ইলিশের রেকর্ড আহরণের দাবি, বাজারে নেই তার প্রতিফলন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৬
  • ২ বার
ইলিশের রেকর্ড আহরণের দাবি, বাজারে নেই তার প্রতিফলন

প্রকাশ: ২৫ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভরা মৌসুমের শুরুতেই দেশের অন্যতম জনপ্রিয় মাছ ইলিশ নিয়ে দেখা দিয়েছে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য। মৎস্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যানে চলতি বছরের জুন মাসে দক্ষিণাঞ্চলে গত বছরের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি ইলিশ আহরণের দাবি করা হলেও বাস্তবে দেশের বিভিন্ন মোকাম, আড়ত ও খুচরা বাজারে সেই চিত্রের প্রতিফলন নেই। বাজারে বড় আকারের ইলিশের সংকট, অস্বাভাবিক উচ্চমূল্য এবং ছোট আকারের মাছের আধিক্য সাধারণ ক্রেতা থেকে শুরু করে জেলে, আড়তদার ও মৎস্যসংশ্লিষ্টদের মধ্যে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, কাগজে আহরণের পরিমাণ বৃদ্ধি পেলেও তার বড় একটি অংশ জাটকা ও ছোট আকারের ইলিশ হওয়ায় বাজারে মানসম্পন্ন বড় ইলিশের সরবরাহ বাড়েনি। একই সঙ্গে নিষিদ্ধ ট্রলিং, জাটকা নিধন এবং তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি নিয়েও উঠেছে নানা প্রশ্ন। ফলে সরকারি হিসাব ও বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে।

মৎস্য অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন মাসে বিভাগের ছয় জেলায় মোট ৪০ হাজার ৫১৬ টন ইলিশ আহরণ হয়েছে। একই সময়ে ২০২৫ সালে এই পরিমাণ ছিল ১৪ হাজার ৪৯৬ টন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আহরণ প্রায় তিন গুণ বেড়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। গত ছয় বছরের মধ্যে এটিই জুন মাসের সর্বোচ্চ আহরণ বলে অধিদপ্তরের তথ্য বলছে।

তবে বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা এবং উপকূলীয় এলাকার মাছের আড়ত ও বাজারের ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরকারি হিসাবের সঙ্গে বাজারের বাস্তবতার মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। যদি সত্যিই এত বেশি ইলিশ ধরা পড়ে থাকে, তাহলে বাজারে সরবরাহ বাড়ার পাশাপাশি দামও কমে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে বড় আকারের ইলিশের সংকট আগের চেয়ে আরও প্রকট হয়েছে এবং দাম বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে।

উপকূলীয় এলাকার জেলেদের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে নদী ও সাগরে আগের মতো বড় ইলিশ খুব কম পাওয়া যাচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ধরা পড়ছে ছোট আকারের মাছ, যার বড় অংশই জাটকা হিসেবে পরিচিত। পরিবেশ ও মৎস্যসম্পদ রক্ষার স্বার্থে জাটকা আহরণ ও বিক্রি আইনত নিষিদ্ধ হলেও বিভিন্ন এলাকায় তা অব্যাহত রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। জেলেদের দাবি, নিষিদ্ধ ট্রলিং জাহাজ ও অবৈধ জালের ব্যবহার বন্ধ না হওয়ায় ভবিষ্যতে ইলিশের প্রাকৃতিক উৎপাদন আরও হুমকির মুখে পড়তে পারে।

কুয়াকাটা উপকূলের অভিজ্ঞ জেলেরা জানান, কয়েক বছর আগেও আধা কেজি বা তার বেশি ওজনের ইলিশ সহজেই পাওয়া যেত। এখন একই ওজনের মাছ পাওয়া কঠিন হয়ে গেছে। বড় ইলিশের সংখ্যা কমে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে ছোট ফাঁসের জাল ব্যবহার করতে হচ্ছে, ফলে জাটকাও বেশি ধরা পড়ছে। এতে ইলিশের ভবিষ্যৎ প্রজনন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বরগুনার পাথরঘাটা, যা দেশের অন্যতম বৃহৎ ইলিশ অবতরণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত, সেখানেও একই ধরনের চিত্র দেখা যাচ্ছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, এ বছর কিছুটা বেশি মাছ এলেও তার বড় অংশ ছোট আকারের। তাদের মতে, নিষিদ্ধ ট্রলিং জাহাজ থেকে আসা মাছ এখন বিভিন্ন উপায়ে বৈধ বাজারে প্রবেশ করায় সরকারি হিসাবেও পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে।

মৎস্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যানে আরও দেখা যায়, বরিশাল বিভাগের মোট আহরণের অর্ধেকেরও বেশি এসেছে ভোলা জেলা থেকে। চলতি বছরের জুন মাসে বিভাগের মোট ৪০ হাজার ৫১৬ টন ইলিশের মধ্যে প্রায় ২৯ হাজার ৪৪৪ টন ভোলা থেকে আহরণের দাবি করা হয়েছে। তবে স্থানীয় আড়তদার ও দীর্ঘদিনের ব্যবসায়ীরা এই হিসাব নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তাদের দাবি, মেঘনা মোহনায় বড় ইলিশের সরবরাহ আগের তুলনায় অনেক কম এবং ট্রলারগুলো অনেক সময় মাছ বিক্রি করেও খরচ তুলতে পারছে না।

সরকারি হিসাব নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও মৎস্য অধিদপ্তর বলছে, মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের ভিত্তিতেই এই পরিসংখ্যান প্রস্তুত করা হয়েছে। অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, জাটকা নিধন একটি বড় সমস্যা এবং জনবল সংকটের কারণে সব এলাকায় কার্যকর নজরদারি চালানো সম্ভব হচ্ছে না। তবে সরকারি তথ্যের যথার্থতা নিয়ে তারা আস্থা প্রকাশ করেছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু একটি মাসের আহরণ দিয়ে ইলিশের প্রকৃত অবস্থা মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। বরং কয়েক বছরের ধারাবাহিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দক্ষিণাঞ্চলে বার্ষিক ইলিশ আহরণের প্রবণতা কমতির দিকেই রয়েছে। বিভাগীয় তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ বছরে বরিশাল বিভাগে মোট ইলিশ আহরণ প্রায় এক লাখ টনের বেশি কমেছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে যেখানে আহরণ হয়েছিল প্রায় তিন লাখ ৬৯ হাজার টন, সেখানে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা নেমে এসেছে প্রায় দুই লাখ ৬৬ হাজার টনে। এই প্রবণতা ভবিষ্যৎ ইলিশ সম্পদের জন্য উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অন্যদিকে বাজারে ইলিশের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। বরিশালের পোর্ট রোড মোকামসহ বিভিন্ন বাজারে আকারভেদে প্রতি কেজি ইলিশের দাম গত বছরের তুলনায় ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত বেশি। এক কেজির বড় ইলিশ বিক্রি হচ্ছে আড়াই থেকে প্রায় তিন হাজার টাকায়। মাঝারি আকারের ইলিশের দামও দুই হাজার টাকার আশপাশে। এমনকি ছোট আকারের মাছও এক হাজার টাকার নিচে পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের অনেকেই ইলিশ কেনার চিন্তা বাদ দিতে বাধ্য হচ্ছেন।

ক্রেতারা বলছেন, বর্ষাকালে ইলিশের মৌসুম এলেও বাজারে দাম কমার কোনো লক্ষণ নেই। বরং বড় মাছের সংকটের কারণে সাধারণ মানুষকে ছোট আকারের ইলিশও বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। এতে ভরা মৌসুমেও ইলিশ এখন অনেক পরিবারের জন্য বিলাসিতার পণ্যে পরিণত হয়েছে।

মৎস্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইলিশ সম্পদ রক্ষায় কেবল নিষেধাজ্ঞা জারি করাই যথেষ্ট নয়। জাটকা নিধন, নিষিদ্ধ ট্রলিং এবং অবৈধ জাল ব্যবহারের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে আহরণের তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি আরও স্বচ্ছ ও নির্ভুল করা প্রয়োজন, যাতে সরকারি পরিসংখ্যান এবং বাজারের বাস্তবতার মধ্যে কোনো ধরনের অসামঞ্জস্য না থাকে।

তাদের মতে, ইলিশ বাংলাদেশের অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং খাদ্য নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই স্বল্পমেয়াদি লাভের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি সম্পদ সংরক্ষণকে অগ্রাধিকার না দিলে ভবিষ্যতে ইলিশের উৎপাদন আরও কমে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে শুধু বাজারে দামই বাড়বে না, দেশের অন্যতম মূল্যবান এই মৎস্যসম্পদও বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়বে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত