সাউথ আফ্রিকায় সুপার শপে আগুন, ৬ বাংলাদেশি নিহত

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬
  • ৪১ বার
সাউথ আফ্রিকায় সুপার শপে আগুন, ৬ বাংলাদেশি নিহত

প্রকাশ:  ২৮ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

প্রবাসের মাটিতে কঠোর পরিশ্রম করে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের স্বপ্ন বুনেছিলেন যে তরুণেরা, সেই স্বপ্নের প্রদীপ নিভে গেল এক মর্মান্তিক ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে। সুদূর দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে এক হৃদয়বিদারক ও পৈশাচিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ছয়জন বাংলাদেশি নাগরিক। প্রবাসের কর্মব্যস্ত জীবনে এই ভয়াবহ ট্র্যাজেডি শুধু নিহতদের পরিবারকেই স্তব্ধ করে দেয়নি, বরং পুরো দেশজুড়ে এক গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। দক্ষিণ আফ্রিকার ইস্টার্ন কেপ প্রদেশের কুইন্সটাউন এলাকার একটি স্থানীয় সুপার শপে এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। স্থানীয় সময় মঙ্গলবার (২৮ জুলাই, ২০২৬) গভীর রাতে রাতের প্রথম প্রহরে ঘটা এই আকস্মিক ও ধ্বংসাত্মক বিপর্যয়ে ঘটনাস্থলেই চিরতরে নিভে গেছে ছয়টি তাজা প্রাণ। জীবিকার তাগিদে সুদূর আফ্রিকায় পাড়ি জমানো এই তরুণদের এভাবে অকালে চলে যাওয়ায় তাদের স্বজনদের বুকফাটে কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে চারপাশ।

প্রাথমিক ও স্থানীয় সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, মর্মান্তিক এই অগ্নিকাণ্ডের পেছনে নিছক কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং রয়েছে এক হিংস্র ও পরিকল্পিত নাশকতার কালো হাত। রাতের প্রথম প্রহরে একদল সশস্ত্র দুর্বৃত্ত পূর্বপরিকল্পিতভাবে ওই সুপার শপে প্রবেশ করে এবং অত্যন্ত সুকৌশলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে আগুন ধরিয়ে দেয়। মুহূর্তের মধ্যে আগুনের লেলিহান শিখা পুরো সুপার শপটিতে ছড়িয়ে পড়ে এবং চারপাশ কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায়। রাতের গভীরতায় দোকানটির ভেতরে থাকা হতভাগ্য প্রবাসীরা কোনো কিছু বুঝে ওঠার বা নিজেদের রক্ষা করার বিন্দুমাত্র সুযোগ পাননি। বদ্ধ ঘরের ভেতরে আগুনে পুড়ে ও প্রচণ্ড ধোঁয়ায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই মর্মান্তিক মৃত্যু হয় সেই ছয় বাংলাদেশির। আগুনের ভয়াবহতা এতটাই তীব্র ছিল যে, সুপার শপটির ভেতরের সমস্ত মালামাল মুহূর্তের মধ্যে পুড়ে ছাই হয়ে যায়, যা দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিরাপত্তাহীনতার দীর্ঘদিনের আশঙ্কারই এক নিষ্ঠুর ও ভয়াবহ বাস্তবায়ন।

এই শোকাবহ ঘটনার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, পুলিশ এবং ফায়ার সার্ভিসের বিশেষ দল দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যায়। দীর্ঘ চেষ্টার পর ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন এবং সুপার শপের ভেতর থেকে দগ্ধ মরদেহগুলো উদ্ধার করেন। দক্ষিণ আফ্রিকার পুলিশ ইতিমধ্যে এই মর্মান্তিক ঘটনার নেপথ্যে থাকা প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং জড়িত সশস্ত্র দুর্বৃত্তদের গ্রেফতারে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত শুরু করেছে। প্রাথমিক তদন্তে একে একটি পরিকল্পিত নাশকতা ও ঘৃণ্য অপরাধ হিসেবেই দেখছেন স্থানীয় তদন্তকারীরা। প্রবাসে নিজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করার সময় এ ধরনের বর্বরোচিত হামলা ও হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার ঘটনা দক্ষিণ আফ্রিকায় বসবাসরত অন্য বাংলাদেশি প্রবাসীদের মধ্যেও চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতার জন্ম দিয়েছে। প্রবাসী ব্যবসায়ীরা এখন নিজেদের জীবন ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিয়ে মারাত্মক উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

