প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
পশ্চিমবঙ্গে মাত্র চার মাসের শাসনেই বর্তমান রাজ্য সরকারের প্রতি মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে বলে দাবি করেছেন তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী ও সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, খুব শিগগিরই তৃণমূল কংগ্রেস আবারও রাজ্যের ক্ষমতায় ফিরবে।
শুক্রবার (২৮ আগস্ট) কলকাতার ক্যাথিড্রাল রোডে তৃণমূল ছাত্র পরিষদের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন মমতা। কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশ মেনে বিড়লা প্ল্যানেটোরিয়ামের কাছে ক্যাথিড্রাল রোডে এ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এতে তৃণমূলের ছাত্র ও যুব সংগঠনের নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক সমর্থক অংশ নেন।
সমাবেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বর্তমান রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ তোলেন। তাঁর দাবি, নতুন সরকারের শাসনামলে সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন করতে প্রশাসন ও পুলিশকে ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
মমতার বক্তব্যে পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং তৃণমূলের ভবিষ্যৎ কৌশলের বিষয়টি গুরুত্ব পায়। তিনি বলেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে তৃণমূল কংগ্রেসের কর্মী-সমর্থকদের নানা ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। দলীয় কর্মসূচি আয়োজনেও বাধা দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তৃণমূল নেত্রীর বক্তব্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল আগামী দিনে রাজ্যের রাজনৈতিক পরিবর্তন নিয়ে তাঁর প্রত্যাশা। তিনি দাবি করেন, বিজেপির শাসনের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ তৈরি হয়েছে এবং সেই ক্ষোভের প্রতিফলন রাজনীতিতে দেখা যাবে। তাঁর ভাষায়, বাংলায় আবারও রাজনৈতিক পরিবর্তন আসবে এবং তৃণমূল কংগ্রেস মানুষের বঞ্চনা ও দুর্নীতির ইতিহাস বদলে দেওয়ার লক্ষ্যে কাজ করবে।
মমতা বলেন, বিজেপির কথিত অন্যায়ের জবাব সাধারণ মানুষই দেবে। তাঁর বক্তব্যে তৃণমূলের সাংগঠনিক শক্তি পুনর্গঠন এবং দলের ছাত্র সংগঠনের ভূমিকার বিষয়টিও উঠে আসে। দীর্ঘ সময় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা মমতার জন্য এ ধরনের বক্তব্য একই সঙ্গে রাজনৈতিক বার্তা ও দলের কর্মীদের উজ্জীবিত করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তৃণমূল কংগ্রেস দীর্ঘদিন পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ক্ষমতাসীন শক্তি হিসেবে অবস্থান করেছে। ফলে ক্ষমতার বাইরে যাওয়ার পর দলটির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে সংগঠন ধরে রাখা এবং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় নিজেদের অবস্থান পুনর্গঠন করা। মমতার সাম্প্রতিক বক্তব্যে সেই সাংগঠনিক লড়াইয়ের ইঙ্গিতও স্পষ্ট হয়েছে।
শুক্রবারের সমাবেশটি ছিল তৃণমূল ছাত্র পরিষদের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত মূল কর্মসূচি। তবে একই দিনে সংগঠনটির ভেতরের বিদ্রোহী অংশও পৃথক কর্মসূচি পালন করে। এ ছাড়া কংগ্রেসও কলকাতায় নিজেদের ছাত্র সংগঠনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে অনুষ্ঠান আয়োজন করে। ফলে একই দিনে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিসরে ছাত্র রাজনীতিকে ঘিরে একাধিক কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী তৃণমূল ছাত্র পরিষদ ধর্মতলার রানি রাসমণি অ্যাভিনিউতে পৃথক সমাবেশ করে। অন্যদিকে কলকাতার মহাজাতি সদনে অনুষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করে কংগ্রেসের ছাত্র সংগঠন। এতে স্পষ্ট হয়, পশ্চিমবঙ্গের ছাত্র রাজনীতিতেও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি সংগঠনগুলোর অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা সক্রিয় রয়েছে।
মমতার সমাবেশের বক্তব্যে এসব রাজনৈতিক বাস্তবতার পাশাপাশি তৃণমূলের ভবিষ্যৎ ক্ষমতায় ফেরার আত্মবিশ্বাসও প্রকাশ পেয়েছে। তিনি মনে করেন, বর্তমান সরকারের প্রতি মানুষের অসন্তোষ তৃণমূলের জন্য নতুন রাজনৈতিক সুযোগ তৈরি করছে। তবে তাঁর এই দাবি রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবেই এসেছে এবং এর বাস্তব প্রতিফলন নির্ভর করবে আগামী দিনের জনসমর্থন, সংগঠন এবং নির্বাচনী রাজনীতির গতিপথের ওপর।
তৃণমূলের পক্ষ থেকে বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ তোলা হচ্ছে, সেগুলোর মধ্যে পুলিশ ও প্রশাসনের রাজনৈতিক ব্যবহার অন্যতম। মমতার অভিযোগ, বিরোধীদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সীমিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। সভা-সমাবেশের ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগও তিনি সামনে আনেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কী ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, তা এই বক্তব্যে বিস্তারিতভাবে উঠে আসেনি।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্যের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে তিনি রাজ্যের ক্ষমতার পালাবদলের অন্যতম প্রধান মুখ। তৃণমূল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার পর দলটিকে রাজ্যের প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করেন তিনি। ফলে ক্ষমতার বাইরে থেকেও তাঁর প্রতিটি রাজনৈতিক বক্তব্য দলটির ভবিষ্যৎ অবস্থান ও কৌশল নিয়ে আলোচনার জন্ম দেয়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে তৃণমূলের জন্য ছাত্র ও তরুণদের সমর্থন ধরে রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। শুক্রবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর সমাবেশে মমতার উপস্থিতি তাই কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, দলের তরুণ নেতৃত্ব ও কর্মীদের কাছে রাজনৈতিক বার্তা পৌঁছে দেওয়ার একটি সুযোগ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। তিনি দলের নেতা-কর্মীদের রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় থাকার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ আরও জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
অন্যদিকে, একই দিনে তৃণমূল ছাত্র পরিষদের বিদ্রোহী অংশের পৃথক কর্মসূচি দলের অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জের বিষয়টিও সামনে এনেছে। মূল সংগঠনের বাইরে পৃথক কর্মসূচি রাজনৈতিকভাবে তৃণমূলের ছাত্র রাজনীতিতে মতপার্থক্যের উপস্থিতি প্রকাশ করে। এই বিভাজন ভবিষ্যতে দলের সাংগঠনিক শক্তির ওপর কী প্রভাব ফেলবে, সেটিও পর্যবেক্ষণের বিষয় হয়ে উঠেছে।
মমতার বক্তব্যে বিজেপিকে প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তিনি দাবি করেছেন, বিজেপির শাসনের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ তৈরি হয়েছে এবং সেই ক্ষোভের রাজনৈতিক ফলাফল তৃণমূলের পক্ষে যাবে। তবে ক্ষমতায় ফেরার দাবি বাস্তবে কতটা প্রতিফলিত হবে, তা নির্ধারণ করবে পশ্চিমবঙ্গের ভোটারদের মনোভাব এবং আগামী রাজনৈতিক পরিস্থিতি।
সমাবেশের মধ্য দিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে যে বার্তাটি সামনে এসেছে, তা হলো—দলটি রাজনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়েনি এবং আবারও রাজ্যের ক্ষমতা দখলের লক্ষ্যে সংগঠনকে সক্রিয় করছে। মমতার বক্তব্যে আত্মবিশ্বাসের পাশাপাশি বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক রাজনৈতিক প্রচারের ইঙ্গিতও রয়েছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের কাছে এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে তৃণমূল কীভাবে সাধারণ মানুষের অসন্তোষকে নিজেদের রাজনৈতিক সমর্থনে রূপান্তর করতে পারে। একই সঙ্গে বর্তমান সরকার কীভাবে প্রশাসন পরিচালনা, জনসেবা ও রাজনৈতিক বিরোধিতা মোকাবিলা করে নিজেদের অবস্থান শক্ত করবে, সেটিও পশ্চিমবঙ্গের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে প্রভাব ফেলবে।
সব মিলিয়ে শুক্রবারের সমাবেশে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তৃণমূলের প্রত্যাবর্তনের দাবিকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। ক্ষমতার বাইরে থেকেও দলটি যে লড়াই চালিয়ে যেতে প্রস্তুত, তাঁর বক্তব্যে সেই বার্তাই স্পষ্ট হয়েছে। এখন সেই রাজনৈতিক প্রত্যয়ের সঙ্গে জনসমর্থনের বাস্তব সমীকরণ কতটা মেলে, তার উত্তর মিলবে আগামী দিনের রাজনৈতিক গতিপথে।