কাস্টমস জটিলতায় নাকাল বাণিজ্য, বাড়ছে সময় ও ব্যয়ের বোঝা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৬ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫৪ বার
কাস্টমস জটিলতায় নাকাল বাণিজ্য, বাড়ছে সময় ও ব্যয়ের বোঝা

প্রকাশ: ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের আমদানি–রপ্তানি বাণিজ্যে কাস্টমস প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ধরেই একটি বড় বাধা হিসেবে বিবেচিত। শুল্কায়ন জটিলতা, মূল্যায়ন নিয়ে দ্বন্দ্ব, এইচএস কোড নির্ধারণের অস্পষ্টতা এবং অতিরিক্ত কাগজপত্রের চাপে ব্যবসায়ীরা প্রতিনিয়ত সময় ও অর্থ—দুটোই হারাচ্ছেন। আন্তর্জাতিক কাস্টমস দিবস সামনে রেখে এই ভোগান্তি থেকে মুক্তি চান দেশের ব্যবসায়ী সমাজ। তাদের মতে, বর্তমান কাস্টমস ব্যবস্থা শুধু ব্যবসা পরিচালনাকে কঠিন করে তুলছে না, বরং উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকেও দুর্বল করছে।

বন্ড সুবিধার বাইরে থাকা প্রায় সব ধরনের আমদানি পণ্যের ক্ষেত্রেই ব্যবসায়ীদের উচ্চ শুল্ক, ভ্যাট ও অন্যান্য কর পরিশোধ করতে হয়। কাগজে-কলমে শুল্ক কাঠামো স্পষ্ট থাকলেও বাস্তবে পণ্যের শ্রেণিবিন্যাস, এইচএস কোড ও মূল্য নির্ধারণ নিয়ে প্রায়ই জটিলতার মুখে পড়তে হয়। ফলে একদিকে যেমন পণ্য খালাসে সময় বাড়ে, অন্যদিকে বাড়ে ডেমারেজ, স্টোরেজ চার্জ ও উৎপাদন বিলম্বের খরচ। এসব খরচ শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই চাপিয়ে দিতে বাধ্য হন ব্যবসায়ীরা।

স্প্যারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম মনে করেন, কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সে সময় নষ্ট হওয়াই বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। তিনি বলেন, আমাদের যে পরিমাণ লিড টাইম নষ্ট হয়, সেটি পৃথিবীর কোনো প্রতিযোগী দেশ তো নয়ই, এমনকি প্রতিবেশী পাকিস্তানেও কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সের জন্য এত সময় লাগে না। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে সময়ই সবচেয়ে বড় শক্তি, কিন্তু এখানে সেটিই সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, জাহাজ থেকে পণ্য নামার পর স্বাভাবিকভাবে তিন দিনের মধ্যে তা ফ্যাক্টরিতে পৌঁছানোর কথা থাকলেও কাস্টমস টেস্টিংয়ে পাঠালে ৭ থেকে ১৫ দিন পর্যন্ত সময় লেগে যায়। এই সময়ের মধ্যে উৎপাদন বন্ধ থাকে, শ্রমিক বসে থাকে, আর বিদেশি ক্রেতার কাছে প্রতিশ্রুত সময়সীমা রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে। শোভন ইসলাম স্পষ্ট করে বলেন, সম্পূর্ণ অটোমেশনে না গেলে এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য একটি বড় ডিসঅ্যাডভান্টেজ হয়ে থাকবে।

এমন বাস্তবতায়ও রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে হিমশিম খাচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে শুল্ক, ভ্যাট ও আয়কর—এই তিন খাত মিলিয়েও নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি সংস্থাটি। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসেই লক্ষ্যমাত্রা থেকে প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা পিছিয়ে রয়েছে এনবিআর। এর মধ্যে কাস্টমস খাতে আদায় ঘাটতি প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘসূত্রতা ও অনিয়ম শুধু ব্যবসায়ীদের ক্ষতিগ্রস্ত করছে না, রাজস্ব আদায়েও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, আমদানি পণ্যের মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় অনেক সময় বাস্তব দামের চেয়ে বেশি মূল্য নির্ধারণ করা হয়, যার ফলে অতিরিক্ত শুল্ক দিতে বাধ্য হন তারা। কেউ আপত্তি জানালে ফাইল আটকে থাকে, পরীক্ষার নামে সময় বাড়ে, আর এতে কাঁচামাল হাতে পেতে বিলম্ব হয়। এই বিলম্ব শিল্প উৎপাদনের পুরো চেইনকে প্রভাবিত করে।