নিহত ছয়টি তাজা প্রাণের মধ্যে চারজনেরই বাড়ি আমাদের দেশের নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী আলীরটেক ইউনিয়নে, যা এই শোকের মাত্রাকে স্থানীয়বাসীর জন্য আরও বেশি অসহনীয় করে তুলেছে। এছাড়া নিহতদের মধ্যে অপর একজন পার্শ্ববর্তী বক্তাবলী ইউনিয়ন এবং ষষ্ঠজন মুন্সীগঞ্জ জেলার রিকাবিবাজার এলাকার বাসিন্দা বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে। আলীরটেক ইউনিয়ন পরিষদের সম্মানিত সদস্য রওশন আলী গণমাধ্যমকে অত্যন্ত বেদনাভাক্রান্ত হৃদয়ে জানিয়েছেন যে, নিহত ছয়জনের মধ্যে চারজনই তার নিজের ইউনিয়নের বাসিন্দা এবং তারা পরস্পরের অত্যন্ত নিকটাত্মীয়। যে সুপার শপটিতে এই মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, সেটি মূলত তাদেরই একটি পারিবারিক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ছিল। প্রবাসের মাটিতে নিজেদের পরিবারের সচ্ছলতা ফেরাতে এবং ভালো কিছু করার আশায় তারা একসঙ্গে এই ব্যবসা পরিচালনা করছিলেন। কিন্তু নিয়তির কি নিষ্ঠুর পরিহাস, যে দোকানটি ছিল তাদের বেঁচে থাকার এবং স্বপ্ন পূরণের একমাত্র ঠিকানা, সেই দোকানটিই আজ তাদের চিরকালের মতো কেড়ে নিল।

প্রিয়জন হারানোর এই সংবাদ মুহূর্তের মধ্যে দেশের বাড়িতে এসে পৌঁছালে আলীরটেক ও বক্তাবলী এলাকাসহ পুরো নারায়ণগঞ্জজুড়ে শোকের মাতম শুরু হয়। নিহতদের বাড়িমুখো স্বজনদের কান্নায় বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে এবং গ্রামজুড়ে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়েছে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন বৃদ্ধ বাবা-মা, স্ত্রী ও কোমলমতি সন্তানেরা। তবে এই মর্মান্তিক মৃত্যুর বিষয়ে সরকারি বা আনুষ্ঠানিক কোনো তথ্য এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম ফয়েজ উদ্দিন গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, এই হৃদয়বিদারক ঘটনার বিষয়ে এখন পর্যন্ত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা সরকারের উচ্চপর্যায়ের কোনো আনুষ্ঠানিক বার্তা তাদের কাছে এসে পৌঁছায়নি। এমনকি ভুক্তভোগী কোনো পরিবারের পক্ষ থেকেও এখনো পর্যন্ত প্রশাসনের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা হয়নি। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিজ দায়িত্বে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে বলে তিনি নিশ্চিত করেছেন।

একইভাবে সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাজেদুর রহমান জানিয়েছেন যে, নিহতদের পূর্ণাঙ্গ পরিচয় নিশ্চিত করা, অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এবং সশস্ত্র হামলার সুনির্দিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে এখনো পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক ও নিশ্চিত তথ্য তাদের হাতে আসেনি। তবে সংশ্লিষ্ট দেশের কূটনৈতিক মিশন, দূতাবাস এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত তদন্ত চালানো হচ্ছে। প্রবাসে বাংলাদেশিদের ওপর এ ধরনের প্রাণঘাতী হামলা, সন্ত্রাস ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নতুন নয়। এর আগেও দক্ষিণ আফ্রিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বহু প্রবাসী বাংলাদেশি দুর্বৃত্তদের টার্গেটে পরিণত হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। কিন্তু সাম্প্রতিক এই ঘটনাটির ভয়াবহতা অতীতের সব দুঃখজনক রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে। দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের চাকা সচল রাখতে গিয়ে যারা বিদেশে রক্ত ও ঘাম ঝরাচ্ছেন, তাদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সরকারের কূটনৈতিক পর্যায়ে আরও জোরালো ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিক সমাজ ও নিহতদের শোকস্তব্ধ পরিবারগুলো।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত