সর্বশেষ :

জনসংখ্যা বাড়াতে ভুটানের ঐতিহাসিক প্রণোদনা ঘোষণা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৫ জুন, ২০২৬
  • ৭ বার
জনসংখ্যা বাড়াতে ভুটানের ঐতিহাসিক প্রণোদনা ঘোষণা

প্রকাশ: ৫ জুন  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত আট লাখ মানুষের শান্ত দেশ ভুটান এখন এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। চারদিকে সবুজের সমারোহ আর সুখের সূচকে বিশ্বকে চমকে দেওয়া এই দেশটি গত কয়েক বছরে এক নীরব সংকটের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করছে। সেই সংকটটি হলো নিম্নমুখী জন্মহার। কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমে যাওয়া এবং বয়স্ক জনগোষ্ঠীর হার আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে ভুটান সরকার। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় অভিনব এক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে দেশটি। পরিবারগুলোকে অধিক সন্তান গ্রহণে উৎসাহিত করতে সরকার নগদ আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে, যা ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

ভুটান সরকারের সাম্প্রতিক ঘোষণা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৪ জুন বা তার পরে জন্ম নেওয়া কোনো পরিবারের তৃতীয় বা পরবর্তী প্রতিটি সন্তানের জন্য সরকার প্রতি মাসে ১০ হাজার গুলট্রাম বা প্রায় ১০৫ মার্কিন ডলার করে নগদ সহায়তা প্রদান করবে। এই সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে কিছু শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে শিশুর বয়স তিন বছর পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত পরিবারটি এই মাসিক সহায়তা পাবে। সরকার আরও উদারভাবে জানিয়েছে যে, ৪ জুনের আগে জন্মগ্রহণকারী এমন তৃতীয় বা পরবর্তী সন্তানরাও এই প্রকল্পের আওতাভুক্ত হবে, যদি তাদের বয়স বর্তমানে তিন বছরের কম হয়। ভুটানের মন্ত্রিপরিষদ সচিব কেসাং ডেকি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, দ্বিতীয় সন্তানের পর পরিবারে যত সন্তানই আসুক না কেন, অর্থাৎ তিন, চার, পাঁচ বা তার বেশি—সব ক্ষেত্রেই এই বিশেষ প্রণোদনা কার্যকর থাকবে।

সরকারি পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে এক উদ্বেগজনক চিত্র। মাত্র এক দশকের ব্যবধানে দেশটিতে নবজাতকের জন্ম সংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমেছে। ২০১৫ সালে ভুটানে মোট জন্মের সংখ্যা ছিল ১১ হাজার ১ জন, যা ২০২৪ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ১৫৩ জনে। অর্থাৎ মাত্র নয় বছরে জন্মের হার কমেছে প্রায় ২৬ শতাংশ। একই সময়ে মোট প্রজনন হার বা একজন নারীর গড় সন্তান ধারণের হার ২ দশমিক ১-এ নেমে এসেছে, যা জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম সীমার খুব কাছাকাছি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি এই ধারা অব্যাহত থাকে, তবে অদূর ভবিষ্যতে ভুটানের শ্রমবাজার ও সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা বড় ধরনের ধাক্কা খাবে।

জনসংখ্যা হ্রাসের পেছনে একাধিক কারণ চিহ্নিত করেছেন বিশ্লেষকরা। ভুটানের অর্থনীতির ধীরগতি এবং উন্নত জীবনযাত্রার প্রত্যাশায় তরুণ প্রজন্মের বিদেশমুখী হওয়ার প্রবণতা দেশটিতে জনশক্তির ঘাটতি তৈরি করেছে। বিশেষ করে শিক্ষিত ও দক্ষ তরুণরা উন্নত ক্যারিয়ার ও উচ্চ বেতনের আশায় অস্ট্রেলিয়া, কানাডা বা ইউরোপের দেশগুলোতে পাড়ি জমাচ্ছে। এই অভিবাসন স্রোত স্থলবেষ্টিত বৌদ্ধ এই রাষ্ট্রটির সামাজিক বুননকে দুর্বল করে দিচ্ছে। বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে ব্যয় বাড়ছে, যার তুলনায় কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা সংকুচিত হচ্ছে। এই ভারসাম্যহীনতা কাটিয়ে উঠতেই সরকার পরিবার ও শিশু কল্যাণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

ভুটান সরকারের এই উদ্যোগ কেবল আর্থিক সহায়তা নয়, বরং এটি তাদের দীর্ঘমেয়াদী জনসংখ্যাগত স্থিতিশীলতা রক্ষার একটি দৃঢ় প্রতিশ্রুতি। প্রথাগতভাবে ভুটানি সমাজে পরিবার ও সন্তানকে পরম আশীর্বাদ হিসেবে দেখা হয়। আধুনিকতার দোহাই দিয়ে মানুষ যখন সন্তান নেওয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘ পরিকল্পনা বা সীমাবদ্ধতা আরোপ করছে, তখন সরকারের এই প্রণোদনা দম্পতিদের মনে নতুন করে সাহস জোগাবে বলে আশা করা হচ্ছে। মাতৃস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা এবং শিশুদের জন্য একটি সমৃদ্ধ পরিবেশ তৈরি করা এই নীতির অন্যতম লক্ষ্য। সরকারের বিশ্বাস, এই আর্থিক প্রণোদনা পরিবারের অর্থনৈতিক বোঝা কিছুটা হলেও লাঘব করবে এবং সন্তানদের লালন-পালনে সহায়তা করবে।

ভুটানের এই উদ্যোগ বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। প্রতিবেশী দেশ ভারত, বিশেষ করে সিকিম রাজ্যও জন্মহার বাড়াতে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। সেখানে নারীদের জন্য এক বছরের দীর্ঘ মাতৃত্বকালীন ছুটি এবং পুরুষদের জন্য এক মাসের পিতৃত্বকালীন ছুটির পাশাপাশি আইভিএফ পদ্ধতিতে সন্তান নিতে আগ্রহীদের আর্থিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ায় জনসংখ্যা হ্রাসের এই প্রবণতা বর্তমানে জাপানের মতো উন্নত দেশগুলোর সংকটের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। জাপান গত পাঁচ বছরে প্রায় ৩১ লাখ জনসংখ্যা হারিয়েছে, যা তাদের মতো শিল্পোন্নত দেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। সেই শিক্ষা থেকেই ভুটান সময় থাকতেই ব্যবস্থা গ্রহণের পথে হাঁটছে।

সবশেষে বলা যায়, ভুটান সরকারের এই সাহসী পদক্ষেপ হিমালয় কন্যা খ্যাত দেশটির জনসংখ্যাগত সংকট নিরসনে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। নগদ সহায়তা প্রদান করে একদিকে যেমন পরিবারগুলোকে উৎসাহিত করা হচ্ছে, তেমনি অন্যদিকে দেশের দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্ব ও উন্নয়নের ভিত্তি শক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। আগামী দিনগুলোতে এই উদ্যোগের সুফল কতটা পাওয়া যায়, তা দেখার বিষয়। তবে দেশপ্রেম ও জাতীয় স্বার্থে তরুণ প্রজন্মকে দেশে ফেরানো এবং পরিবার গঠনের প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করতে উদ্বুদ্ধ করা এখন ভুটান সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জে সফল হতে পারলে ভুটান ভবিষ্যতে বিশ্বের অন্যান্য দেশের জন্য একটি নতুন মডেল তৈরি করবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত