প্রকাশ: ৫ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বর্তমান ডিজিটাল যুগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি সমাজে এক গভীর অস্থিরতার উৎস হিসেবেও আবির্ভূত হয়েছে। প্রযুক্তির এই বিশাল আশীর্বাদকে যখন কিছু গোষ্ঠী রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য কুরুচিপূর্ণ প্রচারণার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, তখন তা দেশের রাজনৈতিক পরিবেশকে বিষিয়ে তোলে। শুক্রবার জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সভায় বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঠিক এই সংকটটির দিকেই আঙুল তুলেছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন যে, সোশ্যাল মিডিয়ার অপরিকল্পিত অপব্যবহার এবং পরিকল্পিত ভুল প্রচারণার কারণে আজ বাংলাদেশের সুস্থ রাজনীতির পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তার বক্তব্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যবহৃত ভাষার কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়ায় যে কুরুচিপূর্ণ ও আক্রমণাত্মক ভাষার ব্যবহার বাড়ছে, তা কোনোভাবেই সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিচায়ক হতে পারে না। রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতা থাকতেই পারে, কিন্তু সেই ভিন্নতাকে কেন্দ্র করে যখন ব্যক্তিগত আক্রমণ বা কুরুচিপূর্ণ শব্দের ব্যবহার করা হয়, তখন রাজনীতির মূল সৌন্দর্য হারিয়ে যায়। তার মতে, একটি সুপরিকল্পিত চক্রান্তের মাধ্যমে দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, যার মূল লক্ষ্য হলো দীর্ঘদিনের আন্দোলন ও অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে অর্জিত গণতান্ত্রিক যাত্রাকে নস্যাৎ করা এবং দেশে এক ধরনের নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরি করা।
বিএনপিকে একটি উদার গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল হিসেবে অভিহিত করে মির্জা ফখরুল বলেন যে, তার দল কখনোই কোনো অগণতান্ত্রিক বা বিপ্লবী পন্থার ওপর বিশ্বাস রাখে না। জনগণের ভোটাধিকার এবং তাদের কল্যাণের প্রতি নিবেদিত থাকাই বিএনপির রাজনীতির মূল ভিত্তি। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, দেশের যখন সংকটময় মুহূর্ত চলছে, তখন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অবিশ্বাসী একটি অশুভ শক্তির উত্থান ঘটছে। এই শক্তিটি অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যবহার করে দেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট করার পায়তারা করছে। তিনি দেশের গণতন্ত্রপ্রেমী মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, এই চক্রান্তকারীদের চিহ্নিত করতে হবে এবং তাদের অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সরব হতে হবে। গণতন্ত্রকে সুসংহত করার দায়িত্ব কেবল একটি দলের নয়, বরং দেশের প্রতিটি নাগরিকের।
আলোচনা সভায় উপস্থিত বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতা সম্পর্কে আরও বিস্তারিত আলোকপাত করেন। তিনি বলেন, দেশের চারপাশ থেকে নানামুখী ষড়যন্ত্রের জাল বোনা হচ্ছে। বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয় কিছু চক্র বা গোষ্ঠী, যাদের তিনি ‘বটবাহিনী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, তারা পরিকল্পিতভাবে অপপ্রচারের মাধ্যমে জনমতকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। শামসুজ্জামান দুদু মনে করেন, এই ষড়যন্ত্রের মূল লক্ষ্য হলো তারেক রহমানের নেতৃত্বের ওপর মানুষের আস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা। তবে তিনি জনগণের অটল সমর্থনের ওপর আস্থা রেখে বলেন যে, এসব অপপ্রচারে কোনো লাভ হবে না, কারণ তৃণমূলের জনগণ তাদের নেতার ওপর বিশ্বাস রাখে এবং তারা এই চক্রান্ত সম্পর্কে সচেতন রয়েছে।
বর্তমান সরকারের ওপর মানুষের আস্থা ও সমর্থনের বিষয়টি উল্লেখ করে দুদু আরও বলেন, এই সরকারকে যেকোনো মূল্যে রক্ষা করতে হবে। তিনি শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, যদি আমরা এখনই দেশবাসীকে এই গভীর ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সচেতন করতে না পারি, তবে ভবিষ্যতে দেশের সামনে বড় ধরনের বিপদ আসন্ন। সোশ্যাল মিডিয়ার অপব্যবহার কেবল রাজনৈতিক নেতাদের ক্ষতি করছে না, বরং তা দেশের জাতীয় ঐক্যকেও হুমকির মুখে ফেলছে। গুজব ও ভুল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে যদি কোনো সমাজ পরিচালিত হয়, তবে তার পরিণাম অত্যন্ত ভয়াবহ হয়। এ কারণেই রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত নিজেদের সমর্থকদের মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের ক্ষেত্রে সহনশীলতা ও দায়িত্ববোধের শিক্ষা দেওয়া।
রাজনৈতিক উত্তাপ ও ডিজিটাল অস্থিরতার এই সময়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্য জাতীয় রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার খোরাক জুগিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, কেন সোশ্যাল মিডিয়া রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েলের প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠছে? এর উত্তর খুঁজতে গিয়ে বিশ্লেষকরা বলছেন, গণতান্ত্রিক পরিসরে যখন যুক্তির চেয়ে শক্তির ব্যবহার বা ব্যক্তিগত আক্রমণ বেশি প্রাধান্য পায়, তখনই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। বর্তমান সময়ে একটি মিথ্যে গুজব দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে, যা মুহূর্তের মধ্যে হাজার মানুষের আবেগকে উসকে দিতে পারে। রাজনৈতিক নেতাদের উচিত এই ডিজিটাল আসক্তি ও আগ্রাসনকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য নতুন ধরনের কৌশলী আলাপ-আলোচনা শুরু করা।
পরিশেষে বলা যায়, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও শামসুজ্জামান দুদুর এই বক্তব্য কেবল দলের নেতাকর্মীদের জন্য সতর্কবার্তা নয়, বরং পুরো দেশের জন্য একটি জরুরি বার্তা। গণতন্ত্রের পথে যাত্রা সব সময় মসৃণ হয় না, কিন্তু সেই যাত্রাকে কণ্টকাকীর্ণ করে তোলা হয় যখন তথ্যের নামে অপপ্রচার চলে। দেশের রাজনীতিকে যদি সত্যিকারের জনকল্যাণমুখী করতে হয়, তবে সোশ্যাল মিডিয়ার এই বিষাক্ত পরিবেশ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আর কুরুচিপূর্ণ প্রচারণার মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখার এখনই সময়। রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং গঠনমূলক সমালোচনাই পারে এই অস্থিরতা নিরসন করে একটি সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি উপহার দিতে।