প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জাতীয় বাজেটের বিশাল আকার এবং তার বিপরীতে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ও বাস্তবের মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী ব্যবধান দেশের অর্থনীতিতে প্রতিনিয়ত এক নতুন চাপের সৃষ্টি করছে। যার সর্বশেষ এবং অত্যন্ত উদ্বেগজনক নিদর্শন দেখা গেল সদ্য শুরু হওয়া নতুন অর্থবছরটিতে। রাজস্ব আয়ের অত্যন্ত শ্লথ গতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সরকারের রাষ্ট্রীয় ব্যয় ও দৈনন্দিন পরিচালনা খরচ অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় বাধ্য হয়ে ব্যাংক খাতের ওপর ঋণের জন্য এক প্রকার অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়তে হয়েছে। অর্থনৈতিক রিপোর্টারদের সাম্প্রতিক তথ্য ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নতুন এই অর্থবছরের কেবল প্রথম ১৩ দিনের সংক্ষিপ্ত সময়ের ব্যবধানেই দেশের বাণিজ্যিক ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো থেকে সরকারের নিট ঋণের পরিমাণ অবিশ্বাস্যভাবে ৯ হাজার ২০৯ কোটি টাকার বিশাল অঙ্ক ছাড়িয়ে গেছে। এর ফলে দেশের আর্থিক খাতের মূল স্তম্ভ ব্যাংকগুলোতে সরকারের পুঞ্জীভূত মোট ঋণের স্থিতি গিয়ে ঠেকেছে প্রায় ৬ লাখ ৯৪ হাজার ৬৮৪ কোটি টাকায়, যা সামগ্রিক সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞ অর্থনীতিবিদ ও আর্থিক খাতের বিশ্লেষকরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন যে, প্রতি অর্থবছরের শুরুতে জাতীয় বাজেটে রাজস্ব আদায়ের যে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়, তা মূলত কাঠামোগত দুর্বলতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতার কারণে কখনোই পুরোপুরি বা সফলভাবে বাস্তবায়িত হয় না। কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় কর ও করবহির্ভূত রাজস্ব আদায় না হওয়ায় এবং সরকারের নিয়মিত উন্নয়ন ও অনুন্নয়ন ব্যয় চলমান রাখতে গিয়ে সরকারকে সবসময়ই অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক ঋণের ওপর মাত্রাতিরিক্তভাবে নির্ভর করতে হয়। বর্তমান বিশ্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং অভ্যন্তরীণ ভূ-রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক বাস্তবতার কারণে প্রত্যাশা অনুযায়ী বিদেশি ঋণ বা বৈদেশিক সহায়তার প্রবাহও আশানুরূপভাবে পাওয়া যাচ্ছে না। বৈদেশিক উৎস থেকে প্রয়োজনীয় অর্থ বা অনুদান সময়মতো ছাড় না হওয়ায় সরকারের সামনে একমাত্র সহজলভ্য বিকল্প হিসেবে দেশীয় ব্যাংক খাত থেকেই চড়া সুদে ঋণ নিয়ে দেশের বাজেট ঘাটতি মেটানো এবং দৈনন্দিন অর্থায়নের চাহিদা পূরণ করা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা থাকছে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ করা প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা গেছে যে, চলতি নতুন অর্থবছরের প্রথম মাত্র ১৩ দিনের ব্যবধানে সরকার কেবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক থেকেই নিট ৫ হাজার ৪১৪ কোটি টাকা বিশাল অঙ্কের ঋণ গ্রহণ করেছে। অথচ গত অর্থবছরের ঠিক একই সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে সরকারের ঋণের অবস্থান ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত অর্থাৎ ঋণাত্মক ৪ হাজার ৬০৮ কোটি টাকা, যা সরকারের অর্থনৈতিক অবস্থার দ্রুত অবনতিকে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলে। এর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকেও একই সময়ে সরকারের পক্ষ থেকে আরও ৩ হাজার ৭৯৫ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে, যদিও গত অর্থবছরের একই সময়ে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে নেওয়ার পরিমাণটি তুলনামূলকভাবে কিছুটা বেশি অর্থাৎ ৬ হাজার ১১২ কোটি টাকা ছিল। বর্তমানে কেবল বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছেই সরকারের বকেয়া ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৯৯ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকায় এবং দেশের বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে সরকারের এই বিপুল পরিমাণ ঋণের মোট পরিমাণ গিয়ে ঠেকেছে ৫ লাখ ৯৫ হাজার ২১৯ কোটি টাকায়।
দেশের বর্তমান সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও সরকারের এই ক্রমবর্ধমান ঋণগ্রহণের প্রবণতা নিয়ে নিজের সুচিন্তিত মতামত প্রকাশ করতে গিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রবীণ প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী সংবাদমাধ্যমকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, জাতীয় বাজেটে রাজস্ব আয়ের যে আকাশচুম্বী লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়, মূলত তার ওপর ভিত্তি করেই সরকারের সামগ্রিক ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো মাঠপর্যায়ে রাজস্ব আদায়ের হার সবসময়ই প্রাক্কলিত লক্ষ্যের তুলনায় অনেক নিচে অবস্থান করে। ফলে রাষ্ট্রীয় ব্যয় নির্বাহ করা এবং নির্ধারিত উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর চাকা সচল রাখার তাগিদে সরকারকে বারবার ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত ও অস্বাস্থ্যকর চাপ সৃষ্টি করে ঋণ নিতে হচ্ছে। সরকারের এই ধরনের অভ্যন্তরীণ ঋণগ্রহণ দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর তারল্যপ্রবাহের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, যার ফলে সাধারণ উদ্যোক্তা ও বেসরকারি খাতের ব্যবসায়ীরা পর্যাপ্ত পরিমাণে ব্যাংক ঋণ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হন এবং সার্বিক বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে স্থবিরতা নেমে আসে।
অতীতের বিভিন্ন অর্থবছরের হিসাব পর্যালোচনা করলে সরকারের এই ঋণনির্ভরতার এক বিপজ্জনক চিত্র আরও স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। গত অর্থবছরে সরকার ব্যাংক খাত থেকে প্রাক্কলিত যে পরিমাণ ঋণ নেওয়ার প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল, বছরের শেষ পর্যন্ত সেই লক্ষ্য তো বটেই, বরং তার চেয়েও অতিরিক্ত ৩০ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা বেশি ঋণ গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিল। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেটে ব্যাংকিং খাত থেকে ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও, পরবর্তী সময়ে অর্থনীতির বর্ধিত চাপের মুখে সেই লক্ষ্য বাড়িয়ে সংশোধিত বাজেটে তা ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছিল। কিন্তু বছরের শেষ হিসাব নিকাশে দেখা যায় যে, পুরো অর্থবছরে সরকার ব্যাংক খাত থেকে সব মিলিয়ে অবিশ্বাস্য রকমের ১ লাখ ৩৪ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা ঋণ গ্রহণ করেছে। সরকারের এই লাগামহীন ঋণ নেওয়ার প্রবণতা আগামী দিনগুলোতে দেশের ব্যাংক খাতের সুশাসন ও আর্থিক স্বাস্থ্যকে আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন স্বাধীন অর্থনৈতিক গবেষকরা।
এই ধারাবাহিকতা বজায় রেখেই চলতি নতুন অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে ব্যাংক খাত থেকে বিশাল অঙ্কের অর্থাৎ ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। অর্থবছরের মাত্র প্রথম দুই সপ্তাহের কম সময়েই যখন প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে, তবে পুরো বছরজুড়ে এই ঋণের গতিপ্রকৃতি কোথায় গিয়ে ঠেকবে তা নিয়ে এখন থেকেই গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা। রাজস্ব আহরণের প্রচলিত দুর্বল পদ্ধতিগুলোর সংস্কার না করে এবং সরকারি অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বা বিলাসিতা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ না করে কেবল ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে এভাবে নির্বিচারে ঋণ নেওয়ার সংস্কৃতি চলতে থাকলে তা ভবিষ্যতে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে এক ভয়াবহ মুদ্রাস্ফীতি বা আর্থিক সংকটের জন্ম দিতে পারে। দেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষ এবং সচেতন ব্যবসায়ী সমাজ আশা করছে যে, নীতিনির্ধারক মহল বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং সরকারি ব্যয়ের যৌক্তিকীকরণের মাধ্যমে ব্যাংক খাতের ওপর এই অতিরিক্ত চাপ কমায়ে আনতে দ্রুত কার্যকর ও দূরদর্শী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।