প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
যশোরের অভয়নগরে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জুলাই পদযাত্রা কর্মসূচির পথসভায় সরকারের বিভিন্ন সামাজিক সহায়তা কার্যক্রম, বেকারত্ব, উৎপাদনমুখী অর্থনীতি এবং নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন দলের দক্ষিণাঞ্চলীয় মুখ্য সংগঠক ও সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকার কর্মসংস্থান ও উৎপাদনমুখী অর্থনীতি গড়ে তোলার পরিবর্তে বিভিন্ন ধরনের কার্ডভিত্তিক সহায়তা কর্মসূচির মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে মানুষের কর্মসংস্থানের পরিবর্তে নির্ভরশীলতা বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি দেশের তরুণ সমাজকে উৎপাদন, উদ্যোগ এবং দক্ষতাভিত্তিক অর্থনীতির দিকে এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
শুক্রবার (২৪ জুলাই) বিকেলে যশোরের অভয়নগর উপজেলার নওয়াপাড়া পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় এনসিপির জুলাই পদযাত্রার অংশ হিসেবে আয়োজিত পথসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন এনসিপির প্রধান সমন্বয়কারী শাহাজান কবির। অনুষ্ঠানে কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মী এবং বিপুলসংখ্যক সমর্থক উপস্থিত ছিলেন।
হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন সেই রাষ্ট্রের মানুষ কর্মসংস্থানের সুযোগ পায়, উৎপাদন বাড়ে এবং নতুন নতুন শিল্প ও উদ্যোক্তা তৈরি হয়। তিনি দাবি করেন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি প্রয়োজনীয় হলেও সেটি কখনোই কর্মসংস্থানের বিকল্প হতে পারে না। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে হলে উৎপাদন, কৃষি, শিল্প, প্রযুক্তি এবং উদ্যোক্তা তৈরিতে রাষ্ট্রকে আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, “উৎপাদনমুখী দেশ গড়ার পরিবর্তে সরকার কার্ডের নামে বেকারত্বে উৎসাহ দিচ্ছে।” তাঁর মতে, কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে বিভিন্ন ধরনের সহায়তা কার্ডের ওপর নির্ভরশীল করে রাখার পরিবর্তে তাদের জন্য স্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করাই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার। তিনি বলেন, একটি শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে তুলতে হলে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির পাশাপাশি উৎপাদন ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
এনসিপির সাংগঠনিক কার্যক্রম প্রসঙ্গে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, দলটি দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে চায়। তিনি উপস্থিত জনগণের উদ্দেশে বলেন, “দেশকে এগিয়ে নিতে এনসিপি নামক চারা গাছকে বৃক্ষে পরিণত করতে সমর্থন দিন, আমরা প্রতারণা করব না।” তাঁর বক্তব্যে রাজনৈতিক জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণের প্রতিশ্রুতির বিষয়টিও উঠে আসে।
পথসভায় তিনি নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণের বিষয়েও বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তাঁর মতে, দেশের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী হলেও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তাদের প্রতিনিধিত্ব এখনও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। তিনি বলেন, রাজনৈতিক আন্দোলন কিংবা জনসমাবেশে নারীদের উপস্থিতি থাকলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হয় না। এই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসে নারীদের নেতৃত্ব বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।
হাসনাত আবদুল্লাহ আরও বলেন, দেশের ৫১ শতাংশ নারী জনগোষ্ঠীকে কার্যকরভাবে রাজনীতির মূলধারায় সম্পৃক্ত না করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়। তিনি নারীদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিকাশে সামাজিক ও সাংগঠনিক প্রতিবন্ধকতা দূর করার আহ্বান জানান এবং তরুণীদের সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে অংশগ্রহণের আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক সরোয়ার তুষার। তিনি দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ্য করে মন্তব্য করেন যে, পলাতক অবস্থায় থেকে দেশে ফেরার বিষয়ে যেসব বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে, সেগুলোর কোনো বাস্তবতা নেই। তিনি দাবি করেন, শেখ হাসিনা আর কখনও বাংলাদেশে ফিরে আসবেন না এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদেরও এ দেশে দাফন হবে না। তাঁর এই বক্তব্য সমাবেশে উপস্থিত নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক ও সংসদ সদস্য ডা. মাহমুদা মিতু তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীদের সামনে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জের বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ নিরুৎসাহিত করতে বিভিন্ন সময়ে সামাজিক ও ব্যক্তিগতভাবে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়। অনেক ক্ষেত্রেই নারী রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে চরিত্রহননের চেষ্টা করা হয়, যা রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য অশনিসংকেত।
ডা. মাহমুদা মিতু বলেন, এসব প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করেই নারীদের এগিয়ে আসতে হবে। তিনি বিশ্বাস করেন, নারীরা যদি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আরও বেশি সম্পৃক্ত হতে পারেন, তাহলে রাষ্ট্র পরিচালনায় নতুন দৃষ্টিভঙ্গি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিবেশ তৈরি হবে।
পথসভায় আরও বক্তব্য দেন এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক আলী আহসান জুনায়েদ, খুলনা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ফরিদুল হক এবং যশোর জেলা সমন্বয়কারী মো. নুরুজ্জামান। বক্তারা দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদার করা, আগামী দিনের রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং জনগণের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন। স্থানীয় নেতারা অভয়নগরসহ বৃহত্তর যশোর অঞ্চলে এনসিপির সাংগঠনিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
জুলাই পদযাত্রা কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে আয়োজিত এই পথসভায় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল মাঠপর্যায়ে কর্মসূচি বাড়িয়েছে এবং সাধারণ মানুষের কাছে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরতে সভা-সমাবেশ ও গণসংযোগের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। সেই ধারাবাহিকতায় এনসিপিও সাংগঠনিক বিস্তার এবং রাজনৈতিক বার্তা জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে দেশব্যাপী কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বেকারত্ব, কর্মসংস্থান, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং উৎপাদনমুখী অর্থনীতি—এই বিষয়গুলো বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার অংশ। একদিকে সরকার সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা সম্প্রসারণের কথা বলছে, অন্যদিকে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীল বিনিয়োগ বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিচ্ছে। ফলে এ ধরনের বক্তব্য দেশের অর্থনৈতিক নীতি এবং রাজনৈতিক বিতর্কের অংশ হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
এদিকে নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে। নির্বাচন, দলীয় নেতৃত্ব এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীদের প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে নানা সময়ে সুপারিশ এসেছে। এনসিপির নেতাদের বক্তব্যেও সেই বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
অভয়নগরের পথসভায় দেওয়া বক্তব্যগুলোকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বেকারত্ব, উৎপাদনমুখী অর্থনীতি এবং নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের বিষয়গুলো আগামী দিনেও রাজনৈতিক বিতর্ক ও জনআলোচনার গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে থাকবে বলে পর্যবেক্ষকদের ধারণা। তবে পথসভায় উপস্থাপিত বক্তব্যগুলো সংশ্লিষ্ট নেতাদের নিজস্ব রাজনৈতিক মতামত ও অবস্থান হিসেবে বিবেচ্য।