আইএমএফ ঋণের কিস্তি ছাড়ে আশাবাদী অর্থমন্ত্রী

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৬ বার
আইএমএফ ঋণের কিস্তি ছাড়ে আশাবাদী অর্থমন্ত্রী

প্রকাশ: ১৮ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে ঋণের পরবর্তী কিস্তি ছাড় নিয়ে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তার মধ্যেও আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন দেশের অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে আইএমএফ সদর দফতরে ধারাবাহিক বৈঠকের পর তিনি জানিয়েছেন, কিছু শর্ত পূরণে বাংলাদেশ পিছিয়ে থাকলেও দ্রুত সময়ের মধ্যে সেসব সমাধান করা সম্ভব হবে এবং আগামী ১৫ দিনের মধ্যেই অগ্রগতি দৃশ্যমান হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

শুক্রবার অনুষ্ঠিত বৈঠকে অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে বাংলাদেশ মিশনের প্রতিনিধিরা আইএমএফের দুইটি পৃথক টিমের সঙ্গে আলোচনা করেন। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে অর্থমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, গণমাধ্যমে যে ধরনের খবর প্রকাশিত হয়েছে—যেখানে বলা হচ্ছে আইএমএফ ঋণের কিস্তি স্থগিত করেছে—তা পুরোপুরি সঠিক নয়। বরং এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া, যেখানে নির্দিষ্ট কিছু সংস্কার ও শর্ত পূরণে অগ্রগতির ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তী অর্থ ছাড়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

বাংলাদেশ বর্তমানে আইএমএফের একটি বড় ঋণ কর্মসূচির আওতায় রয়েছে, যার মোট পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই কর্মসূচির অধীনে ইতোমধ্যে কয়েকটি কিস্তি ছাড় হয়েছে, তবে এখনো উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ বাকি রয়েছে। বিশেষ করে চলতি অর্থবছরের জুনের মধ্যে প্রায় ১.৩ বিলিয়ন ডলার পাওয়ার প্রত্যাশা করছে সরকার। কিন্তু সেই অর্থ ছাড়ের ক্ষেত্রে কিছু শর্ত পূরণ না হওয়ায় সাময়িক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ব্যাংক খাতের সংস্কারে ধীরগতি, নতুন ব্যাংক রেগুলেশন আইন প্রণয়নে বিলম্ব এবং রাজস্ব আদায়ে প্রত্যাশিত অগ্রগতি না হওয়াই মূলত আইএমএফের উদ্বেগের কারণ। এই বিষয়গুলো আইএমএফের নির্ধারিত সংস্কার কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে এগুলোর বাস্তবায়নে পিছিয়ে পড়া ঋণের কিস্তি ছাড়ে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

তবে অর্থমন্ত্রী এই বিষয়ে আশ্বস্ত করে বলেন, সরকার ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে এবং সংশ্লিষ্ট খাতগুলোতে দ্রুত অগ্রগতি অর্জনের জন্য কাজ চলছে। তিনি উল্লেখ করেন, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, খেলাপি ঋণ কমানো এবং আর্থিক খাতকে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করার উদ্যোগ জোরদার করা হয়েছে। একই সঙ্গে রাজস্ব আহরণ বাড়াতে কর প্রশাসনে সংস্কার এবং ডিজিটালাইজেশনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

আইএমএফের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। সর্বশেষ বড় ঋণ চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয় ২০২৩ সালে, যখন তৎকালীন সরকার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপ মোকাবেলায় এই সহায়তা গ্রহণ করে। ওই চুক্তির আওতায় প্রথম কিস্তি হিসেবে প্রায় ৪৭ কোটি ডলার ছাড় হয় ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে। একই বছরের ডিসেম্বরে দ্বিতীয় কিস্তি এবং ২০২৪ সালের জুনে তৃতীয় কিস্তি পাওয়া যায়।

পরবর্তীতে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করলে আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা করে ঋণ কর্মসূচির মেয়াদ ছয় মাস বাড়ানো হয় এবং মোট ঋণের পরিমাণও বাড়ানো হয়। এর ফলে কর্মসূচির আকার দাঁড়ায় ৫.৫ বিলিয়ন ডলার। ২০২৫ সালের জুনে চতুর্থ ও পঞ্চম কিস্তি মিলিয়ে ১.৩৪ বিলিয়ন ডলার ছাড় করা হয়, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তবে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে নির্ধারিত আরেকটি কিস্তি ছাড় নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। আইএমএফ তখন নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা ছাড়া অর্থ ছাড় করতে অনাগ্রহ প্রকাশ করে। ফলে সেই কিস্তি আটকে যায়। পরবর্তীতে ডিসেম্বরের বকেয়া কিস্তি এবং চলতি বছরের জুনের কিস্তি একসঙ্গে ছাড়ের বিষয়ে আলোচনা চলছিল, যার মোট পরিমাণ প্রায় ১.৩ বিলিয়ন ডলার।

বর্তমান পরিস্থিতিতে অর্থমন্ত্রী আশাবাদী যে, চলমান আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত সমাধান পাওয়া যাবে। তিনি বলেন, “আমরা ইতিবাচক অবস্থানে আছি। আইএমএফের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক গঠনমূলক এবং তারা আমাদের পরিস্থিতি বুঝতে পারছে। কিছু কারিগরি বিষয় রয়েছে, যেগুলো সমাধান করতে একটু সময় লাগছে, তবে আমরা তা দ্রুত শেষ করতে পারবো।”

অর্থনীতিবিদদের মতে, আইএমএফের ঋণ শুধু অর্থের উৎস নয়, বরং এটি একটি নীতিগত কাঠামোও তৈরি করে, যা দেশের অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়ক হয়। তবে একই সঙ্গে এসব শর্ত বাস্তবায়ন অনেক সময় রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে ব্যাংক খাতে সংস্কার বা কর বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলোতে জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।

এদিকে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও এই আলোচনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, আমদানি ব্যয়, রপ্তানি আয় এবং প্রবাসী আয়ের প্রবাহ—সবকিছুই বর্তমানে অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সূচক। আইএমএফের ঋণের কিস্তি সময়মতো পাওয়া গেলে তা রিজার্ভে স্বস্তি আনবে এবং বৈদেশিক লেনদেনে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়ক হবে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, আইএমএফ ঋণের পরবর্তী কিস্তি ছাড় নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা থাকলেও সরকার সেটি দ্রুত কাটিয়ে ওঠার বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী। অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যে সেই আশাবাদই প্রতিফলিত হয়েছে। এখন দেখার বিষয়, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় সংস্কার কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায় এবং তার ভিত্তিতে আইএমএফ কী সিদ্ধান্ত নেয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত