প্রকাশ: ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
চট্টগ্রাম বন্দরের অচলাবস্থা দেশের পুঁজিবাজার এবং রপ্তানি খাতের জন্য গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। ঢাকার ট্যাড সোর্সিং লিমিটেড নামের বায়িং হাউসের ১২০ কনটেইনার তৈরি পোশাক বন্দরে আটকে আছে। বন্দরের কর্মচারীদের গত সপ্তাহের কর্মবিরতির কারণে এসব পণ্য জাহাজে ওঠেনি। ফলে নির্ধারিত বড় জাহাজ বা মাদার ভেসেল ধরতে পারেনি এই বিপুল পরিমাণ পণ্য। ট্যাড সোর্সিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আশিকুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, “চট্টগ্রাম বন্দরে আটকে থাকা কনটেইনারে জার্মানির দুটি ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের তৈরি পোশাক রয়েছে। দু–এক দিনের মধ্যে পরিস্থিতি ঠিক না হলে আমাদের ব্যবসায় বড় ধরনের ক্ষতি হবে। ক্রেতারা ইতিমধ্যে উদ্বিগ্ন হয়ে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন।”
ট্যাড সোর্সিংয়ের মতো অসংখ্য পণ্য আমদানি-রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানই চট্টগ্রাম বন্দরের এই অচলাবস্থায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেকের রপ্তানি পণ্য বন্দরে আটকে রয়েছে, আবার আমদানি পণ্য বা কাঁচামালও খালাস হচ্ছে না। এতে কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। ব্যবসায়ীরা সতর্ক করেছেন যে, দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে পণ্য রপ্তানি মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হবে।
চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে কর্মবিরতি চলছিল, যা প্রতিবাদ হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ডিপিওয়ার্ল্ডের কাছে বন্দর ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিপক্ষে শুরু হয়। গত শনিবার থেকে তিন দিন আট ঘণ্টা করে কর্মবিরতি পালনের পর মঙ্গলবার থেকে আন্দোলনকারীরা লাগাতার কর্মবিরতি শুরু করেন, যার ফলে বন্দর কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। তবে গতকাল বিকেলে নৌপরিবহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে বৈঠকের পর দুই দিনের জন্য কর্মসূচি স্থগিতের ঘোষণা দেন সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক মো. হুমায়ুন কবীর।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের হিসাবে দেশের মোট রপ্তানির ৯১ শতাংশই চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। অথচ পাঁচ দিন ধরে বন্দরের কার্যক্রম ব্যাহত হলেও সরকারের দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা যায়নি। আন্দোলনকারীরা বৈঠকে চার দফা দাবি তুলে ধরেন এবং দাবি বাস্তবায়িত না হলে আবার কর্মবিরতির হুমকি দেন।
কনটেইনার ডিপো সমিতির তথ্য অনুযায়ী, আন্দোলন শুরুর আগে ১৯টি বেসরকারি ডিপোতে রপ্তানির জন্য আট হাজার কনটেইনার অপেক্ষমাণ ছিল, যা কর্মসূচি স্থগিতের আগ পর্যন্ত সাড়ে ১১ হাজারে বৃদ্ধি পায়। বেসরকারি কনটেইনার ডিপো সমিতির মহাসচিব রুহুল আমিন সিকদার জানান, কর্মসূচি স্থগিতের পর বিকেল সাড়ে পাঁচটা থেকে রপ্তানি কনটেইনার বন্দরে নেওয়া শুরু হয়। তবে নতুন করে কর্মবিরতি না হলেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে কয়েক দিন সময় লাগবে।
চট্টগ্রাম বন্দরের অচলাবস্থার কারণে দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্প প্রতিষ্ঠান প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের ৮০০ শতাধিক কনটেইনারে কাঁচামাল আটকে আছে। এতে প্লাস্টিক, ইলেকট্রনিকসহ বিভিন্ন পণ্যের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিপুল পরিমাণ খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত পণ্যও রপ্তানির জন্য অপেক্ষমাণ। প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল বলেন, “বন্দরে কাঁচামাল আটকে থাকায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিদেশি ক্রেতারা সময়মতো পণ্য না পেলে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানাতে পারেন। আমরা দ্রুত সমস্যার সমাধান চাই।”
সাভারের এন আর ক্রিয়েশনসের তিন লাখ মার্কিন ডলার সমমূল্যের পাঁচ ট্রাক তৈরি পোশাক দুই দিন অপেক্ষার পর চট্টগ্রামের বেসরকারি ডিপোতে হস্তান্তর করা সম্ভব হয়েছে। তবে বন্দরের অচলাবস্থার কারণে পণ্য জাহাজে ওঠেনি। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এলকাস মিয়া জানান, ক্রয়াদেশ ইতিমধ্যেই কম, তবে বন্দরের অচলাবস্থার কারণে যে ক্ষতি হবে তা ভয়াবহ। ইতিমধ্যে ডিপোর বাইরে দুই দিন দাঁড়িয়ে থাকায় ২০-২৫ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ গুনতে হয়েছে।
তৈরি পোশাক শিল্পের অন্য প্রতিষ্ঠান স্প্যারো গ্রুপের দেড় লাখ তৈরি পোশাক বন্দরে আটকে আছে। ফেব্রুয়ারির মধ্যে আরও ৯ লাখ এবং ১৪ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ১৪ লাখ তৈরি পোশাক বন্দরে পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এসব পণ্য মূলত যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রপ্তানি করা হবে। স্প্যারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম বলেন, “ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চের মাঝামাঝি সময় গ্রীষ্মের মৌসুমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। রপ্তানি যাতে বাধাগ্রস্ত না হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।”
চট্টগ্রাম বন্দরের অচলাবস্থার কারণে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে দেশের ১০ ব্যবসায়ী সংগঠন। বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশন, মেট্রো চেম্বার, ঢাকা চেম্বার, বিসিআই, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বিটিএমএ, বিজিবিএ, বিজিএপিএমইএ ও বিটিটিএলএমইএ যৌথভাবে বলেছেন, দেশের বৃহত্তর স্বার্থ ও অর্থনীতির জন্য বিষয়টি দ্রুত সমাধান করা জরুরি। সংগঠনগুলো আন্দোলনরত শ্রমিক ইউনিয়নের উদ্দেশে জানিয়েছেন, “আপনারা দাবিদাওয়া সরকারের কাছে পৌঁছে দেওয়ার অধিকার রাখেন, তবে জাহাজ চলাচল বন্ধ করা মানে দেশের অর্থনীতিকেই ক্ষতি করা। আমরা আহ্বান জানাই, দেশের স্বার্থে এই অবস্থান থেকে সরে আসুন।”
চট্টগ্রাম বন্দরের এই অচলাবস্থা কেবল রপ্তানি পণ্য নয়, শিল্প উৎপাদন, ক্রয়াদেশ ও আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা বাড়িয়েছে। ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন, দ্রুত কার্যক্রম স্বাভাবিক না হলে দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়বে। অর্থনৈতিক ঘূর্ণচক্র সচল রাখতে এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের প্রতি দেশের নৈতিক ও পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে এই সমস্যার দ্রুত সমাধান এখন সময়ের দাবি।