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির পরিচালক রশিদ আহমেদ হোসইনী বলেন, অনেক সময় কর্মকর্তারা ব্যক্তিগত কারণে অফিসে না থাকলেও পণ্য আটকে যায়। এতে ডেমারেজ তৈরি হয়, যার দায় ব্যবসায়ীদেরই নিতে হয়। তিনি আরও বলেন, এই ধীরগতি ইচ্ছাকৃত হোক বা অনিচ্ছাকৃত—উভয় ক্ষেত্রেই ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। বাস্তবতায় অনেক সময় আন্ডারহ্যান্ড ডিল বা তথাকথিত ‘স্পিড মানি’ দিতে বাধ্য হন তারা। টাকা দিলে কাজ দ্রুত শুরু হয়, না দিলে ফাইল পড়ে থাকে। এটি একটি ওপেন সিক্রেট।

নিটওয়্যার খাতের উদ্যোক্তারাও একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা বলছেন। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান মনে করেন, কাস্টমস ব্যবস্থায় অটোমেশনই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর সমাধান। তার মতে, এমন একটি সিস্টেম দরকার, যেখানে মানবিক হস্তক্ষেপ কমবে এবং সবাইকে নিয়ম মেনে চলতে বাধ্য করবে। অটোমেশনের মাধ্যমে যদি প্রক্রিয়া স্বচ্ছ হয়, তাহলে দুর্নীতির সুযোগ অনেকটাই কমে যাবে।

তবে এনবিআর এই জটিলতার পেছনে কেবল কর্মকর্তাদের নয়, অসাধু ব্যবসায়ীদেরও দায়ী করছে। সংস্থাটির দাবি, আন্ডার ইনভয়েসিং, ওভার ইনভয়েসিং, মানিলন্ডারিং ও চোরাচালান ঠেকাতে গিয়ে অনেক সময় কঠোর হতে হয়। এনবিআর চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খান বলেন, সফটওয়্যারভিত্তিক ব্যবস্থার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। রিস্ক ম্যানেজমেন্ট ও পোস্ট ক্লিয়ারেন্স অডিট চালু হলে দ্রুত মালামাল খালাস সম্ভব হবে। তিনি জানান, কোন পণ্য নিষিদ্ধ কি না তা যাচাই করতে গিয়ে সময় নষ্ট হয়, এই সময় কমানোর চেষ্টাও চলছে।

বিশ্লেষকরা অবশ্য মনে করেন, কেবল অটোমেশন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের চেয়ারম্যান ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, শুল্কায়ন জটিলতার বোঝা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ঘাড়েই গিয়ে পড়ে। দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ভালো করতে হলে প্রত্যক্ষ করের দিকে নজর দিতে হবে, করের ভিত্তি বাড়াতে হবে এবং সর্বোপরি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। তার মতে, ব্যবসায়ীদের সমস্যার সমাধান এমনভাবে করতে হবে, যাতে তা ট্রান্সপারেন্ট ও ন্যায্য হয়।

আয়কর বিশ্লেষক মো. আলিমুজ্জামান মনে করেন, মানিলন্ডারিংয়ের ক্ষেত্রে আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের চেয়ে ওভার ইনভয়েসিং আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। তিনি বলেন, কাস্টমস সিস্টেম এমন হওয়া উচিত, যা ব্যবসায়ীদের সৎ হতে উৎসাহিত করবে। অটোমেশন যাই হোক না কেন, ইনপুট যদি ভুল হয়, তাহলে আউটপুটও সঠিক হবে না। তাই গোড়া থেকেই তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।

সব মিলিয়ে, কাস্টমস জটিলতা আজ আর কেবল একটি প্রশাসনিক সমস্যা নয়; এটি দেশের ব্যবসা পরিবেশ, বিনিয়োগ আস্থা এবং ভোক্তা স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ব্যবসাবান্ধব নীতি বাস্তবায়নের নামে যদি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আরও বাড়ে, তাহলে তার সুফল পাওয়া কঠিন হবে। আন্তর্জাতিক কাস্টমস দিবসের প্রাক্কালে তাই ব্যবসায়ী, নীতিনির্ধারক ও প্রশাসনের মধ্যে একটি বাস্তবভিত্তিক সমন্বয় এখন সময়ের দাবি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত