প্রকাশ: ৫ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলার পদ্মা নদীর তীরবর্তী এলাকায় এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় জয় বিশ্বাস (২০) নামের এক তরুণ ট্রাক্টর চালকের অকাল মৃত্যু হয়েছে। আমন ধানের জমি চাষ করতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ট্রাক্টরসহ নদীতে পড়ে গিয়ে তিনি এই না ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন। শুক্রবার সকালে স্থানীয়দের নজরে আসার পর উদ্ধার অভিযান চালিয়ে ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ তার মরদেহ উদ্ধার করে। জয়ের এই মৃত্যু কেবল একটি পরিবারের স্বপ্নই ধ্বংস করেনি, বরং পুরো এলাকায় শোকের এক স্তব্ধতা তৈরি করেছে। শৈশবের স্বপ্ন আর জীবিকার তাগিদে ঝিনাইদহ থেকে বহুদূরের এই ফরিদপুরে এসে এভাবে নিথর হয়ে ফিরতে হবে, তা হয়তো জয় নিজেও কখনো ভাবেননি।
ঘটনার বিবরণে জানা যায়, বৃহস্পতিবার গভীর রাতে যখন চারিদিকে নিঝুম অন্ধকার, তখন জয় বিশ্বাস একাই ট্রাক্টর নিয়ে পদ্মা নদীর পাড়ে আমন ধানের জমি চাষ করছিলেন। ধারণা করা হচ্ছে, রাতে একটানা কাজ করার ফলে ক্লান্তিতে চালকের চোখে ঘুম এসে গিয়েছিল অথবা নদীর পাড়ের নরম মাটি ট্রাক্টরের ভার সইতে না পেরে ধসে গিয়েছিল। কোনো এক মুহূর্তের অসাবধানতায় ভারী ট্রাক্টরটি ভারসাম্য হারিয়ে সোজা গিয়ে পড়ে পদ্মা নদীর উত্তাল গর্ভে। নদীর গভীর জলে তলিয়ে যাওয়ার সময় জয় সম্ভবত ট্রাক্টরের স্টিয়ারিং হুইল বা অন্য কোনো অংশের নিচে আটকা পড়েছিলেন। রাতে আশেপাশের এলাকায় অন্য কোনো লোকজন না থাকায় তার বাঁচার আকুতি বা ট্রাক্টর পড়ার বিকট শব্দ কারো কানে পৌঁছায়নি। ফলে সেই রাতের অন্ধকারে জয় একা একাই জলের নিচে লড়াই করে শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কাছে হার মেনেছেন।
সকালে যখন স্থানীয় কৃষকরা নদীর পাড়ে কাজে এসেছিলেন, তখন পানির ওপর ভাসমান ট্রাক্টরের চাকা ও বিভিন্ন অংশ দেখে তাদের মনে সন্দেহের উদ্রেক হয়। তারা তৎক্ষণাৎ চরভদ্রাসন থানায় খবর দিলে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের একটি উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে ছুটে আসে। ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল ও উদ্ধারকর্মীরা দীর্ঘ অভিযানের পর বেলা ১১টার দিকে নদী থেকে জয়ের নিথর দেহ উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। জয়ের পকেটে থাকা পরিচয়পত্র ও স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, তিনি ঝিনাইদহ জেলার শৈলকূপা উপজেলার শাহবাজপুর গ্রামের বাসিন্দা গোলাম আলী বিশ্বাসের ছেলে। কাজের প্রয়োজনে তিনি চর ঝাউকান্দা ইউনিয়নের বালুরঘাট গ্রামের বাসিন্দা মোহাম্মদ আলীর ট্রাক্টরটি চালাতেন।
চরভদ্রাসন ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন কর্মকর্তা মো. ওহিদুল ইসলাম জানান, ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে মাটি ধসে বা অসাবধানতাবশত ট্রাক্টরটি নদীতে পড়ে গেছে। রাতের অন্ধকার থাকায় উদ্ধারকাজও বেশ চ্যালেঞ্জিং ছিল। অন্যদিকে, চরভদ্রাসন থানার উপপরিদর্শক মোজাম্মেল হক বিশ্বাস সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির পর জানান, নিহতের স্বজনদের খবর দেওয়া হয়েছে। তারা এসে পৌঁছালে মরদেহ তাদের কাছে হস্তান্তর করা হবে এবং এ ঘটনায় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। জয়ের এই মৃত্যু যেন সড়ক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এক কঠোর সতর্কবার্তা। কৃষি কাজে ব্যবহৃত আধুনিক যন্ত্রপাতির চালকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ ও নিরাপত্তা সচেতনতার অভাবই অনেক সময় এ ধরনের প্রাণহানির মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, জয়ের বয়স ছিল মাত্র বিশ। জীবনের বসন্তকাল পার করছিলেন তিনি, যেখানে তার চোখে ছিল অনেক স্বপ্ন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি বা পরিবারের সদস্য হিসেবে সে যে দায়িত্ব পালন করছিল, তার অকাল মৃত্যুতে সেই পরিবারটি আজ সম্পূর্ণ অসহায় হয়ে পড়েছে। জয়ের স্বজনদের কান্না আর আহাজারিতে ফরিদপুরের আকাশ-বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠেছে। এই মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রতিটি কর্মজীবনের পেছনে কতটা ঝুঁকি লুকিয়ে থাকে। কৃষি জমির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নদীর পাড়ের মতো ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে কাজ করার সময় বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করা এখন সময়ের দাবি।
পরিশেষে বলা যায়, জয় বিশ্বাস হয়তো আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তার এই অকাল প্রস্থান কৃষি খাতের সাথে জড়িত শ্রমিকদের নিরাপত্তার প্রশ্নটিকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। রাতে বা প্রতিকূল পরিবেশে বড় কোনো যন্ত্রপাতি চালানোর সময় যেন অবশ্যই একাধিক সঙ্গী রাখা হয় এবং নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়, সেদিকে উদ্যোক্তা ও মালিকপক্ষকে সতর্ক থাকতে হবে। আমরা জয়ের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি জানাই গভীর সমবেদনা। একটি সমৃদ্ধ কৃষি ব্যবস্থার স্বপ্নে জয়রা কাজ করে যান, কিন্তু সেই জয়দের জীবন যেন অসময়ে এভাবে ঝরে না পড়ে, তা দেখার দায়িত্ব আমাদের সকলের। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুততম সময়ে মরদেহ উদ্ধার এবং স্বজনদের কাছে পৌঁছানোর প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত প্রশংসনীয়, তবে ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা যেন আর না ঘটে, সে বিষয়ে সতর্কতাই হতে পারে জয়ের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা।