শেয়ারবাজারের মার্জিন ঋণ বিধিমালা সংশোধন নিয়ে তীব্র বিতর্ক

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬
  • ৪৩ বার

প্রকাশ:  ২৮ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিনের মন্দাভাব কাটিয়ে ওঠার এবং বাজারে পর্যাপ্ত তারল্যপ্রবাহ বা নগদ অর্থের প্রবাহ বৃদ্ধি করার এক বহুমুখী ও দূরভিসন্ধিমূলক প্রচেষ্টায় হাত দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন বা বিএসইসি। পুঁজিবাজারকে চাঙ্গা করতে সংস্থাটির পক্ষ থেকে মার্জিন ঋণ বিধিমালায় একটি বড় ধরনের পরিবর্তনের নতুন খসড়া প্রস্তাব নিয়ে আসা হয়েছে। তবে এই আকস্মিক সংশোধনী প্রস্তাব দেশের আর্থিক ও শেয়ারবাজারের অঙ্গনে এক অভাবনীয় মিশ্র প্রতিক্রিয়া এবং তুমুল বিতর্কের ঝড় তুলেছে। মাত্র নয় মাস আগে যখন বিএসইসি বাজার সুরক্ষার স্বার্থে কঠোর সব বিধিনিষেধ ও শর্ত আরোপ করেছিল, ঠিক তারেক অল্প সময়ের ব্যবধানে এই ধরনের অতিশিথিল বা উদারীকরণ নীতি গ্রহণের উদ্যোগ বাজারে নানামুখী প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। একদিকে বাজারের শীর্ষ পর্যায়ের কিছু নীতিনির্ধারক ও মার্চেন্ট ব্যাংকার মনে করছেন যে এই নীতি পুঁজিবাজারে নতুন করে তারল্য বা অর্থের জোগান বাড়িয়ে ব্যবসায়ের গতিশীলতা ফিরিয়ে আনবে, অন্যদিকে বাজারসংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞ বিশ্লেষক ও বড় একটা অংশ এই অতিশিথিলতার কারণে ভবিষ্যতে এক ভয়াবহ আর্থিক ঝুঁকির আশঙ্কা প্রকাশ করে তীব্র উদ্বেগ জানিয়েছেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন যে, যখন দেশের শেয়ারবাজার নিজে থেকেই একটি স্বাভাবিক ও যৌক্তিক চাহিদার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে এবং বাজারে নতুন ও ভালো মানের শেয়ারের জোগান বা আইপিও আসার কোনো লক্ষণ নেই, ঠিক সেই সময়ে এই ধরনের তারল্য বাড়ানোর অপচেষ্টা বাজারে নতুন করে এক কৃত্রিম ও ঝুঁকিপূর্ণ মূল্যস্ফীতি তৈরি করতে পারে। বাজারসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ হলো যে, দেশের বর্তমান বাস্তবতায় অংশীজন বা স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে কোনো ধরনের অর্থবহ আলোচনা বা পরামর্শ ছাড়াই এই বিতর্কিত সংশোধনীর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই নতুন প্রস্তাবের আওতায় মার্জিন ঋণ পাওয়ার যোগ্যতার ক্ষেত্রে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং বীমা কোম্পানির ক্ষেত্রে প্রথাগত পিই রেশিও বা মূল্য-উপার্জন অনুপাতের পরিবর্তে পিবি রেশিও বা মূল্য-বুক ভ্যালু অনুপাত চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে। কমিশনের এই খসড়া প্রস্তাব প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরনের বিভ্রান্তি ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে, যার ফলে শেয়ারবাজারে সূচকের পতন ঘটেছে এবং আশঙ্কাজনকভাবে লেনদেনের পরিমাণও কমে গেছে বলে মনে করছেন দেশের বিশিষ্ট বাজার বিশেষজ্ঞরা।

নতুন প্রণীত এই বিধিমালার খসড়ায় বেশ কিছু বড় ধরনের ছাড় বা শিথিলতার প্রস্তাব রাখা হয়েছে, যা নিয়ে বর্তমানে নানা আলোচনা চলছে। বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী শেয়ারবাজারে মার্জিন ঋণ পাওয়ার জন্য অন্তত এক বছর একটানা শেয়ার ধরে রাখা এবং কমপক্ষে পাঁচ লাখ টাকার বা তার বেশি বিনিয়োগ থাকার যে কঠোর বাধ্যবাধকতা ছিল, নতুন প্রস্তাবে তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে মাত্র তিন লাখ টাকার বিনিয়োগে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, কোম্পানির বার্ষিক লভ্যাংশ বা ডিভিডেন্ড যা-ই হোক না কেন, এখন থেকে ‘বি’ ক্যাটেগরির ঝুঁকিপূর্ণ শেয়ারেও মার্জিন ঋণ পাওয়ার সুযোগ থাকবে বলে খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং বীমা খাতের শেয়ারে মার্জিন ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে পূর্বের পিই রেশিওভিত্তিক মূল্যায়নের নিয়ম বাতিল করে সম্পূর্ণ নতুন পিবি রেশিওভিত্তিক যোগ্যতার প্রস্তাব করা হয়েছে। এই প্রতিটি পরিবর্তনই শেয়ারবাজারের বর্তমান কাঠামোর মূলে বড় ধরনের আঘাত হানতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন রক্ষণশীল অর্থনীতিবিদরা।

শুধু বিনিয়োগের শর্ত বা পিই রেশিও পরিবর্তনই নয়, বরং ব্রোকারেজ হাউসগুলোর মূলধন পর্যাপ্ততা নিয়েও বেশ কিছু বিতর্কিত প্রস্তাব রাখা হয়েছে। বর্তমান ও প্রচলিত বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো ব্রোকারেজ হাউস বা মার্চেন্ট ব্যাংক যদি নিয়ন্ত্রক সংস্থা নির্ধারিত মূলধন পর্যাপ্ততার বা ক্যাপিটাল এডিকোয়েসি রুলস কঠোরভাবে পূরণ না করে, তবে তাদের জন্য মার্জিন ঋণ প্রদানে কঠোর বিধিনিষেধ বা নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিধান রয়েছে। কিন্তু নতুন এই সংশোধন প্রস্তাবে সেই গুরুত্বপূর্ণ ও সুরক্ষামূলক শর্তটি সম্পূর্ণভাবে তুলে দেওয়ার জোরালো প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে ব্রোকারেজ হাউসগুলোকে তাদের নিজস্ব পরিশোধিত মূলধনের তিনগুণের পরিবর্তে সর্বোচ্চ পাঁচগুণ পর্যন্ত বিশাল পরিমাণ মার্জিন ঋণ প্রদানের সুযোগ রাখার কথা বলা হয়েছে। এই ধরনের অবাধ ঋণপ্রদান সুবিধা দেশের পুঁজিবাজারকে আবারও এক বিপজ্জনক জুয়ার আখড়ায় পরিণত করতে পারে বলে জোরালো আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্তাব্যক্তিরা।

বিনিয়োগ করপোরেশন অব বাংলাদেশ বা আইসিজির বিশিষ্ট চেয়ারম্যান এবং দেশের অন্যতম প্রবীণ অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ এই উদারীকরণ ও অতিশিথিলকরণ প্রক্রিয়ার সম্পূর্ণ যৌক্তিকতা নিয়ে অত্যন্ত কঠোর প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, অতীতে বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে যত বড় বড় এবং ধ্বংসাত্মক ধস বা পতন ঘটেছে, তার প্রায় ৯০ শতাংশের মূল কারণ বা মূলে ছিল এই মার্জিন ঋণের যথেচ্ছ ও অনিয়ন্ত্রিত অপব্যবহার। তিনি অত্যন্ত সতর্ক করে দিয়ে সংবাদমাধ্যমকে বলেন যে, বর্তমান মার্জিন বিধিমালায় কাগজে-কলমে নেগেটিভ ইক্যুইটিতে বা ঋণাত্মক মূলধনে যাওয়ার কোনো সুযোগ থাকার কথা না থাকলেও, অতীতে কিছু অসাধু ব্রোকার ও মার্চেন্ট ব্যাংক সেই নিয়ম ভেঙেছিল। যার পরিণতি হিসেবে বাজারে বর্তমানে হাজার হাজার কোটি টাকার পুঞ্জীভূত নেগেটিভ ইক্যুইটি সৃষ্টি হয়েছে এবং এটি আজও দেশের শেয়ারবাজারের গলায় একটি বড় কাঁটা বা বোঝা হয়ে আটকে আছে। মাত্র কয়েক মাস আগের সেই কঠোর অবস্থান থেকে বিএসইসি কেন এত দ্রুত এবং কোনো ধরনের সুচিন্তিত মতামত ছাড়াই এমন উদার নীতি গ্রহণ করল, তা নিয়ে তিনি তীব্র সংশয় ও বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।

ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন বা ডিবিএর সভাপতি সাইফুল ইসলামও এই বিষয়ে প্রায় একই ধরনের সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছেন। তিনি মনে করেন যে, আগের কমিশনের প্রণীত প্যারামিটার বা মাপকাঠিগুলো অত্যন্ত কঠোর ছিল এবং সময়োপযোগী করার জন্য হয়তো সেখানে কিছু সংশোধনের প্রয়োজন ছিল। তবে তিনি অত্যন্ত সাবধানতার সঙ্গে জোরালো সুরে বলেন যে, যেভাবে এবং যে মাত্রায় নিয়মকানুনগুলো শিথিল করা হচ্ছে, তা দেশের বর্তমান বাজারের জন্য আদৌ ইতিবাচক হবে কিনা তা অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখা উচিত ছিল। ২০১০ সালের শেয়ারবাজারের ভয়াবহ ধসের করুণ স্মৃতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন যে, ওই সময় এই অনিয়ন্ত্রিত মার্জিন ঋণের কারণেই দেশের শত শত ব্রোকারেজ হাউস এবং মার্চেন্ট ব্যাংক আর্থিকভাবে সম্পূর্ণ রুগ্‌ণ, দেউলিয়া ও পঙ্গু হয়ে পড়েছিল। সেই ঐতিহাসিক শিক্ষা থেকে যদি বর্তমান কমিশন কোনো পাঠ না নেয়, তবে তা দেশের অর্থনীতি এবং সাধারণ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য চরম দুর্ভাগ্যজনক এক পরিণতি ডেকে আনতে পারে।

অন্যদিকে, এই প্রস্তাবের পক্ষেও কিছু যুক্তি বা ভিন্নমত উঠে এসেছে বাজার বিশ্লেষকদের একাংশের কাছ থেকে। লঙ্কাবাংলা ইনভেস্টমেন্টের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বা সিইও ইফতেখার আলম বিএসইসির এই বর্তমান উদ্যোগটিকে অত্যন্ত সাহসি এবং সার্বিকভাবে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, বাজারের বর্তমান দীর্ঘস্থায়ী ও স্থবির মন্দা কাটিয়ে ওঠার জন্য তারল্যের বিকল্প নেই এবং আরও কিছু নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে নমনীয়তা বা ছাড় দেওয়া অত্যন্ত জরুরি ছিল। তিনি মনে করেন যে, বিশেষ করে ট্রিপল সেলের বা মার্জিন কলের সময় পয়েন্ট নির্ধারণের ক্ষেত্রে আরও বেশি শিথিল ও বাস্তবসম্মত নীতি দরকার। তাঁর দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ২০১১ সালের স্মরণকালের ধসের পর থেকে গত প্রায় ১৫ বছর ধরে দেশের পুঁজিবাজারের বহু ভালো ভালো কোম্পানি নেগেটিভ ইক্যুইটির নিরন্তর চাপে তাদের প্রকৃত মূলধন হারিয়ে ফেলার উপক্রম হয়েছে। তাই তিনি মনে করেন যে, ক্যাপিটাল অ্যাডিকুয়েসি রুলস বা মূলধন পর্যাপ্ততার কঠোর নিয়ম কার্যকর করার আগে এই রুগ্‌ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাজার থেকে সম্মানজনকভাবে নিজেদের গুটিয়ে নেওয়ার জন্য বা ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য পর্যাপ্ত সময় ও সুযোগ দেওয়া অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত ও বুদ্ধিদীপ্ত সিদ্ধান্ত হবে।

নতুন নিয়মে যেহেতু নিট সম্পদের বিপরীতে সর্বোচ্চ পাঁচ গুণ পর্যন্ত বিশাল অঙ্কের ঋণ দেওয়ার উন্মুক্ত সুযোগ রাখা হয়েছে, তাই এটি সামগ্রিকভাবে বাজারের চাহিদা ও নগদ অর্থের প্রবাহ বহুগুণ বাড়িয়ে তুলতে সাহায্য করবে বলে তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস। তবে বিএসইসির পক্ষ থেকে বারবার দাবি করা হচ্ছে যে, এই পুরো সংশোধন উদ্যোগটি মূলত বাজারের বর্তমান অবস্থাকে আরও বেশি বাস্তবভিত্তিক, গতিশীল এবং বিনিয়োগবান্ধব করার মহৎ উদ্দেশ্যেই গ্রহণ করা হয়েছে। তা সত্ত্বেও দেশের সাধারণ ব্রোকারেজ হাউসের অভিজ্ঞ কর্মকর্তা ও মাঠপর্যায়ের পেশাদাররা মনে করছেন যে, এই ধরনের শিথিল বিধিমালা চালু হলে দীর্ঘমেয়াদি ও সুশৃঙ্খল বিনিয়োগের সংস্কৃতি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাবে। এর ফলে সাধারণ মানুষের কষ্টের সঞ্চয় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে না গিয়ে অতিমাত্রায় ‘ট্রেডিং’ বা ঝুঁকিপূর্ণ শেয়ার জুয়ায় উৎসাহিত হবে এবং পর্দার আড়ালে থাকা বিভিন্ন কারসাজি চক্র বা সিন্ডিকেট আগের চেয়ে অনেক বেশি মাত্রায় সক্রিয় ও বেপরোয়া হয়ে ওঠার সুযোগ পাবে। দেশের অর্থনীতির সামগ্রিক স্থিতিশীলতা এবং কোটি কোটি সাধারণ ছোট বিনিয়োগকারীর কষ্টার্জিত পুঁজির সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য নীতিনির্ধারকদের এই মার্জিন ঋণ বিধিমালা সংশোধনের প্রতিটি পদক্ষেপ অত্যন্ত বিচক্ষণতা, সতর্কতা এবং নিরপেক্ষতার সঙ্গে পুনর্বিবেচনা করা উচিত বলে সচেতন মহল মনে করছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত