সুস্থ থাকতে হাঁটার বিকল্প নেই: দৈনন্দিন অভ্যাস ও উপকারিতা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৫ জুন, ২০২৬
  • ৮১ বার
সুস্থ থাকতে হাঁটার বিকল্প নেই: দৈনন্দিন অভ্যাস ও উপকারিতা

প্রকাশ: ০৫ জুন  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আধুনিক সভ্যতার দ্রুতগতির জীবনে আমরা যখন প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি, তখন শরীরচর্চার বিষয়টি যেন আমাদের দৈনন্দিন রুটিন থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে। বিশ্বজুড়ে ডায়াবেটিস, স্থূলতা, উচ্চ রক্তচাপ এবং অকাল হৃদরোগের মতো ক্রনিক ব্যাধিগুলো মহামারীর আকার ধারণ করেছে। এমনকি খুব কম বয়সেই ফ্যাটি লিভার বা কোলেস্টেরলের মতো সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছেন আমাদের তরুণ প্রজন্ম। চিকিৎসকরা বারবার সতর্ক করছেন যে, আমাদের এই অলস ও অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনই এসব রোগের প্রধান কারণ। অথচ প্রকৃতির এক সহজ এবং কার্যকরী উপহার আমাদের হাতের কাছেই রয়ে গেছে, যার জন্য প্রয়োজন নেই কোনো দামি জিমের সদস্যপদ কিংবা ব্যয়বহুল ওষুধের। সেই জাদুর ওষুধটি হলো নিয়মিত হাঁটা। প্রতিদিনের ব্যস্ত জীবন থেকে মাত্র কয়েকটা মিনিট বের করে হাঁটার অভ্যাস গড়ে তুললে জটিল সব রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া কেবল সম্ভবই নয়, বরং তা আমাদের আয়ু ও গুণমান বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।

আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন স্বাস্থ্য গবেষণা সংস্থার মতে, দীর্ঘমেয়াদী সুস্থতার জন্য সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট হাঁটা অত্যন্ত জরুরি। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত হাঁটার অভ্যাস বজায় রাখেন, তাদের শারীরিক ও মানসিক অবস্থা অন্যদের চেয়ে অনেক বেশি সতেজ থাকে। প্রতিদিন মাত্র দশ মিনিট হাঁটা যে অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দিতে পারে, তা চিকিৎসাবিজ্ঞানের এক বিস্ময়কর সত্য। যখন আমরা হাঁটি, তখন আমাদের সারা শরীরে রক্ত সঞ্চালন সচল হয়। হৃৎপিণ্ড থেকে পাম্প করা রক্ত শরীরের প্রতিটি কোষে অক্সিজেন ও পুষ্টি পৌঁছে দেয়। এর ফলে বিপাক প্রক্রিয়া বা মেটাবলিজম উন্নত হয়, যা শরীরের বাড়তি ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে জাদুর মতো কাজ করে। স্থূলতা দূর করতে হাঁটার চেয়ে সহজ ও নিরাপদ ব্যায়াম আর নেই বললেই চলে।

হৃদরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, হার্ট ও রক্তনালীর স্বাস্থ্য রক্ষায় হাঁটার বিকল্প নেই। প্রতিদিন মাত্র ত্রিশ মিনিট হাঁটলে রক্তচাপ এবং রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে, যা হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে দেয়। আমাদের শরীরের রক্তনালীগুলো যখন নমনীয় থাকে, তখন হৃদপিণ্ডের ওপর চাপ কম পড়ে। রক্তচাপ স্বাভাবিক থাকলে স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাকের ভয় অনেক কমে যায়। এছাড়া, হাঁটা শুধু শরীরের ব্যায়াম নয়, এটি মস্তিষ্কের জন্যও এক দারুণ টনিক। হাঁটার সময় মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালন বাড়ে এবং এন্ডোরফিনসহ বিভিন্ন ভালো লাগার হরমোন নিঃসৃত হয়। এটি স্মৃতিশক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি মানসিক চাপ, বিষণ্ণতা এবং অবসাদ দূর করতে অতুলনীয়। বর্তমান যুগের বিষণ্নতা কাটানোর জন্য অনেক সময় ওষুধের চেয়ে একবেলা দীর্ঘ হাঁটাহাঁটি বেশি কার্যকর ভূমিকা পালন করে।

আমরা যখন দীর্ঘক্ষণ বসে কাজ করি, তখন শরীরের পেশিগুলো শক্ত হয়ে যায় এবং রক্ত সঞ্চালনে বিঘ্ন ঘটে। প্রতিদিন বিকেলে বা সকালে হাঁটার ফলে পেশিগুলোর জড়তা কাটে এবং শরীরে নমনীয়তা ফিরে আসে। দীর্ঘস্থায়ী পিঠের ব্যথা বা জয়েন্টের সমস্যায় যারা ভুগছেন, তাদের জন্য চিকিৎসকরা সবসময় মৃদু হাঁটার পরামর্শ দেন। এটি হাড়ের ঘনত্ব বাড়াতে সাহায্য করে, ফলে বয়স বাড়লে অস্টিওপরোসিসের ঝুঁকি অনেক কমে যায়। এছাড়া, নিয়মিত হাঁটার অভ্যাস ঘুমকে গভীর ও প্রশান্তিময় করে তোলে। যারা অনিদ্রায় ভুগছেন, তাদের জন্য প্রতিদিন বিকেলে হাঁটা একটি মহৌষধ হতে পারে। পর্যাপ্ত ঘুম এবং সুষম খাবারের পাশাপাশি এই সামান্য অভ্যাসের সমন্বয় মানুষকে দীর্ঘদিন কর্মক্ষম ও প্রাণবন্ত রাখতে পারে।

আমাদের বুঝতে হবে, হাঁটা মানে কেবল এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়া নয়, বরং এটি শরীর ও মনের এক আত্মিক সংযোগ। প্রতিদিন ভোরে যখন শিশিরভেজা ঘাসের ওপর দিয়ে হাঁটা হয়, তখন প্রকৃতির শান্ত বাতাস আমাদের ফুসফুসকে সতেজ করে দেয়। আবার বিকেলের সূর্যাস্তের সময় হাঁটলে মনের ক্লান্তি ধুয়ে যায়। জীবনের প্রতিটি বয়সে হাঁটার উপকারিতা ভিন্ন। ছোটদের ক্ষেত্রে এটি শারীরিক বিকাশে সাহায্য করে, মধ্যবয়সীদের ক্ষেত্রে এটি কর্মশক্তি ধরে রাখতে ভূমিকা রাখে এবং প্রবীণদের জন্য এটি সচল থাকার একমাত্র মাধ্যম। কোনো রকম ভারী যন্ত্র বা সরঞ্জামের প্রয়োজন ছাড়া আপনি যেখানেই থাকুন না কেন, হাঁটার অভ্যাস শুরু করা সম্ভব। পার্কের লনে, বাড়ির ছাদে কিংবা বিকেলে রাস্তার ধারে—কোথাও না কোথাও নিজেকে একটু সময় দিলেই চলে।

পরিশেষে বলা যায়, সুস্থতার কোনো শর্টকাট রাস্তা নেই। সুস্থ থাকতে চাইলে পরিশ্রম ও নিয়ম মানার কোনো বিকল্প নেই। নিয়মিত হাঁটা আমাদের রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরলের মতো ঘাতকদের বিরুদ্ধে এক শক্ত প্রাচীর গড়ে তোলে। যারা এখন অলস জীবন কাটাচ্ছেন, তাদের জন্য পরামর্শ হলো কালক্ষেপণ না করে আজ থেকেই হাঁটার অভ্যাস শুরু করুন। শুরুতে দীর্ঘ সময় না পারলেও অল্প অল্প করে সময় বাড়ান। মনে রাখবেন, আজকের এই ছোট অভ্যাসটিই কালকের বড় বিপদ থেকে আপনাকে রক্ষা করবে। আমাদের শরীর ও মনের যত্নে হাঁটার মতো এতো সহজ, সুলভ এবং কার্যকর ব্যায়াম বিশ্বে আর দ্বিতীয়টি নেই। আসুন, নিজেকে ভালোবাসতে শিখি এবং প্রতিদিন নিয়ম করে অন্তত ত্রিশ মিনিট হাঁটার শপথ নিই। মনে রাখবেন, আপনার স্বাস্থ্যই আপনার প্রকৃত সম্পদ, আর সেই সম্পদ আগলে রাখার চাবিকাঠি আপনার পায়ের কাছেই রয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত