সর্বশেষ :

সাংস্কৃতিক সম্পদ সুরক্ষায় বাংলাদেশ-তুরস্ক ঐতিহাসিক চুক্তি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৫ জুন, ২০২৬
  • ১০ বার
সাংস্কৃতিক সম্পদ সুরক্ষায় বাংলাদেশ-তুরস্ক ঐতিহাসিক চুক্তি

প্রকাশ: ০৫ জুন  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের এক অনন্য নজির স্থাপন করে বাংলাদেশ ও তুরস্ক নিজেদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। গত ৫ জুন রাজধানীর অভিজাত হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের প্রিমিয়াম লাউঞ্জে আয়োজিত এক জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানে দুই দেশ সাংস্কৃতিক সম্পদ সুরক্ষা এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণের বিষয়ে একটি যুগান্তকারী সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে। এই চুক্তিটি কেবল দুটি দেশের মধ্যকার সরকারি দলিল নয়, বরং এটি শতাব্দীপ্রাচীন বন্ধুত্বের এক নতুন সংস্করণ, যা আগামী দিনে দুই দেশের সাংস্কৃতিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ সংরক্ষণে এক অবিচ্ছেদ্য শক্তি হিসেবে কাজ করবে।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের পক্ষে স্বাক্ষর করেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী এবং তুরস্কের পক্ষে স্বাক্ষর করেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। এছাড়াও দুই দেশের উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা ও তুরস্কের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল এই ঐতিহাসিক ক্ষণের সাক্ষী হতে উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত বক্তারা এই সমঝোতা স্মারকটিকে দুই দেশের মধ্যকার সাংস্কৃতিক সম্পর্কের এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাদের মতে, এই চুক্তির মাধ্যমে কেবল সম্পদ সুরক্ষাই নয়, বরং দুই দেশের শিল্প, ইতিহাস ও সংস্কৃতির পারস্পরিক আদান-প্রদান আরও গতিশীল হবে।

এই সমঝোতা স্মারকের মূল উদ্দেশ্য হলো সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং এর সুরক্ষায় প্রযুক্তিগত ও নীতিগত সহযোগিতা নিশ্চিত করা। চুক্তির শর্তানুসারে, উভয় দেশ প্রত্নসম্পদ রক্ষা, আধুনিক জাদুঘর ব্যবস্থাপনা, মহাফেজখানার ঐতিহাসিক নথি ও গ্রন্থাগার সামগ্রী ডিজিটাইজেশন এবং পুনরুদ্ধার কার্যক্রমের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে দীর্ঘমেয়াদী সহযোগিতার পথ প্রশস্ত করবে। এটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ বাংলাদেশের রয়েছে সমৃদ্ধ প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য, যা আধুনিক সংরক্ষণ প্রযুক্তির অভাবে অনেক ক্ষেত্রে হুমকির মুখে রয়েছে। তুরস্কের আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিক প্রযুক্তি ও দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এই সংকট উত্তরণে বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

চুক্তিটি সম্পাদনের ক্ষেত্রে ১৯৮১ সালের সাংস্কৃতিক চুক্তি এবং ২০১২ সালের বিজ্ঞান ও শিল্পবিষয়ক সহযোগিতা কর্মসূচির ভিত্তি ও ধারাবাহিকতাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে। অর্থাৎ, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়, বরং দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের এক ধারাবাহিক অগ্রগতি। নতুন এই চুক্তির অন্যতম প্রধান দিক হলো ইউনেস্কোর ১৯৭০ সালের কনভেনশনের আলোকে সাংস্কৃতিক সম্পদের অবৈধ আমদানি, রপ্তানি এবং মালিকানা হস্তান্তর প্রতিরোধে যৌথভাবে কাজ করার দৃঢ় অঙ্গীকার। ঐতিহাসিকভাবে যেসব সাংস্কৃতিক সম্পদ অবৈধভাবে এক দেশ থেকে অন্য দেশে পাচার হয়েছে, তা পুনরুদ্ধারেও দুই দেশ একে অপরকে প্রয়োজনীয় তথ্য ও আইনি সহায়তা প্রদানে সম্মত হয়েছে।

চুক্তি স্বাক্ষর পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন যে, এই সমঝোতা স্মারকটি কেবল সরকারি কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং এটি দুই দেশের জনগণের মধ্যে পারস্পরিক সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন আরও গভীর ও বিস্তৃত করবে। তিনি উল্লেখ করেন, তুরস্কের প্রত্নতাত্ত্বিক উৎকর্ষ এবং আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা বিশ্বের অনেক দেশের কাছেই আদর্শ। বাংলাদেশের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলোর তালিকাভুক্তি ও নথিবদ্ধকরণে তুরস্কের সহযোগিতা বাংলাদেশের ঐতিহ্য রক্ষার সক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। এটি ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যে পর্যটন ও গবেষণা ক্ষেত্রেও নতুন নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে বলে তিনি মনে করেন।

তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান তার বক্তব্যে বাংলাদেশের সমৃদ্ধ ইতিহাস ও অনন্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, দুই দেশের মুসলিম ঐতিহ্যের মিল এবং অভিন্ন সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ এই সম্পর্ককে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। চুক্তির প্রতিটি শর্ত বাস্তবায়নে তুরস্ক সরকার সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে বলে তিনি দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। তিনি জানান, তুরস্কের বিশেষজ্ঞ দল বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক সাইটগুলোতে আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগে কাজ করবে এবং বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করবে। এটি দুই দেশের সম্পর্কের মানবিক ও আত্মিক দিকটিকে আরও বিকশিত করবে।

চুক্তির আওতায় উভয় দেশ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস এবং প্রাচীন সম্পদের সঠিক তালিকাভুক্তি ও নথিবদ্ধকরণে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করবে। বর্তমান বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তনসহ নানাবিধ কারণে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যগুলো হুমকির মুখে পড়ছে। এমন সময়ে বাংলাদেশ ও তুরস্কের এই যৌথ প্রচেষ্টা শুধু নিজেদের সম্পদই রক্ষা করবে না, বরং বৈশ্বিক ঐতিহ্য রক্ষায়ও উদাহরণ সৃষ্টি করবে। বিশেষ করে ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রাচীন নথি ও গ্রন্থাগার সামগ্রী সংরক্ষণের প্রক্রিয়াটি আমাদের জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনেও সহায়ক হবে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই সমঝোতা স্মারকটি দুই বন্ধুপ্রতীম দেশের সাংস্কৃতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে। কেবল দুই দেশের সরকার নয়, বরং সাংস্কৃতিক অঙ্গনের গবেষক, ইতিহাসবিদ এবং শিক্ষার্থী—সবাই এই চুক্তির সুফল ভোগ করবে। ঢাকা ও ইস্তাম্বুলের মধ্যে এই সাংস্কৃতিক মৈত্রী কেবল স্থাপত্য ও ইতিহাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং এটি দুই দেশের মানুষের মাঝে সাংস্কৃতিক বিনিময় বৃদ্ধি করবে, যা দীর্ঘমেয়াদে কৌশলগত অংশীদারিত্বকে আরও শক্তিশালী করবে। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক সম্পদ এখন তুরস্কের মতো এক অভিজ্ঞ বন্ধু রাষ্ট্রের সহযোগিতায় বিশ্বদরবারে আরও সম্মানের সঙ্গে উপস্থাপিত হবে—এটিই আজকের এই চুক্তির সবচেয়ে বড় সাফল্য।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত