকভাবে বসে বা হালকা কাজ করে সময় কাটানো উচিত। এতে খাবার পাকস্থলী থেকে ধীরে ধীরে অন্ত্রে যেতে সাহায্য করে। এরপর ১৫ থেকে ২০ মিনিট হালকা হাঁটা করলে হজম প্রক্রিয়া আরও ভালো হয়। এই অভ্যাস নিয়মিত করলে গ্যাস, কোষ্ঠকাঠিন্য এবং পেট ফাঁপার সমস্যা অনেকটাই কমে যায়।

অনেকেই ভাবেন, রাতে না খেলে বা খুব দেরিতে খেলে ওজন কমবে। বাস্তবে বিষয়টি উল্টো। দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকলে শরীর নিজেকে ‘ক্ষুধার্ত অবস্থায়’ ধরে নেয় এবং পরবর্তী খাবারে বেশি ক্যালোরি জমিয়ে রাখার চেষ্টা করে। তাই নির্দিষ্ট সময়ে পরিমিত খাবার খাওয়াই ওজন নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সুস্থ জীবনযাপনের জন্য প্রতিদিন একই সময়ে রাতের খাবার খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। এতে শরীর একটি নিয়মের মধ্যে চলে আসে এবং হজম, ঘুম ও শক্তির ভারসাম্য বজায় থাকে। কর্মজীবী মানুষ বা শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে শুরুতে এটি কঠিন মনে হলেও ধীরে ধীরে সময় ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই অভ্যাস গড়ে তোলা সম্ভব।

সব মিলিয়ে বলা যায়, রাতের খাবারের সময় শুধু একটি দৈনন্দিন রুটিন নয়, এটি সুস্থ থাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। সঠিক সময়ে, হালকা ও পরিমিত খাবার খেলে হজম ভালো থাকে, ঘুম হয় শান্ত, ওজন থাকে নিয়ন্ত্রণে এবং দীর্ঘমেয়াদে নানা রোগের ঝুঁকি কমে। তাই আজ থেকেই রাতের খাবার দেরি না করে নির্দিষ্ট সময়ে সেরে নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুললে শরীর ও মন—দু’টিই থাকবে সুস্থ ও সতেজ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত