প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় হৃদয়বিদারক এক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন স্থানীয় এক হোটেল ব্যবসায়ী। অসুস্থ স্ত্রীকে হাসপাতালে ভর্তি রেখে নামাজ আদায় করতে বের হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু নামাজ শেষে আর জীবিত অবস্থায় পরিবারের কাছে ফেরা হয়নি। দ্রুতগতির দুটি মোটরসাইকেলের পরপর ধাক্কায় গুরুতর আহত হওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় তার। এ মর্মান্তিক ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে এবং মহাসড়কে বেপরোয়া মোটরসাইকেল চলাচল নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
নিহত মো. আলমগীর (৫৬) চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার আমিরাবাদ ইউনিয়নের তালুকদারপাড়া এলাকার বাসিন্দা। তিনি লোহাগাড়া সদর এলাকায় একটি ভাতের হোটেলের মালিক ছিলেন। স্থানীয়দের কাছে তিনি পরিশ্রমী, সৎ ও সদালাপী মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তার আকস্মিক মৃত্যুতে পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও এলাকাবাসীর মধ্যে গভীর শোকের সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার রাতে স্ত্রী কমরুন্নেছাকে চিকিৎসার জন্য লোহাগাড়া সদর ইউনিয়নের সাউন্ড হেলথ হাসপাতালে নিয়ে যান আলমগীর। স্ত্রীকে চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে রেখে রাত ৯টার দিকে হাসপাতাল থেকে বের হয়ে কাছের একটি মসজিদে নামাজ আদায় করতে যান। নামাজ শেষে হাসপাতালের দিকে ফেরার সময় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে নতুন হাসপাতাল ভবনের সামনে দ্রুতগতির দুটি মোটরসাইকেল পরপর তাকে ধাক্কা দেয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সংঘর্ষের তীব্রতায় আলমগীর সড়কে ছিটকে পড়ে গুরুতর আহত হন। ঘটনাস্থলে থাকা স্থানীয় মানুষ দ্রুত তাকে উদ্ধার করে প্রথমে সাউন্ড হেলথ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তার অবস্থার অবনতি হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। চিকিৎসকরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেও রাত ১১টার দিকে তিনি মারা যান।
আলমগীরের প্রতিবেশী মঈন উদ্দিন জানান, আলমগীর মূলত স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে গিয়েছিলেন। পরিবারের প্রতি দায়িত্ব পালন করতে গিয়েই তিনি এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার শিকার হন। নামাজ শেষে হাসপাতালের দিকে ফিরছিলেন, এমন সময় পরপর দুটি মোটরসাইকেল তাকে ধাক্কা দেয়। পুরো ঘটনাটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং এলাকার মানুষের জন্য বড় একটি শোকের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, দুর্ঘটনার খবর পেয়ে দোহাজারী হাইওয়ে থানার সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান। সেখানে একটি মোটরসাইকেল জব্দ করা হলেও চালক ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। পুলিশ ঘটনার বিস্তারিত তদন্ত শুরু করেছে এবং পলাতক চালককে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে অভিযান চালানো হচ্ছে।
দোহাজারী হাইওয়ে থানার উপপরিদর্শক রুহুল আমিন জানান, নিহতের পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ময়নাতদন্ত ছাড়াই মরদেহ তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। একই সঙ্গে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের এই অংশে দীর্ঘদিন ধরে দ্রুতগতির মোটরসাইকেল চলাচল একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে রাতের সময় বেপরোয়া গতিতে মোটরসাইকেল চালানোর কারণে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। তারা এই এলাকায় কঠোর ট্রাফিক নজরদারি, গতিনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং নিয়মিত আইন প্রয়োগের দাবি জানিয়েছেন।
সড়ক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। অতিরিক্ত গতি, ট্রাফিক আইন অমান্য, অসতর্ক চালনা এবং নিরাপত্তাবিধি না মানার কারণে প্রায় প্রতিদিনই দেশে প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। এসব দুর্ঘটনা প্রতিরোধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি চালকদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নিয়মিত নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন।
আলমগীরের মৃত্যুর ঘটনায় তার পরিবারে নেমে এসেছে গভীর শোক। যিনি অসুস্থ স্ত্রীর চিকিৎসার দায়িত্ব পালন করতে হাসপাতালে গিয়েছিলেন, সেই মানুষটিই শেষ পর্যন্ত আর ঘরে ফিরতে পারেননি। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে স্বজনরা ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।
এদিকে পুলিশ জানিয়েছে, দুর্ঘটনায় জড়িত মোটরসাইকেল চালকদের শনাক্ত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে দুর্ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ উদ্ঘাটনে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং ভবিষ্যতে এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনা রোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।